
‘আমার বাবা ভালো বাবা, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে’ কথাগুলো বলতে বলতে এখনো হাউমাউ করে কাঁদে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইলের আলোচিত শিশুকন্যা তুবা বিনতে অরণি।
বাবার সঙ্গে অন্যায় কিছু না হোক, বাবা ভালো হয়ে ফিরে আসুন, এই কামনায় সোমবার দুপুরে বাবাকে তিন মাসের জন্য বিদায় জানিয়েছে ছোট্ট তুবা।
তুবার বাবা অনিক সরদারকে গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত চুরির অপবাদ দিয়ে বেঁধে রেখে মারধর করার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায় আহত বাবাকে বেঁধে রাখা অবস্থায় চা ও রুটি খাওয়ানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
পরে স্থানীয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং তুবা ও তার পরিবারের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়ায়। বামরাইলের স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা বিনতে অরণি।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তুবার বাবা বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার আলোচিত অনিক সরদারকে প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহায়তায় রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে (রিহ্যাব বা পুনর্বাসন কেন্দ্র) পাঠানো হয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণির স্কুলছাত্রী তুবা বিনতে অরণির জানায়, ভোররাতে একটি ছেলে বাবাকে আটকে মারধর করার খবর বাড়িতে দেয়। তখন সে, তার মা ও ছোট বোন ঘটনাস্থলে যায়।
তুবা বলে, ‘আমি গিয়ে দেখি বাবাকে বেঁধে রেখে মারছে সবাই, লাঠি দিয়া বাড়ি দিচ্ছে, লাত্থি দিচ্ছে। তখন আমি তাদের বলেছি, আমার বাবাকে আর মাইরো না, আমার বাবাকে তোমরা ছাইড়া দেও, আমার বাবাকে তোমরা বেঁধে রেখ না।’
‘…দেখতে পাই বাবার খুব ক্ষুুধা লাগছে। তখন একজন চা আর রুটি দিলে তা বাবাকে খাওয়াইয়া দেই। পরে অনেক বলতে বলতে বাবারে ছাড়ছে।
আর বাবারে বাসায় আনার পর আমি অনেক খুশি, এখন। যা বইলা বুঝাইতে পারব না। এখন বাবারে একটা কর্মের কিছু করে দিলে আমরা সবাই মিলে ভালো থাকতে পারব।’
তুবা আরো বলে, ‘ভোররাত সাড়ে ৪টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আমি আর আমার মা-বাবারে ছাইড়া দিতে বলছি। কিন্তু ওই জায়গার কিছু লোকে আমাদের খালি ঘুরাইছে। তারা একবারও ভাবে নাই, বাবার সঙ্গে আমি, আমার মা ও আমার ছোট বোন যে না খাওয়া। ক্ষুধা লাগলেও আমি বাবার কাছে বসেছিলাম। মা পাশেই ছিল।’
‘প্রথমে যারা বাবা-মায়ের সাইন নিছে, তারা আমাদের ওইদিনই বাড়ি ছাইড়া যাইতে বলছে। গতকালও অনেকে আসছে গ্রামছাড়া করতে, কিন্তু বাবা অসুস্থ থাকায় চলে গেছে। পরে ইউএনও স্যার আর বড় এক পুলিশ অফিসার আসার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। আজ আর কেউ আমাদের বাড়ি ছাড়তে বলেনি। আর এখন তো প্রত্যাশা বাবা ভালো হয়ে ফিরে আসুক, তার অপেক্ষায় থাকব। ফিরে এসে বাবা যদি কর্ম পায়, তাহলে আর আমাদের কষ্ট থাকবে না।’
তুবার মা জান্নাত বলেন, ‘ওই রাতে খবর পেয়ে আমরা সবাই দৌড়ে ঘটনাস্থলে যাই। তুবা তো স্যান্ডেল পরারও সময় নেয়নি, সোজা দৌড়ে বাবার কাছে গেছে। ওর সামনে ওর বাবারে যখন মারতে ছিলে, তখন তুবা খালি জোরে জোরে চিৎকার দিয়ে কানছে আর বাবারে মারতে নিষেধ করছে। কেউ ওর কথা প্রথমে শোনেনি, অনেকে তো ভিডিও কইর্যা মজাও নিছে।’
চুরির অপবাদে মারধরের শিকার অনিক সরদার দাবি করেছেন, পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে তার সঙ্গে এমন অত্যাচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার কাছ থেকে চুরির কোনো মালামাল যেমন উদ্ধার হয়নি, তেমনি কোনো প্রমাণও দেখাতে পারেনি। পরিকল্পনাকারীরা সবসময় চায় আমি যেন আমার পৈতৃক ভিটায় না থাকতে পারি।’
অনিক আরো বলেন, ‘কোনো মেয়ে চায় না তার বাবা আমার মতো ওই রাতের অবস্থায় থাক। আমিও তো চাইনি। আমার মেয়ে যখন আমাকে বেঁধে মারতে দেখেছে, তখন আমার তো মরে যেতে মন চাইছে। কারণ ওইরকম মর্মান্তিক দৃশ্য পৃথিবীতে আর আছে কি না, তা কেউ বলতে পারবে না। এখন আমি সবার সহযোগিতায় সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই।’
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]