রাবারের কষে বদলে যেতে পারে গারো পাহাড়ি জনপদের অর্থনীতি
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:০৮
রাবারের কষে বদলে যেতে পারে গারো পাহাড়ি জনপদের অর্থনীতি
জাহিদুল হক মনির, শেরপুর
প্রিন্ট অঅ-অ+

ভারত সীমান্ত ঘেঁষা শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের সন্ধ্যাকুড়া এলাকায় 'জিএস রাবার প্রকল্প' নামের একটি বাগানের রাবার গাছের কষে বদলে যেতে পারে এ পাহাড়ি জনপদের অর্থনীতি। স্থানীয়ভাবে এটি রাবার উৎপাদনের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত।


সন্ধাকুড়ার পাহাড়ে রাবারগাছের গায়ে জমতে থাকা প্রতিটি কষের ফোঁটা যেন সম্ভাবনারই বার্তা দিচ্ছে। হাজারো ফোঁটা মিলেই তৈরি হচ্ছে কোটি টাকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, বাজারব্যবস্থা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ পেলে এই রাবার বাগান শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, কর্মসংস্থান ও পর্যটনেরও নতুন দ্বার খুলতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।


প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তরে ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ে ১৯৮৯ সালে প্রায় ৮০ একর জমিতে রাবার বাগানটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন ইদ্রিস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত ইদ্রিস মিয়া। এ বাগানে বর্তমানে প্রায় আট হাজার রাবারগাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাত হাজার গাছ থেকে নিয়মিত কষ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব গাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ কেজি কষ সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতি কেজি কষের বর্তমান বাজারদর প্রায় ২৩৫ টাকা। বছরে প্রায় ৬০ টন রাবার বাজারজাত করা হয়। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা।


প্রতিদিন সকালে গাছ থেকে কষ সংগ্রহের পর তা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পরে দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো হয় উৎপাদিত রাবার। প্রকল্পে ম্যানেজার ও সহকারী ম্যানেজারসহ ১৬ জন কর্মচারী রয়েছেন। এ ছাড়া প্রতিদিন স্থানীয় আরও কয়েকজন শ্রমিক বাগানে কাজ করেন।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফুটতেই গাছের গায়ে বসানো ছোট ছোট পাত্রে টুপটাপ করে পড়তে থাকে রাবারের কষ। একেকটি ফোঁটা যেন পাহাড়ি জনপদের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার একেকটি গল্প। সারি সারি রাবারগাছের গায়ে বিশেষ কায়দায় কাটা দাগ থেকে বেরিয়ে আসা সাদা কষ সংগ্রহ করছেন শ্রমিকেরা।


বাগানের শ্রমিক মো. জৈমত আলী জানান, দীর্ঘদিন ধরে রাবারগাছ থেকে কষ সংগ্রহের কাজ করে তারা সংসার চালাচ্ছেন। বাগানের উৎপাদন ও কার্যক্রম আরও বাড়ানো গেলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।


তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকটও রয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, বিদেশি রাবার বাজারে আসায় দেশীয় রাবার উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সহায়তার অভাবে সম্ভাবনাময় এ শিল্প কাঙ্ক্ষিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না।


জিএস রাবার রাবার প্রকল্পের কোষাধ্যক্ষ মো. শফিকুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বাগান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ কেজি কষ সংগ্রহ করা হয়। তবে বিদেশি রাবার বাজারে আসায় দেশীয় রাবারের বাজার কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও ভালো বাজার ব্যবস্থাপনা পাওয়া গেলে এই শিল্প আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’


রাবার উৎপাদনের পাশাপাশি এই পাহাড়কে ঘিরে পর্যটনেরও সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সারি সারি রাবারগাছ, সবুজ পাহাড়, সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং গাছ থেকে কষ সংগ্রহের দৃশ্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।


ইদ্রিস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোতাসিম বিল্লাহ আরিফ বিবার্তাকে বলেন, জিএস রাবার প্রকল্পটি আমাদের কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মহোদয়ের একটি স্বপ্নের প্রকল্প ছিল। বর্তমানে এ রাবার বাগানে উৎপাদন ভালো হচ্ছে, তবে বাজারে বিদেশি রাবার প্রবেশ করায়, গুণগতমানসম্পন্ন এই রাবার বাজার হারিয়েছে। সরকারের নজরদারি ও সহযোগিতা পেলে এই রাবার থেকে লাভের মুখ দেখা সম্ভব।


শেরপুরের ওয়াইল্ডলাইফ রেঞ্জার মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন সাংবাদিককে বলেন, ‘এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই সুন্দর। রাবার আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ দেখার সুযোগের পাশাপাশি পাহাড়ি প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র করা গেলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান আরও বাড়বে। রাবার বাগানটি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com