ভবিষ্যৎবিনাশী দুষ্কর্ম
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০১৭, ১৭:৩৭
ভবিষ্যৎবিনাশী দুষ্কর্ম
প্রিন্ট অ-অ+

আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক সবসময়ই ছিল। এটা থাকতেই পারে। কারণ, শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় বিপুল সংখ্যায় পাসের হার দেখে বিতর্কটি মাঝে-মধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। নানা মহল থেকেই জানতে চাওয়া হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার মানটি আসলে কেমন ।


যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া না গেলেও ‘আমাদের শিক্ষার মানটি আসলে কেমন’- এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে গণমাধ্যম। ৮ জানুয়ারি দৈনিক কালের কণ্ঠ তাদের প্রধান খবর করেছে ডাহা ভুলে চোখ বুজে নম্বর শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে। এতে শিক্ষার 'মানের' যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা রীতিমতো ভয়াবহ।


ওই প্রতিবেদনটি থেকেই কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যাক : কুনো ব্যাঙকে কেন উভচর প্রাণী বলা হয়?—গত বছরের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ে এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। সঠিক উত্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল দুই নম্বর।


প্রশ্নটির উত্তরে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী খাতায় লিখেছে—কুনো ব্যাঙ লাফিয়ে লাফিয়ে চলে বলে একে উভচর প্রাণী বলা হয়। আরেকজন লিখেছে—কুনো ব্যাঙ ঘরের কোণে থাকে বলে একে উভচর প্রাণী বলা হয়। দুটি উত্তরই ভুল। তবু পরীক্ষক উভয় শিক্ষার্থীকেই এক নম্বর করে দিয়েছেন


এরকম আরো কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে : জেএসসি পরীক্ষার খাতা দেখা শেষে নিজের নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন পরীক্ষক কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক প্রশ্নের উত্তরই ডাহা ভুল লিখেছে পরীক্ষার্থীরা। তাদের ফেল করার কথা। কিন্তু প্রধান পরীক্ষক বলে দিয়েছেন, কাউকে ফেল করানো যাবে না। তাই উত্তর ভুল হলেও নম্বর দিতে বাধ্য হয়েছি। ’


এখানে বলা প্রয়োজন যে, সর্বশেষ জেএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৩.০৬ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৮ জন।


আমাদের শিশুরা পরীক্ষায় ভালো ফল করবে, এ তো আমাদের অহংকার। কিন্তু গৌরবের বিজয়মুকুটে এ কীসের কাঁটা!


প্রতিবেদনটির আরেকটি অংশ পড়া যাক : কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষা বোর্ডগুলো পরীক্ষকদের কাছে খাতা বুঝিয়ে দেয়ার পর প্রধান পরীক্ষকরা পরীক্ষকদের 'উদারভাবে' খাতা মূল্যায়নের জন্য চাপ দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীরা ফেল করলে পরীক্ষকদের শাস্তি পেতে হবে বলেও হুমকি দেন। ফেল করালে পরের বছর আর পরীক্ষক করা হবে না বলে জানিয়ে দেয়া হয়। একটি বান্ডেলে (১০০ খাতা) এক-দুজনের বেশি ফেল করলেই অনেক প্রধান পরীক্ষক পরীক্ষকদের ধমক দিয়ে নতুন করে খাতা দেখতে বলেন।


কী ভয়ঙ্কর তথ্য! পরীক্ষায় পাস-ফেল থাকবেই। তাই বলে যে পরীক্ষার্থী ফেল করবে তাকেও পাস করাতে হবে! এটা কোন ধরনের শিক্ষা? শিক্ষাব্যবস্থায় নীরবে-নিঃশব্দে যারা এই নৈরাজ্য জন্মদান ও লালনপালন করে চলেছেন, সেই প্রধান পরীক্ষকই বা কারা? প্রধান পরীক্ষকরা পরীক্ষকদের 'উদারভাবে' খাতা মূল্যায়নের জন্য চাপ এবং শিক্ষার্থীরা ফেল করলে পরীক্ষকদের শাস্তি দেয়ার হুমকি দেয়ার সাহসই বা কোত্থেকে পান?


আমাদের বিশ্বাস, এই চাপ ও হুমকির পেছনে সরকারের সংশ্লিষ্টতা নেই, থাকতে পারেও না। সরকার কেন আপন হাতে দেশের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করতে যাবে?


সরকারের কাছে তাই আমাদের বিনীত অনুরোধ, দয়া করে এই অপকর্মের দায় নিজের ঘাড়ে নেবেন না। এই ভবিষ্যৎবিনাশী দুষ্কর্মের হোতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে না পারলে ইতিহাস আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com