
স্কুলছাত্রী মারিয়া মাহির মৃত্যু নিয়ে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে হত্যা মামলা, নয়জনের গ্রেফতার ও কারাভোগের পর ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার তথ্য সামনে এসেছে। এতে ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা— তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সিংগাইরের সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ১৪ বছরের মারিয়া মাহি ১৫ জুন স্কুল থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। ছয় দিন পর ২১ জুন চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থানসংলগ্ন ঝোপে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিবার এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে। পরদিন ২২ জুন মারিয়ার মা কামরুন্নাহার ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে প্রধান শিক্ষক, আইসিটি শিক্ষক ও সংবাদকর্মী এবং দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীসহ নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে আটজন জামিনে মুক্ত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও পুলিশ জানায়, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মারিয়ার মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি পুলিশ পর্যালোচনা করছে। তদন্তে শতভাগ ইনসাফ হবে।
তবে ময়নাতদন্তের তথ্য সামনে আসার পর হত্যা মামলায় আসামিদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশের তদন্ত কতটা এগিয়েছিল— সে প্রশ্নও উঠেছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে দৃশ্যমান আঘাত বা হত্যার স্পষ্ট আলামতের উল্লেখ নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অন্যদিকে মরদেহের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন থাকাকে হত্যার প্রমাণ হিসেবে দেখছে পরিবার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, কয়েকদিন গাছের ডালে ঝুলন্ত থাকায় টানা বৃষ্টিতে মরদেহটি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হতে পারে।
পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় মারিয়াকে ঘটনাস্থলের দিকে একাই যেতে দেখা গেছে। অন্য কারও সেখানে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে হত্যার মামলায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য- প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের আসামি করা ও গ্রেফতার করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যারা পরে জামিনে বেরিয়ে এসে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, তা এখনো বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ১০ জুন বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে মারিয়া ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখার অভিযোগ ওঠে। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ডেকে মুচলেকা নেয় এবং তাদের টিসি দেয়। এর পরই মারিয়া নিখোঁজ হয়।
মামলায় গ্রেফতার সংবাদকর্মী ইয়াকুব হোসেন মোল্লা ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ইয়াকুবের দাবি, তিনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সিসিটিভি ফুটেজ স্কুল প্রধানকে দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হাসান বিশ্বাসও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, মারিয়ার বাবা মিজানুর রহমান দেওয়ান বলেন, ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও তিনি তা বিশ্বাস করেন না। তার দাবি, মেয়ের নিখোঁজের পর কয়েকজন তাদের কাছে টাকা দাবি করেছিলেন মেয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে।
মারিয়ার মৃত্যুর পর হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও থানায় ঘেরাও কর্মসূচি হয়। তবে ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার তথ্য, সিসিটিভিতে একা ঘটনাস্থলের দিকে যাওয়ার তথ্য, সুরতহাল প্রতিবেদন এবং পরিবারের হত্যার অভিযোগ— সব মিলিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্তে এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বিবার্তা/হাবিবুর/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]