ঝুঁকিতে ৫০৩ কোটি টাকার কর্ণফুলী টানেলের সার্ভিস এরিয়া
পারকিতে নদীর বালু উত্তোলনে ভরাট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৬
ঝুঁকিতে ৫০৩ কোটি টাকার কর্ণফুলী টানেলের সার্ভিস এরিয়া
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় পারকি সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। এতে পারকি সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের সার্ভিস এরিয়া এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।


স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১২ দিন ধরে ড্রেজারের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাট করা হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও উপকূলীয় ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে পারকি সৈকত ও টানেল সার্ভিস এরিয়ায় ভাঙন দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো কারিগরি মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার প্রিমিয়ার কোম্পানি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বারশত ইউনিয়নের বিএনপি নেতাদের সহযোগিতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের কাজ করছে। কাজের তদারকিতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সুপারভাইজার মো. সাইফুল ইসলামসহ ১০ থেকে ১৫ জন কর্মী।


জানা গেছে, উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় ১৯৯৩-৯৪ ও ২০০২ সালে পর্যায়ক্রমে পারকি ও আশপাশের প্রায় ৮০ হেক্টর এলাকায় ঝাউগাছ লাগায় বন বিভাগ। পরবর্তী সময়ে এসব গাছ বড় হয়ে উঠলে এলাকাটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানীয়দের কাছে এটি ঝাউবাগান নামেও পরিচিত।


গত শনিবার ও রবিবার (৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পারকি সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ঝাউবাগানের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে সেই বালু কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়ার কাছে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে বাল্কহেডে জমা করে প্রায় এক কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে।


স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের জন্য নদী থেকে যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে আমাদের রক্ষাকবচ পারকি সৈকত ও বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। প্রায় ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টানেল সার্ভিস এরিয়াও রয়েছে হুমকিতে। বর্ষা কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।’


পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করলে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে সামুদ্রিক অণুজীব ও কাঁকড়ার আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদীর তলদেশের গঠন ও উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থাও পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।


সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ড্রেজারের পাইপলাইন দিয়ে বালুর সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছও উঠে আসছে। পরে স্থানীয়দের কয়েকজনকে জাল ও হাত দিয়ে সেসব মাছ সংগ্রহ করতে দেখা যায়।


এদিকে পারকি এলাকায় ঝাউগাছের পাশে স্থাপিত একটি হলুদ রঙের সাইনবোর্ডে তিনটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নাম-লোগো দেখা গেছে। এগুলো হলো পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএনটিআইসি)। তবে সরেজমিনে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পে তাদের সংশ্লিষ্টতা ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।


স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব, হাসান ও আজগর বলেন, ‘পারকি সৈকতসংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। সমুদ্র ও নদী থেকে বালু আনতে হলে নির্দিষ্ট নীতিমালা, অনুমোদন ও কার্যাদেশ থাকতে হয়। সেখানে পর্যটনকেন্দ্র বা সৈকত থেকে কত দূরে বালু উত্তোলন করা যাবে, তা উল্লেখ থাকে। পারকির মতো ছোট সৈকতের পাশে নদী থেকে বালু উত্তোলনের প্রভাব কী হবে, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।’


তাঁরা আরও বলেন, শুরুতে এলাকার লোকজন বাধা দিয়েছিলেন। পুলিশও ঘটনাস্থলে এসেছিল। কিন্তু এখন আর কেউ বাধা দিচ্ছে না। এত বড় প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হলে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব কে মূল্যায়ন করবে? তাঁদের অভিযোগ, বালু উত্তোলনের কাজ করছে প্রিমিয়ার কোম্পানি। কিন্তু প্রকল্পস্থলের সাইনবোর্ডে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির নাম নেই। বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা।


এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার মো. সাইফুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


তবে প্রতিষ্ঠানটির হেড কন্ট্রাক্টর মনির হোসেন বিবার্তাকে বলেন, ‘বন্দরের আউটার এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের অনুমোদন রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের লোকজন নিজেরাই জাহাজ নিয়ে সেখানে অবস্থান করেন। কোথা থেকে বালু তোলা হচ্ছে, তা তাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন। বড় বড় সিসিটিভিও বসানো হয়েছে। আমাদের কোম্পানি ঢাকার প্রিমিয়ার কোম্পানি। আমাদের সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানও পাওয়ার গ্রিডের কাজে যুক্ত রয়েছে।’


আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।


তবে আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু জাফর মজুমদার বিবার্তাকে বলেন, ‘পারকি সৈকতসংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। কারা বালু উত্তোলন করছে, তা এখনো আমার নজরে আসেনি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। এ-সংক্রান্ত ভিডিও বা ছবি থাকলে আমাকে পাঠাতে পারেন।’


চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাইড্রোগ্রাফার (ফিল্ড) মোহাম্মদ গোলাম হোসাইন বলেন, ‘বন্দরের আউটার এলাকায় বালু উত্তোলনের জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন নিয়েছে। তবে আমাদের জানা মতে, চীনা একটি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিডের কাজ করছে। কারা বালু উত্তোলন করছে এবং কোথা থেকে নিচ্ছে, তা সরেজমিনে পরিদর্শন না করে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। শিগগিরই ওই এলাকায় গিয়ে বিষয়টি দেখব।’


অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এস্টেট শাখার ডেপুটি ম্যানেজার মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিন বলেন, ‘এ ধরনের কোনো বিষয় আমার নজরে আসেনি। সম্ভবত বন্দরের হাইড্রোগ্রাফার বিভাগ থেকে অনুমোদন নেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে ওই শাখায় যোগাযোগ করতে পারেন।’


পরিবেশ ও বালুমহাল-সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ এলাকায় অনুমতি ছাড়া বালু উত্তোলন দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে পারকি সৈকতসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর কোন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই স্থানের জন্য অনুমোদন রয়েছে কি না এবং উত্তোলিত বালু নির্ধারিত শর্ত মেনে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় কে নেবে—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের। বিশেষ করে ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের সার্ভিস এরিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় দ্রুত সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনের অনুমোদনপত্র, কার্যাদেশ ও উত্তোলনের নির্ধারিত স্থান প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে তদন্ত করে নদী, সৈকত ও টানেল সার্ভিস এরিয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা জরুরি।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com