
লালমনিরহাটে আদিতমারী উপজেলায় তিস্তা পাড়ের নিভৃত ডেওডোবা গ্রামে বাড়ীর উঠানে তখন শিশুদের গান ও বাদ্যযন্ত্রের তালিম চলছে। কারও হাতে দোতারা, কারও হাতে একতারা। কখনও ভেসে আসছে ভাওয়াইয়ার সুর, কখনও লালন, বাউল, মুর্শিদী কিংবা মারফতি গানের মরমি ধ্বনি। সেই গানের টানেই যেন নরওয়ে থেকে বাংলাদেশের এই প্রত্যন্ত গ্রামে এসে দাঁড়ালেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তিনি দেওডোবা গ্রামে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’ পরিদর্শন করেন। এ সময় শিশুদের লোকসংগীত চর্চা, লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ এবং সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন তিনি। শিশুদের কণ্ঠে গাওয়া গান ও বাজানো বাদ্যযন্ত্রের সুরে বিমোহিত হন তিনি। বিশেষ করে একতারা, দোতারা, সারিন্দা, বেহালা ও বাঁশির সুরে তিনি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
নরওয়ে রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। দীর্ঘ এক দশক ধরে ‘মায়ের তরী’ নীরবে যে কাজ করে যাচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু একটি দেশের অতীতকে ধারণ করে না, মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরিরও শক্তিশালী মাধ্যম। ‘মায়ের তরীর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ঐতিহ্য, লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্রের ধারাগুলোও পৌঁছে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাছে।
‘মায়ের তরী’র নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ জানান, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় বর্তমানে সংগঠনটির উদ্যোগে নয়টি ‘গুরুগৃহ’ পরিচালিত হচ্ছে। এসব গুরুগৃহে পাঁচ শতাধিক শিশু বাংলা লোকগান শিখছে। পাশাপাশি দুটি লোকবাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রায় ১২৫ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। প্রতি মাসে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ‘তরী’র একটি বিশেষ ক্লাসও পরিচালিত হয়।
মায়ের তরীর সদস্যরা জানান, প্রত্যেক গুরু নিজ নিজ বাড়িতে শিশুদের প্রশিক্ষণ দেন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশই প্রায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের সময়, শ্রম ও ভালোবাসায় শিশুরা শিখছে লালন, বাউল, মুর্শিদী, মারফতি, ভাওয়াইয়া ও পল্লিগান। পাশাপাশি বেহালা, একতারা, দোতারা, বাঁশি, তবলা, খমক ও সারিন্দাসহ হারিয়ে যেতে বসা লোকবাদ্যযন্ত্রেরও চর্চা করছে তারা।
মায়ের তরী পরিচালিত ডেওডোবা গ্রামে গুরুগৃহের গুরু লিপি দেবনাথ বলেন, কার্যক্রমটির বড় সীমাবদ্ধতা অর্থ ও সংরক্ষণ-সুবিধার অভাব। একটি আধুনিক স্টুডিও তৈরি করা গেলে প্রবীণ লোকশিল্পী ও শিশুশিল্পীদের গান-বাদ্য নিয়মিত রেকর্ড করে ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে লিখিতভাবে সংরক্ষিত নয়—এমন বহু গান ও সুরও হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।
‘মায়ের তরীর সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, ‘লোকসংগীত চর্চার মাধ্যমে শিশুদের আত্মশুদ্ধি ও জীবনবোধের বিকাশ’—এই চিন্তাকে ধারণ করেই কাজ করছে সংগঠনটি।
তিনি বলেন, ‘সীমিত সামর্থ্য, স্বেচ্ছাশ্রম আর ভালোবাসার ওপর ভর করেই এক দশক ধরে এগিয়ে চলছে ‘মায়ের তরী’। বড় কোনো অবকাঠামো নেই, নেই পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সুবিধাও। তবু গ্রামে গ্রামে বাড়ীর উঠানে উঠানে থামেনি গান।’
’শিশুদের হাতে একতারা, দোতারা কিংবা বাঁশি তুলে দেওয়ার এই প্রয়াস তাই শুধু গান শেখানোর উদ্যোগ নয়; এটি হারিয়ে যেতে বসা বাংলার সুর, শব্দ ও লোকঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ারও এক নিরলস চেষ্টা। আর সেই সুরের ভেলায় চড়ে দূর নরওয়ে ও বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে তৈরি হয়েছে সংস্কৃতির এক অনন্য সেতুবন্ধন।
‘মায়ের তরী’র গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নরওয়ের নাগরিক লেখক, লোকগবেষক, আলোকচিত্রী ও কবি মিস উয়েরা সেথের-এর নাম। তিনি প্রথম বাংলাদেশে আসেন ১৯৯৮ সালে। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদেরবুকে দক্ষিণ নামাজের চর এলাকায় বন্যা-পরবর্তী মানুষের জীবন দেখতে গিয়ে চরের নারীদের কণ্ঠে মারফতি ও মুর্শিদী গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। পরবর্তী সময়ে বাংলার লোকগানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে স্থানীয় শিল্পী ও সংগঠকদের নিয়ে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মায়ের তরী’। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রতি তার অনুরাগের আরেকটি দৃষ্টান্ত—লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে বই প্রকাশ।
নরওয়ে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সফরসঙ্গী ছিলেন ডেপুটি হেড অব মিশন আলেতজান্ডা ফাল্ক বাইডেন, প্রোগ্রাম অফিসার শাহপার সেলিম, স্ট্রমি ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডাইরেক্টর মিজানুর রহমান ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার চন্দন কুমার সরকার।
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]