
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গাছে গাছে থোকায় থোকায় দুলছে বারী-১ জাতের সবুজ মাল্টা। রসে ভরপুর ও স্বাদে অনন্য এই ফল চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখেছেন প্রবাস ফেরত উদ্যোক্তা মহিদুল ইসলাম বাচ্চু। দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে নিজের জমিতে গড়ে তুরেছেন মাল্টা ফলেরবাগান। যা এলাকার মানুষের নজর কেড়েছে।
দৌলতপুর উপজেলার কাপড়পোড়া গ্রামের মহিদুল ইসলাম বাচ্চুর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি মাল্টা গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে অসংখ্য বড় বড় মাল্টা। ফলের ভারে অনেক ডাল মাটির দিকে নুয়ে পড়েছে। পুরো বাগানজুড়ে যেন সবুজ মাল্টার সমারোহ। বাগানে আসা দর্শনার্থী ও ক্রেতারাও গাছ থেকেসরাসরি ফল পেড়ে কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রায় চার বছর আগে দীর্ঘ প্রবাসজীবন (কুয়েত) শেষে দেশে ফিরে কৃষিতে ভাগ্য বদলের সিদ্ধান্ত নেন মহিদুল ইসলাম বাচ্চু। নিজের ৩ একর ১৭ শতক জমিতে তিনি গড়ে তোলেন বারী-১ জাতের মাল্টা, চায়না কমলা, লিচু ও পেয়ারার বাগান। শুরু থেকেই আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ, সুষম সার প্রয়োগ এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে বাগানের নিবিড় পরিচর্যা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে ৩৫০টি মাল্টা গাছ, ১০০টি কমলা গাছ, ৩০০টি পেয়ারা গাছ এবং রয়েছে লিচু গাছ।
এর মধ্যে গত বছর থেকে মাল্টা ও পেয়ারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। ৪ বছরের পরিশ্রম, পরিচর্যা ও পরিকল্পনায় বাগানটি এখনবাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনক্ষম হয়ে উঠেছে।
উদ্যোক্তা মহিদুল ইসলাম বাচ্চু জানান, শুরুতে অনেকেই মাল্টা চাষে ঝুঁকি রয়েছে বলে তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। গত বছর বাগান থেকে প্রথমবারের মতোবাণিজ্যিকভাবে ফল বিক্রি করে প্রায় আড়াই লাখ টাকা আয় করেন।
এ বছর আবহাওয়া অনুক‚লে থাকায় এবং আধুনিক প্রযুক্তি ওসঠিক পরিচর্যার কারণে ফলন গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। চলতি মৌসুমে সব খরচ বাদ দিয়ে সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখটাকা নিট লাভের আশা করছেন তিনি।
বাচ্চু আরও জানান, মাল্টার বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে। বাগানের ফল দেখতে ও কিনতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। এতে একদিকে যেমন সরাসরি ক্রেতার কাছে ফল বিক্রি করতে পারছেন, অন্যদিকে বাজারজাতকরণের খরচও কিছুটা সাশ্রয়ী হচ্ছে।
এদিকে মহিদুল ইসলাম বাচ্চুর মাল্টা বাগান পরিদর্শনে গিয়েদৌলতপুর উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা আলী আহমেদ বলেন, উদ্যোক্তা মহিদুল ইসলাম বাচ্চু বারী জাতের মাল্টা চাষ করেছেন। এ জাতের মাল্টা অত্যন্ত ফলনশীল। সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ এবং যথাযথ পরিচর্যা করা হলে ফলন আরও বৃদ্ধি পাবে।
একই সঙ্গে ফলের আকার, গুণগত মান ও স্বাদও আরও উন্নত হবে। দেশের মাটিতে উৎপাদিত মহিদুলের মাল্টার ফলন ও গুনগত মান বেশ ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতার বিষয়ে আলী আহমেদ বলেন, দৌলতপুর উপজেলায় এ ধরনের কৃষি উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। প্রতি মাসে অন্তত দুইবার বাগান পরিদর্শন করে গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। মাল্টা বাগানে বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই দেখা দিতে পারে। এসব রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত করে কৃষকদের সার ও কীটনাশক সঠিক মাত্রায় এবং যথাসময়ে ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বাগানের পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণেও নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।
বাগানে আসা স্থানীয় ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সরাসরি গাছ থেকে টাটকা মাল্টা কিনতে পেরে সন্তুষ্ট। তাদের দাবি, বাজারের আমদানি করা মাল্টার তুলনায় বাচ্চুর বাগানের মাল্টা বেশি সতেজ ও সুস্বাদু। গাছ থেকে সরাসরি ফল সংগ্রহ করে কেনার সুযোগ থাকায় ক্রেতাদের মধ্যে আগ্রহও বেশি। পাশাপাশি বাজারদরের তুলনায় দাম তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই বাগানে আসছেন মাল্টা
কিনতে।
এদিকে মহিদুল ইসলাম বাচ্চুর সাফল্য দেখে এলাকার বেকার যুবকদের মধ্যেও মাল্টা চাষে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনই অনেকে তার বাগান পরিদর্শনে এসে বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষের পদ্ধতি, পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে পরামর্শ নিচ্ছেন।
মাল্টা চাষের বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহানা পারভীন বলেন, মহিদুল ইসলাম বাচ্চু একজন পরিশ্রমী ও আধুনিকমনস্ক কৃষক। প্রবাস থেকে ফিরে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি যেভাবে মাল্টার বাগান গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কৃষি অফিস থেকে তার বাগানের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে তাকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাকে দেখেএলাকার অন্য কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তারাও আধুনিক এবং উচ্চমূল্যের ফল চাষে উৎসাহিত হতে পারেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ফলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে মাল্টা উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মহিদুল ইসলাম বাচ্চুরউদ্যোগ তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, সম্ভাবনাময় ফলচাষে স্থানীয় তরুণদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিবার্তা/শরীফুল/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]