
লালমনিরহাটের পাটগ্রামে প্রতিদিনই মৃত্যুঝুঁকির সাক্ষী হচ্ছেন স্থানীয়রা। উপজেলার কুচলীবাড়ি ইউনিয়নের সমসের নগর এলাকার সিংগীমারী নদীতে একটি সেতু না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কাছে কলাগাছের ভেলায় নদী পারাপার যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন স্কুলে পৌঁছাতে তাদের একমাত্র ভরসা একটি ভেলা আর বুকভরা সাহস। যুগে যুগে জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসের বাণী শুনে গেলেও অদৃশ্য কারণে থমকে আছে সেতু নির্মাণের কাজ। ফলে স্থবির হয়ে আছে স্কুল, কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ ওই এলাকার প্রায় দুই হাজার মানুষের জীবনযাত্রা।
প্রতিদিন সকাল হলেই বই-খাতা বুকে চেপে ছোট ছোট শিশুরা নেমে পড়ে নদী পার হওয়ার এক অসম সংগ্রামে। সামান্য অসাবধানতা কেড়ে নিতে পারে একটি তাজা প্রাণ। তবুও শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহ আর স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পাড়ি দিচ্ছে তারা।
নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলে এই দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। তখন আতঙ্কে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেয়। পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময়ের দুই-তিন ঘণ্টা আগে নদীর ঘাটে এসে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রী আফসানা আক্তার জানায়, স্কুলে যাতায়াতে প্রতিদিন আমাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় হঠাৎ করে হাত থেকে বই-খাতা পানিতে পড়ে ভিজে যায়, স্কুলের ড্রেস নষ্ট হয়। এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো।
আরেক শিক্ষার্থী রিয়া মনি নিজের আতঙ্কের কথা জানিয়ে বলে, কলাগাছের ভেলায় করে স্কুলে যাতায়াত করতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। সবসময় খুব ভয়ে থাকি, এই বুঝি মাঝ নদীতে পড়ে গেলাম! নদীর ওপর একটি ব্রিজ হলে আমাদের যাতায়াত অনেক সহজ হতো। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, দ্রুত যেন একটি ব্রিজ করে দেওয়া হয়।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, চরম বিপাকে রয়েছেন সাধারণ মানুষও। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে বা গর্ভবতী নারীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে অবর্ণনীয় কষ্ট পোহাতে হয়। এলাকায় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছানোরও কোনো উপায় নেই। এছাড়া কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন কৃষকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোট পার হলেই তারা তা ভুলে যান। এভাবেই যুগের পর যুগ ধরে চলছে তাদের জীবন সংগ্রাম।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষিকা রহিমা বেগম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, নদীর ওপারে আমার বাসা। প্রতিদিন স্কুলে আসার সময় নৌকা বা ভেলাই একমাত্র ভরসা। এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে রোগীকে খাটিয়ায় করে হাসপাতালে নিতে হয়। স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা যখন নদী পার হয়, আমরা খুব ভয়ে থাকি কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে! স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের যাতায়াতের জন্য নৌকা কিংবা কলাগাছের ভেলা ব্যবহার হচ্ছে। ভেলা বা নৌকার অপেক্ষায় প্রতিদিন স্কুলে আসতে দেরি হয়ে যায়, ফলে প্রধান শিক্ষকের বকাঝকাও শুনতে হয়। আমরা এই দুর্ভোগ থেকে দ্রুত রেহাই চাই।
দীর্ঘদিনের এই জনদুর্ভোগের বিষয়টি অবশেষে উপজেলা প্রশাসনের নজরে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দীবজন মিত্র।
তিনি জানান, কুচলীবাড়ি ইউনিয়নের ওই এলাকার মানুষকে নদী পার হয়ে এপারে আসতে হয়, তাই সেখানে একটি ব্রিজ খুবই প্রয়োজন। মাননীয় মন্ত্রী (সাবেক উপমন্ত্রী) আসাদুল হাবিব দুলু স্যার পাটগ্রাম উপজেলায় এসেছিলেন এবং তিনি বিষয়টি অবগত হয়েছেন। উপজেলা প্রকৌশলীসহ কারিগরি টিম খুব দ্রুত জায়গাটি পরিদর্শন করবে। জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা ব্রিজটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।
সিংগীমারী নদীর ওপর একটি নিরাপদ সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘব হবে, যাতায়াত নিরাপদ হবে এবং আলোকিত হবে শিক্ষার পথ। এমনটাই প্রত্যাশা পাটগ্রামের কুচলীবাড়ি ইউনিয়নবাসীর।
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এসএম
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]