
কুষ্টিয়ায় প্রশিক্ষিত ডুবুরির অভাবে বাড়ছে প্রাণহানির ঘটনা। গত এক মাসেরও কম সময়ে পানিতে ডুবে শিশুসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রশিক্ষিত ডুবুরি থাকলে প্রাণহানির সংখ্যা কমেআসতো বলে সচেতন মহলের অভিমত।
কুষ্টিয়াকে ঘিরে রয়েছে ছোট-বড় অন্তত ৮টি নদ-নদী। রয়েছে অসংখ্য খাল-বিল। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসনা, কালীগঙ্গা,কুমার ও সাগরখালীর মতো নদীর ও খাল বিলের সঙ্গে জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা ও চলাচল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদীকেন্দ্রিক এই জেলায় প্রায়ই ঘটছে পানিতে ডুবে নিখোঁজ হওয়াসহ মৃত্যুর ঘটনা। অথচ নদীবেষ্টিত এই কুষ্টিয়ায় ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল নেই। ফলে নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রায় দেড় শ কিলোমিটার দূরের খুলনা থেকে ডুবুরি দলের আসার অপেক্ষায় থাকতে হয় স্বজনদের। এতে দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমার পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কোনো ঘটনায় এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় স্বজনদের। আবার কোনো সময় ভেসে ওঠা মরদেহ নিয়ে স্বজনদের আহাজারি বাড়ে, আবার অনেক সময় মরদেহের সন্ধানও মেলেনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, চলতি আগস্ট মাসেই কুষ্টিয়ারবিভিন্ন নদীতে ডুবে শিশুসহ একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
৫ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড় ধসে নূরী খাতুন (৫) ও জামিলা খাতুন (৮) নদীতে পড়ে যায়। স্থানীয়রা জামিলাকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও নিখোঁজ নূরীর মরদেহ একদিন পর মিরপুর উপজেলার পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। ১৪ আগস্ট সকালে কুমারখালীর শিলাইদহ পদ্মা ঘাটে নিখোঁজ হয় ৮ বছরের শিশু আলিফ হোসেন। পরে সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৪ আগস্ট কুমারখালী পৌরসভার এম এন বাঁধ এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে গড়াই নদীতে ডুবে মারা যান জেলে পরিমল মণ্ডল (৩৮)।
সর্বশেষ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে দৌলতপুরের ভাগজোত ঘাটে পদ্মা নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় মাদ্রাসাছাত্র মোস্তাকিম হোসেন (১২)। স্থানীয়রা এ সময় আরেক শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও মোস্তাকিমকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়ায় নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় ওই দিনউদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়।
স্থানীয়রা জানায়, নদীতে কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছালেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় অনেক সময় তারাকার্যকরভাবে অভিযান শুরু করতে পারেন না। স্থানীয়রা নৌকা, জাল কিংবা দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। তবে প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক ডাইভিং সরঞ্জামের বিকল্প এসব উপকরণ নয়।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাহাব উদ্দীন মিলন স্থানীয় এক গণমাধ্যম কর্মীকে বলেন, যে জেলায় পদ্মা ও গড়াইয়ের মতোপ্রমত্ত নদী রয়েছে, সেখানে স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকা হতাশাজনক। অবিলম্বে কুষ্টিয়ায় স্থায়ী ডুবুরি দল মোতায়েন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ফায়ার স্টেশনে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা দরকার।’
দৌলতপুরের ইসলামপুর এলাকার অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন বলেন, পদ্মা নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনেরা একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শঙ্কায় থাকেন, অন্যদিকে কখনউদ্ধারকারী দল আসবে, সেই অপেক্ষাও করতে হয়। স্থানীয়রা নৌকা, জাল ও দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক সরঞ্জামের বিকল্প তাঁরা হতে পারেন না।
পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সুযোগ থাকে। কিন্তু দূরের জেলা খুলনা থেকে ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সেই সম্ভাবনা অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেন বলেন, কুষ্টিয়া একটি নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় এখানে নৌ- দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। জেলা পর্যায়ে আলাদা ডুবুরি দল না থাকায় বিভাগীয় শহর খুলনার ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিটি দুর্ঘটনায় খুলনার ডুবুরি দলের অপেক্ষা করতে গিয়ে আমরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি। জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ডুবুরি দল গঠনের প্রয়োজনীয়তাজানিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
নদীবেষ্টিত কুষ্টিয়ায় ডুবুরি দল না থাকায় প্রতিটি দুর্ঘটনায় খুলনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ নদীতে নিখোঁজের পর প্রতিটি মুহুর্তই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে যত দেরি হয়, জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও তত কমে যায়। তাই দূরের জেলার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কুষ্টিয়ায় প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল গঠন এবং ঝুঁকিপূর্ণ নদীঘাটগুলোতে আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিতকরার দাবি দীর্ঘদিনের।
তাই নদীবেষ্টিত কুষ্টিয়ার মানুষ পানিতে নিখোঁজ হবে, স্বজনেরা তীরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবেন আর উদ্ধারকারী দলের জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে দেড় শ’ কিলোমিটার দূরের খুলনার দিকে নদীবেষ্টিত একটি জেলার জন্য এমন বাস্তবতা কতটা যৌক্তিক, এখন সেই প্রশ্নই সবার সামনে এসেছে। আর এমটিমনে করেন সচেতন মহল।
বিবার্তা/শরীফুল/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]