প্রতিকূলতাকে জয় করা অদম্য সাহসী সঙ্গীতা ইয়াসমিন
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:২৮
প্রতিকূলতাকে জয় করা অদম্য সাহসী সঙ্গীতা ইয়াসমিন
সামিনা বিপাশা
প্রিন্ট অ-অ+

নাটকের চেয়েও নাটকীয়ভাবে শেষ হতে পারত সঙ্গীতা ইয়াসমিনের গল্পটি। কিন্তু নাটকীয়তাকেও হার মানিয়ে গল্পটি হয়ে উঠেছে প্রেরণা এবং প্রচেষ্টার।


বাগেরহাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্মানো সঙ্গীতা ইয়াসমিনের কথা বলছি। আর দশটা মেয়ের মতোই ছকে বাধা জীবন চলছিল সঙ্গীতা ইয়াসমিনের। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন। সাফল্যের সিঁড়িটা তার কর্ম ও পরিশ্রমে প্রশস্তই ছিল। প্রথমে ব্র্যাক, তারপর বাংলাদেশের উন্নয়ন জগতে, সেভ দ্য চিল্ড্রেন, কেয়ার বাংলাদেশ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও ইউনিসেফে দীর্ঘ ১৬ বছর কাজ করেছেন।


কর্মজীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনও চলছিল অনুকূল স্রোতে। এরপর, এক কন্যা সন্তানের জননী হলেন। হঠাৎই জীবনে নাটকীয় মোড়। কন্যা সন্তানটি হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। শিশু যেমনই হোক তার আগমণ পৃথিবীতে সবসময়ই আনন্দের, কিন্তু সঙ্গীতা ইয়াসমিন সন্তান একটু কমতি নিয়ে জন্মানোতে যেন দাঁড়িয়ে গেলেন অপরাধীর কাঠগড়ায়। পারিবারিক, সামাজিক, কর্মক্ষেত্র সব জায়গায় জীবনচিত্র পালটে যেতে শুরু করল তার। জীবনের প্রবঞ্চনা যখন তুঙ্গে পাড়ি জমালেন পরবাসে। না, পালিয়ে যাননি, হেরে যাননি। নতুন স্বপ্ন নিয়ে সাফল্যকে ধরলেন হাতের মুঠোয়।


বর্তমানে তিনি কাজ করছেন, মেন্টাল হেলথ ও ডিজাবিলিটি সেক্টরে। কানাডার টরেন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডে স্পেশাল এডুকেশনাল টিচার হিসাবে কর্মরত আছেন।কানাডার টরেন্টোতে বোর্ড স্কুলেই স্বাভাবিক শিশুদের পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পপন্ন শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। প্রক্রিয়াটি এত দারুণ যে একটি বাচ্চা নিজেকে ছোট বা কমকিছু মনে করবে এমন সুযোগ নেই। বাচ্চাটি নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পায় খুব সহজেই। এমন ব্যবস্থা বাংলাদেশে চালু করতে পারলে খুব ভালো হত। বাংলাদেশে এখন স্পেশাল চাইল্ড নেহাতই কম নয়। শিক্ষাপ্রক্রিয়ার সাথে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বাচ্চাদের সঠিক উপায়ে যুক্ত করে নেওয়া এখন সময়ের দাবি,এমনই মত সঙ্গীতা ইয়াসমিনের।


বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার এক সমৃদ্ধ গ্রাম চিংড়াখালীতে জন্ম সঙ্গীতা ইয়াসমিনের। বাবা আব্দুস ছালাম হাওলাদার ও মা রহিমা ইয়াসমিনের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনিই প্রথম। বাবা পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, যদিও মুক্তিযুদ্ধের কিছুকাল আগে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পরবর্তীতে এল এম এফ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজস্ব ফার্মেসি স্থাপন করে গ্রামের মানুষের পাশে থেকে আজীবন সেবা করেছেন। বর্তমানে বার্ধক্যকাল কাটাচ্ছেন আপন গৃহে। মা আজীবন গৃহিনী হলেও ছিলেন আধুনিক মনোভাবাপন্ন, রুচিশীল এবং বুদ্ধিমতি নারী। সন্তানদের চোখে মানুষ হবার অপরিসীম বাসনা আর মননে বেড়ে ওঠার স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েই ক্ষান্ত হননি তিনি। আজীবন পাশে থেকে দুঃখ কষ্টের বোঝা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। সঙ্গীতা ইয়াসমিনের সহোদররা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।


চিংড়াখালী সমৃদ্ধ গ্রাম হলেও মুসলিমরা নারী শিক্ষায় পিছিয়েছিল। অপরদিকে হিন্দু সম্প্রদায় এগিয়েছিল।বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুল যেতে হত। সঙ্গীতা ইয়াসমিন চিংড়াখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে রেকর্ড নম্বর নিয়ে এস এস সি পাশ করেন ১৯৮৫ সালে। তার কলেজ ছিল খুলনাতে, বয়রা কলেজ। কলেজ শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন জট কাজে লাগিয়ে তিনি বিএড ও এম এড কোর্স সম্পন্ন করেন। সেখানেও তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখেন। প্রথম শ্রেণিতে এম এড সম্পন্ন করেন ১৯৯৬ সালে। এরপরে কর্মজীবনে প্রবেশ করে তিনি ২০০৮ সাথে এমবিএ করেন, সেখানেও জিপিএ ৪.৮৫ স্কোর করেন।


১৯৯৮ সালে ব্র‍্যাকে ১ মাস ঊনিশ দিনের চাকরি দিয়ে কর্মজীবনে পা রাখেন। তারপরে পিইডিপি টু প্রকল্প, তারপরে কেয়ার ইন্টারন্যাল, ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন ইউএসএ, ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশন্যাল বাংলাদেশে কাজ করেন।


কর্মজীবনে নানামুখী বাধা পেরিয়ে একেবারে মাঠ পর্যায় থেকে সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার অব্দি পৌঁছেছিলেন সততা, কর্মব্যস্ততা আর কঠোর পরিশ্রমের কারণে।জীবনে মিথ্যাচার, আর দ্বিচারিতাকে ঘৃণা করেন।স্পষ্টবাদী হওয়ার কারণে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তবু সাদাকে সাদা কালোকে কালোই বলেছেন।


চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসা এই নারীর জীবনে সফলতার সংখ্যা নিতান্তই সামান্য। তবে অর্জন অনেক। যা দৃশ্যমান না হলেও দ্যুতিমান নিঃসন্দেহে। মনের অসম্ভব জোরকে কাজে লাগিয়ে তিনি পথ চলেন, হয়ে যান অনেকের প্রেরণা খুব সহজেই। খুবই ইতিবাচক আর সদালাপী এই মানুষটির জীবনে নানা টানাপোড়েনের এক বিশাল জায়গা জুড়ে রয়েছে একান্ত আপন এক বেদনা।



সঙ্গীতা ইয়াসমিন বলেন, এই সমাজে অটিজম নিয়ে জন্ম নেওয়া একজন শিশুর অপরাধ মারাত্মক, এবং তার বাবা মা ও অপরাধী। সেই অপরাধের দায় মাথা পেতে নিয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমাই ২০১৩ সালে।


কিছু যন্ত্রণা কোনোদিন উপশম হবার নয়। এ তেমনই এক কষ্ট। যার জন্য আমি নিজে দায়ী নই, অথচ, আমাকেই এর দায় বহন করতে হচ্ছে। এই পোড়া সমাজে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারিনি। একমাত্র শিশুকন্যাকে নিয়ে স্কুলের শিক্ষক থেকে ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের কাছে নানামুখী হয়রানির শিকার হয়েছি।


বাংলাদেশে আমি আমার সন্তানকে স্পেশাল স্কুলেই ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু ওরাই আমাকে পরামর্শ দিল আপনার বাচ্চাকে নরমাল স্কুলে পড়ালেই ওর উন্নতি হবে, এখানে ওর অবনতিই হবে। তাই আমি ওকে একটা নরমাল স্কুলে ভর্তি করাই। আমার বাচ্চা স্পেশাল বেবি বলে অন্য বাচ্চারাই ওকে টিজ করত, এসব ও বোঝে? ও ওই বাচ্চাদের মারতে যেত। ব্যস দোষ হতো আমার বাচ্চার! দেখুন আমাদের সমাজ কেমন! পরিবার থেকে বাচ্চাদের কী শেখানো হয়, অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর চর্চা এই দেশে নেই! এমনকি বড়োরাও বোঝে না একটা স্পেশাল চাইল্ডের সাথে কেমন আচরণ করতে হয়। আমার বাচ্চাকে পাগল আখ্যা দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু দেখুন সেই 'পাগল' বাচ্চাই এখন টরেন্টো স্কুলে বেস্ট স্টুডেন্ট এওয়ার্ড পেয়েছে।


বুকে যার ঘুমায় লাল সবুজের বাংলাদেশ, যার অস্তিত্ব জুড়ে বাংলার হাওয়া-জল, সেই সঙ্গীতা ইয়াসমিন মা মাটি মানুষ রেখে এত দূরে আজ, শুধুই সন্তানের একটি সুস্থ সুন্দর জীবনপথ গড়ার অবিচল প্রত্যয়ে। যে সন্তান পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারত না, কথাও বলতে পারত না চার বছর অব্দি, মায়ের নিরলস পরিশ্রমের ফলে আজ সেই কন্যাটি ১৮ বছরে হাই স্কুল পাশ করেছে। স্কুলে বেস্ট স্টুডেন্ট আ্যওয়ার্ড পেয়ে, নাচ, গানসহ অন্যান্য বিষয়ে দক্ষতা দেখিয়ে বেস্ট স্টুডেন্ট হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।


ব্যক্তিগত জীবনের অনেক অপূরণীয় ইচ্ছা বুকে নিয়ে নিজের জীবিকার পাশাপাশি সঙ্গীতা ইয়াসমিন লিখে যাচ্ছেন প্রবন্ধ, কলাম। যা প্রথম আলোসহ দেশের অনেক দৈনিকে প্রকাশিত হচ্ছে। আছে তিন তিনটি কবিতাগ্রন্থ, একটি শিশুবিষয় গ্রন্থ। অনুবাদকর্ম ও পুস্তক পর্যালোচনায়ও তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়াও “বর্ণমালায় নীতিকথা” শিরোনামে শিশুদের জন্য নৈতিকতা উন্নয়ন বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে যা দেশের শিশু শ্রেণীর শিশুরা বিনামূল্যে পাচ্ছে এবং এ বইটি এখন টিআইবি’র ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি।



পত্রিকার মুক্তমত বিভাগ, লিটল ম্যাগ ও ২০০৭ সাল থেকে নিয়মিত সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তমনা বাংলা ব্লগেও লেখালিখি করছেন।লেখালিখির হাতেখড়ি শৈশবেই, মায়ের কাছে। সামাজিক সমস্যা, নারী, শিশু, মানবাধিকার, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার বিষয়ের মধ্যেই আবর্তিত হয় তাঁর লেখা। ২০১৩ সাল থেকে সপরিবারে কানাডার টরন্টোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন; বাংলাদেশ লিটারারি রিসোর্স সেন্টার নামে একটি সাহিত্য সংগঠনে সম্পাদনা পরিষদের সদস্য তিনি।


কবিতা লেখা তার নেশা। ইদানীং তিনি আঁকছেন। তাঁর আঁকায় দেশ, মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিবাদ বিমূর্ত থেকে মূর্ত হয় নানা রঙতুলির ক্যানভাসে।



তিনি বলেন, ছবি যে আঁকি এটাই আমার একমাত্র অবকাশ। জীবন আমাকে অবকাশ দেয়নি। জানেন, আমার মেয়ে জানতে চায় কী তার অপরাধ সে এমন হয়ে জন্মালো কেন? আমি উত্তর দিতে পারি না। মা হয়েছি এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েছিল। কিন্তু প্রতিকূলতাকে আমি মোটেও ভয় পাই না!


আমি ঘৃণা করি ধর্মান্ধদের। সাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে মুক্ত হয়ে লেখালেখি করেছি সেটা নিয়েও সমস্যায় পড়েছি। আসলে নারী বোধবুদ্ধিতে উন্নত হবে এবং সাফল্যমণ্ডিত হবে এটা আমাদের সমাজ এখনও মানতে পারে না! নারীকে দমিয়ে রাখলে সত্যিকারের ফলাফল আসলে কী দাঁড়ায়?



বাবার স্বপ্ন ছিল সুকন্যাটি ডাক্তার হবেন। সে আশায় ছাই দিয়ে সঙ্গীতা ইয়াসমিন হলেন সমাজকর্মী। মানুষের দুঃখ দুর্দশাকে কাছ থেকে উপলব্ধি করার বাসনাই তাকে এই পথে যেতে উৎসাহিত করেছিল। চান, বাংলাদেশেও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ হোক, আর সেই কর্মযজ্ঞে তিনিও হতে চান একজন হাল ধরা মাঝি।


একলা চলার অদম্য সাহস আর মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে চান আরও অনেকদিন। মননে তাঁর তারুণ্য আজীবনের। প্রেরণা তার বিশ্বব্যাপী যেকোনো পরিশ্রমী কর্মঠ নারী। নারীর এগিয়ে যাওয়াকে সেলিব্রেট করেন নিজের অর্জন ভেবেই। ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য পড়া- আঁকা ও মানসিক বিকাশের স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখেন পৃথিবীটা একদিন মানুষের হবে।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com