ভয় নাই ওরে ভয় নাই
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৭, ১৮:১৫
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
প্রিন্ট অ-অ+

আগুন জ্বলছে সিরিয়ায়, আফগানিস্তানে, সোমালিয়ায়, ইরাকে ও ইয়েমেনে। সেই লেলিহান আগুনের লকলকে শিখা কখনো কখনো দূরের-কাছের অন্যান্য দেশের গায়েও এসে লাগছে। আমাদের এই ছোট শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। এদেশেও গত কিছুদিনের মধ্যেই এখানে-ওখানে জঙ্গিবাদী নরকাগ্নি জ্বলতে দেখেছি আমরা। এমনকি যখন এই সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখা হচ্ছে, তখনও কুমিল্লা শহরের একটি জঙ্গী আস্তানা ঘিরে রেখেছে পুলিশ।


২০১৬ সালে রাজধানীর গুলশানে হোলে আরটিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গিরা যে হামলাটি চালায়, সেটি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। ওই হামলায় দেশি-বিদেশি ২০ জন নিহত হন। নিহত হয় পাঁচ জঙ্গীও। এরপরও জঙ্গীদের অপতৎপরতা থামেনি। একের পর এক কল্যাণপুর, নারায়ণগঞ্জ, মীরপুর, আজিমপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া, টাঙ্গাইল ও আশকোনায় জঙ্গীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লড়াই হয়, তাতে বহু জঙ্গির পাণহানিও হয়। কিন্তু তাতেও ওরা দমে না। কী এক অদম্য নেশায় পিপীলিকার মতো ওরা কেবলই ধ্বংসের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে ছুটে যায়।


সেই আগুনে ওরা নিজেরা পুড়ে মরে। মরে ওদের সঙ্গী নারী ও শিশুরা। পোড়ে আমাদের সকলের শান্তি, স্বস্তি। পোড়ে আমাদের সমাজ সংসার এমনকি ধর্মও, যে ধর্মের নাম ব্যবহার করে ওরা জ্বালাচ্ছে অশান্তির আগুন।


২০১৭ সালে এসে কিছুদিন নীরবে শক্তি সঞ্চয় করে এই দুষ্টচক্র। তারপর গত ১৫ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ওদের হদিস মেলে। সীতাকুণ্ডের অগ্নিকুণ্ডে সেই যে আগুন জ্বললো, তা যেন আর থামতেই চাইছে না। সীতাকুণ্ড থেকে সিলেট, সেখান থেকে মৌলভীবাজার হয়ে এখন কুমিল্লা। শান্ত সবুজ এই দেশের বুকে এভাবেই ওরা জ্বালাতে চায় আগুন, যে আগুনে জ্বলছে সিরিয়া, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, ইরাক, ইয়েমেনসহ অনেক দেশ।


ধর্মের নাম ব্যবহার করে অশান্তির অগ্নিপূজারীরা কি বাংলাদেশে সফল হবে? গত ক'দিনের খবর পড়ে আমাদের উপলব্ধি হলো - না। কারণ, আমরা দেখেছি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দারুণ সফলতার সঙ্গে ওদের ঠেকিয়ে দিচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি ধর্মের নাম ব্যবহার করে খুনখারাবির হোতাদের প্রতি মানুষের সুতীব্র ঘৃণা। জনগণের এই ঘৃণাই ওদের দেশছাড়া করবে - এতে কোনো সন্দেহ নেই।


এটি একটি বড় ভরসার দিক বটে, তবে শুধু একে আঁকড়ে ধরে বসে থাকলে মোটেই চলবে না। মনে রাখতে হবে, এই অপশক্তির সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে বাইরের অপশক্তিও জড়িত। তাছাড়া আরো একটি ব্যাপার লক্ষ্যণীয় যে, এই দুষ্টচক্রে জড়িতরা কিন্তু পাহাড়ে-জঙ্গলে থাকছে না, থাকছে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে। ফলে ওদের আলাদা করে শনাক্ত করা খুবই মুশকিল। তা করতে গেলে ভুল হওয়ার আশঙ্কাও থাকছে বেশি। তাই জঙ্গি দমনের দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপে সাধারণ জনগণকে কিভাবে বেশি করে সম্পৃক্ত করা যায়, সেটিও ভাবতে হবে।


আরো একটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। আমরা সর্বশেষ কয়েকটি অভিযানের খবর পড়ে দেখেছি, আবাসিক এলাকার ভেতরে ''জঙ্গি আস্তানা আছে'' মর্মে খবর পেয়েই অভিযান চালাতে গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের এ সক্রিয়তা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি এর বিপদের দিকও আছে। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে কেউ যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে অতিমাত্রায় সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের নিকটতম স্বজনকে খুন করার ''ঐতিহ্য''ও এদেশের একশ্রেণীর মানুষের আছে।


অবশ্য আশার কথা যে, এরকম ''মানুষের'' সংখ্যা নিতান্তই কম। বরং ভাষার জন্য, দেশের জন্য, মানুষের জন্য জান-মাল উৎসর্গকারী এবং উৎসর্গ করতে প্রস্তুত মানুষের সংখ্যাই এদেশে অগণিত। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সেই সংখ্যাহীন মুক্তপ্রাণ মানুষ একবার জেগে উঠলে ওই দুরাচার জঙ্গীর দল পালানোর পথই খুঁজে পাবে না - এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।


আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে কোনোভাবেই জঙ্গীবাদের ঠাই হবে না। অজ্ঞানতার কুহকে পড়ে যারা অশান্তির আগুন জ্বালানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত, যেভাবে অভিযান শুরু হয়েছে তাতে তাদের বিলুপ্তিও খুব বেশি দূরে নয় বলেই আমরা মনে করি। চলমান জঙ্গী তৎপরতায় শঙ্কিত ও বিপন্ন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন শান্তিপ্রিয় সব মানুষের প্রতি তাই কবির ভাষায় বলি - ভয় নাই ওরে ভয় নাই।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com