
বয়স ৬৫ পেরিয়েছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও থামেনি মানুষের জন্য তার ছুটে চলা। নিজের ছোট্ট মুদি দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালালেও মানুষের নিরাপত্তাকে দিয়েছেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে কোনো নিয়োগপত্র, বেতন কিংবা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই রেলগেট কিপারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন লালমনিরহাট পৌরসভার খোঁচাবাড়ি মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা বেলাল হোসেন।
দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে রেললাইনের পাশে ছোট্ট মুদি দোকানে। কিন্তু দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শুনলেই বদলে যায় তার ব্যস্ততা। মুহূর্তেই দোকান ছেড়ে ছুটে যান রেলগেটের কাছে। যানবাহন ও পথচারীদের রেললাইন পারাপার বন্ধ করে নিশ্চিত করেন নিরাপদ চলাচল। ট্রেন চলে গেলে আবার ফিরে আসেন নিজের দোকানে।
এভাবেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে গেছে। দেখতে দেখতে এই দায়িত্ব পালনের ২৭ বছর পার করেছেন বেলাল হোসেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই রেলগেটে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী গেটকিপার না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পারাপার করেন মানুষ। প্রতিদিন অটোরিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন রেললাইন অতিক্রম করে। পাশাপাশি পায়ে হেঁটেও চলাচল করেন অনেকে। ফলে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এই ঝুঁকির মধ্যেই মানুষের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে নিজের মতো করে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বেলাল।
লালমনিরহাট থেকে আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা হয়ে পাটগ্রামের বুড়িমারী পর্যন্ত চলাচলকারী রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশে প্রতিদিন একাধিক যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। ট্রেন চলাচলের সময় সামান্য অসতর্কতাও ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আর সেই দুর্ঘটনা এড়াতেই বছরের পর বছর ধরে সতর্ক প্রহরীর মতো রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন বেলাল হোসেন।
বেলাল হোসেন বলেন, আমি কোনো বেতন বা সুযোগ-সুবিধার জন্য এই কাজ করি না। এত বছর ধরে মানুষকে নিরাপদে রেললাইন পার হতে সাহায্য করছি। ট্রেন আসার খবর পেলেই দোকান রেখে গেটে চলে যাই। যতদিন পারি মানুষের জন্য এই কাজ করে যেতে চাই।
তার এই দীর্ঘদিনের দায়িত্ব পালনের কথা জানেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাদের ভাষ্য, বেলাল হোসেন না থাকলে এই রেলগেট দিয়ে মানুষের চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠত।
স্থানীয়রা বলেন, বেলাল চাচা দীর্ঘদিন ধরে নিজের দায়িত্ব মনে করে রেলগেট পাহারা দিচ্ছেন। তিনি না থাকলে কখন যে দুর্ঘটনা ঘটে, বলা যায় না। রেলওয়ের উচিত এখানে দ্রুত একজন স্থায়ী গেটকিপার নিয়োগ করা।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—২৭ বছর ধরে যিনি বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের নিরাপত্তার জন্য দায়িত্ব পালন করছেন, তার এই অবদানের মূল্যায়ন হবে কবে?
বেলালের এই দায়িত্ব পালনের পেছনে নেই কোনো নিয়োগপত্র। নেই মাসিক বেতন। নেই সরকারি সুযোগ-সুবিধাও। তারপরও দায়িত্ব পালনে তার কোনো ক্লান্তি নেই। নিজের জীবিকার তাগিদে দোকান চালানোর পাশাপাশি মানুষের জীবন রক্ষার কাজটিকেও তিনি যেন নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু বেলাল হোসেনের ওপর নির্ভর করে এমন গুরুত্বপূর্ণ রেলগেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রেলওয়ের উচিত দ্রুত এখানে একজন স্থায়ী গেটকিপার নিয়োগ করা। একই সঙ্গে দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে স্বেচ্ছায় মানুষের নিরাপত্তায় অবদান রাখায় বেলাল হোসেনকে সম্মাননা বা উপযুক্ত স্বীকৃতি দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ম্যানেজার মোহাম্মদ তসলিম আহমেদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, লালমনিরহাটের ওই রেলগেটে গেটকিপার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
রেলপথের নিরাপত্তা নিয়ে যখন বারবার দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, তখন ৬৫ বছর বয়সী বেলাল হোসেন যেন হয়ে উঠেছেন এক নীরব প্রহরী। রাষ্ট্রীয় কোনো পরিচয়পত্র নেই, নেই বেতনের নিশ্চয়তা—তবুও ২৭ বছর ধরে মানুষের নিরাপদ পথচলার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—বেলালের এই দীর্ঘদিনের অবদান যেন হারিয়ে না যায়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্রুত স্থায়ী গেটকিপার নিয়োগের পাশাপাশি এই নীরব স্বেচ্ছাসেবকের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি দেবে। কারণ মানুষের জীবন রক্ষায় ২৭ বছরের এই দায়িত্ববোধ শুধু একটি গল্প নয়—এটি মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]