
বাস্তব জীবন মাঝেমধ্যে সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় সাবেক স্কুলশিক্ষকসহ এক পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার লোমহর্ষক ঘটনাটি এখন ঢাকা পড়ে গেছে অদ্ভুত এক ‘ক্লোন-শার্ট’ রহস্যের নিচে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনরা খুনের মোটিভ খোঁজার চেয়ে বেশি ব্যস্ত- একজন ডিবি পুলিশ অফিসার এবং প্রধান আসামির গায়ে ঠিক একই মলাটের, একই সুতোর শার্ট এলো কীভাবে, তা নিয়ে।
ইতিহাসে অনেক খুনের ক্লু পাওয়া গেছে ছেঁড়া কাপড় বা বোতাম দেখে, কিন্তু আসামির গায়ের আস্ত একটা শার্ট যে পুরো মামলার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, তা হয়তো দেশের অপরাধ ইতিহাসে প্রথম।
সেই ‘নিখোঁজ’ গেঞ্জি ঘটনার আকস্মিকতা বাড়িয়েছেন প্রধান আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস। তিনি এক অবিশ্বাস্য দাবি তুলে পুরো তদন্তের দিকে আঙুল তুলেছেন। তার ভাষায়"রবিবার রাতে পুলিশ যখন আমার ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায়, তখন ওর গায়ে ছিল একটা সাধারণ গেঞ্জি। কিন্তু পরদিন টিভিতে দেখি ওর গায়ে একটা দামি ডিজাইনের শার্ট! আমার ছেলের এই জন্মে এমন কোনো শার্ট ছিলই না। গেঞ্জি পরা ছেলে কীভাবে শার্ট পরে ফিরল?"
রংপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী যেদিন ঘটনাস্থলে তদন্তে যান, তার পরনে ছিল ছাই-নীল আর সাদার কম্বিনেশনের একটি স্ট্রাইপ শার্ট। এর ঠিক পরপরই যখন আসামি সিদ্ধার্থকে পুলিশ মিডিয়ার সামনে আনে, দেখা যায় সিদ্ধার্থের গায়েও অবিকল সেই একই শার্ট!
নেটিজেনদের বড় একটা অংশ একে পুরোনো ‘জজ মিয়া’ নাটকের আধুনিক সংস্করণ বলে ট্রল শুরু করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, আসামিকে কি তাড়াহুড়ো করে কোনো কারণে পুলিশেরই অতিরিক্ত শার্ট পরিয়ে হাজির করা হয়েছিল?
‘আড়ং’ ব্র্যান্ডের ঢাল এবং পুলিশের আত্মপক্ষ সমর্থন তীব্র সমালোচনা আর ট্রলের মুখে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছেন ডিবি কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী। সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন: "এটি সম্পূর্ণ একটি প্রোপাগান্ডা। আমি যে শার্টটি পরেছি তা দেশীয় ব্র্যান্ড ‘আড়ং’-এর। আড়ং কি এই শার্ট শুধু একটা বানিয়েছে? বাজারে এমন হাজার হাজার শার্ট আছে।কাকতালীয়ভাবে আসামির পছন্দ আর আমার পছন্দ মিলে গেছে, ব্যাস এতটুকুই।"
পুলিশের দাবি, আটকের পর থেকেই আসামির গায়ে ওই শার্টটি ছিল, তারা কোনো পোশাক পরিবর্তন করাননি।
অনেকে আবার এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, শার্টের এই তুমুল বিতর্কের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক পরিবারের চারজন মানুষকে হারিয়ে ফেলার নির্মম সত্য। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছাদ টপকে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত জিলা স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে এবং ১১ বছরের ছোট ছেলেকে ঠান্ডা মাথায় খুন করে প্রতিবেশী এই তরুণেরা।
এমনকি খুনের পর তারা ফ্রিজ খুলে শসা ও খেজুর খেয়ে বাথরুমে গোসল করে বীরদর্পে বেরিয়ে যায়।
আসামিরা আদালতে অপরাধ স্বীকার করলেও, মানুষের মন থেকে ‘শার্ট রহস্য’ কাটছে না। এটি কি আসলেই আড়ংয়ের গণ-উৎপাদনের একটি নির্মম কাকতালীয় উদাহরণ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অন্ধকার অধ্যায়- তা হয়তো সময়ই বলে দেবে।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]