
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় সাবেক জিলা স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে স্থানীয় দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করেছে এবং তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের দেওয়া এই 'সহজ' বিবরণী মেনে নিতে পারছেন না খোদ ভিকটিমের পাশের বাড়ির বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিহতের এক নিকটতম প্রতিবেশীর (অনন্যা কুহু) উত্থাপন করা কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন এখন মামলার মোড় ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
১. শিনশিনে চেহারার দুই যুবকের পক্ষে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কি সম্ভব?
পুলিশের ভাষ্যমতে, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে এই দুই যুবক। এরপর একে একে পরিবারের বাকি সদস্যদেরও হত্যা করা হয়। কিন্তু প্রতিবেশীদের দাবি, নিহত গণপতি স্যার ছিলেন স্বাস্থ্যবান ও বেশ লম্বা মানুষ। তাঁর তুলনায় গ্রেফতারকৃত দুই যুবকের শারীরিক গঠন অত্যন্ত সাধারণ এবং ক্ষীণ। প্রশ্ন উঠছে, এই দুজন মিলে কীভাবে একজন হৃষ্টপুষ্ট মানুষ এবং তাঁর পরিবারের চারজন সদস্যকে (যার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক কন্যাও রয়েছেন) কোনো বড় প্রতিরোধ ছাড়াই একা কাবু করে ফেলল?
২. চারটা খুনেও মেলেনি কোনো আওয়াজ!
সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে চারপাশের নীরবতায়।
ভিকটিমের ঠিক পেছনের বাড়ির বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন ওই পরিবারটির সামান্য কোলাহলেও যেখানে প্রতিবেশীদের ঘুম ভেঙে যেত, সেখানে এত বড় একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রাতে আশপাশের কেউ বিন্দুমাত্র চিৎকার বা ধস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পেলেন না কেন? গণপতি স্যার কিংবা তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা কি একবারের জন্যও বাঁচার জন্য চিৎকার দেওয়ার সুযোগ পাননি? ছাদ কিংবা সিঁড়িঘর থেকে আসা কোনো আওয়াজ কেন প্রতিবেশীদের কানে পৌঁছাল না?
৩. খুনের পর ঠাণ্ডা মাথায় 'ভোজ ও গোসল': কতটা বাস্তবসম্মত?
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, খুনের পর খুনিরা অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করেছে; তারা ফ্রিজ থেকে শসা ও খেজুর বের করে খেয়েছে, বাথরুমে গিয়ে গোসল করেছে এবং দীর্ঘ ৬-৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতেই অবস্থান করেছে।
প্রতিবেশীদের প্রশ্ন, দুজনেরই বাড়ি যখন ঠিক পাশেই, তখন খুনের পর নিজ বাসায় না ফিরে এমন চরম আতঙ্কের মুহূর্তে ওই বাড়িতে বসে ধীরেসুস্থে খাওয়া-দাওয়া করা এবং গোসল করার মনস্তত্ত্ব কোনো অপেশাদার মাদকাসক্ত যুবকের হতে পারে কি? নাকি এটি কোনো পরিকল্পিত বড় চক্রের কাজ, যারা অপরাধের প্রমাণ মুছে দিতে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিল?
৪. পেশাদার খুনি বনাম দ্রুত স্বীকারোক্তি
পুলিশ দাবি করেছে, আসামিরা আলামত নষ্ট করতে মোবাইল ডিটারজেন্ট পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল এবং সোনার গহনা লুটের চেষ্টা করেছে। আবার একই সাথে তারা আধা-খাওয়া শসা এবং খেজুরের বিচি ফেলে গেছে, যা থেকে ডিএনএ পরীক্ষা করছে পুলিশ। একদিকে আলামত নষ্টের এত নিখুঁত পেশাদারিত্ব, অন্যদিকে নিজেদের ডিএনএ-র প্রমাণ রেখে যাওয়া এবং গ্রেফতারের পরপরই কোনো রিমান্ড ছাড়াই আদালতে সহজে দোষ স্বীকার করে নেওয়া— পুরো বিষয়টিকে স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রতিবেশীদের কাছে একটি 'সাজানো নাটক' বা ঘটনার আড়ালের মূল হোতাদের আড়াল করার চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে।
৫. ঘটনার নেপথ্যে কি তবে মাদক ছাড়া অন্য কিছু?
নিহতের প্রতিবেশীদের দৃঢ় বিশ্বাস, শুধু মাত্র 'মাদক সেবনে বাধা দেওয়া'র মতো একটি সাধারণ কারণে একই পরিবারের চারজনকে এভাবে ঠাণ্ডা মাথায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব নয়। এর পেছনে জমিজমা, পূর্বশত্রুতা কিংবা বড় কোনো অপরাধী চক্রের হাত থাকার সম্ভাবনা প্রবল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত মামলা শেষ করার তাড়াহুড়ো এবং ঘটনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক গোপন করার চেষ্টা স্থানীয়দের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
৬.আগামীর মোবাইল থেকে এসএমএস দিয়েছিল কারা?
শুক্রবার ভোর ৫টা ৫০ মিনিট এ প্রয়াত আগামীর মোবাইল থেকে কে বা কাহারা এসএমএস করেছিল, তবে কি আগামী সে সময় পর্যন্ত বেঁচে ছিল নাকি অন্য কেউ আগামীর মোবাইল থেকে এসএমএস দিয়েছিল, সত্যি কোনটা?
আর পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও সেই বাসার বিদ্যুৎ কে বা কাহারা বন্ধ করেছিল, বিদ্যুৎ অফিস এ কি তারা তাদের সমস্যার কথা জানিয়েছিল?
মাছুয়াপাড়ার সাধারণ মানুষ এবং নিহতের প্রতিবেশীরা এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের একটি নিরপেক্ষ এবং সুগভীর তদন্ত দাবি করছেন। শুধু বাহ্যিক দুটি ছেলেকে সামনে এনে প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডদের আড়াল করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রশাসনের দায়িত্ব। এই চার খুনের পেছনে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্য উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত রংপুরের মানুষের মনের আতঙ্ক কাটবে না।
অন্যান্য প্রতিবেশীর মত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনন্যা কুহু'র করা প্রশ্ন গুলোর উত্তর কি মিলবে,না কি?
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]