বিবার্তায় সংবাদ প্রকাশের পর ঠাকুরগাঁওয়ে ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানের উপবৃত্তি বন্ধ!
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৭
বিবার্তায় সংবাদ প্রকাশের পর ঠাকুরগাঁওয়ে ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানের উপবৃত্তি বন্ধ!
ঠাকুরগাঁও প্রতিবেদক
প্রিন্ট অঅ-অ+

জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন ও ভুয়া প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও সরকারি উপবৃত্তি ও অনুদান পাওয়া ঠাকুরগাঁওয়ের সেই ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’র উপবৃত্তি বন্ধ করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিবার্তা২৪ডট নেট সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ভুয়া প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর নতুন করে লিখিত আবেদন করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।


মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের দাখিল ও ইবতেদায়ী শাখার সহকারী পরিচালক ইবাদাৎ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর উক্ত অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত উপবৃত্তি স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অধিকতর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।


এদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সরদার মোস্তফা শাহিন জানিয়েছেন, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি সুবিধা নেওয়ার অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


নথি ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ১৯ নম্বর বেগুনবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব বেগুনবাড়ী এলাকায় ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’ (পুরাতন কোড: ৮০০৫০১২৯০৪, নতুন কোড: ০০১১৩৮২০২৫) নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব নেই। অথচ কাগজ সর্বস্ব এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানটির নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থ ও উপবৃত্তি উত্তোলন করা হচ্ছিল। সম্প্রতি জাতীয় গণমাধ্যমে ‘ঠাকুরগাঁওয়ে ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান, অস্তিত্ব নেই তবুও মিলছে উপবৃত্তি’ শিরোনামে বিস্তারিত অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর পরপরই স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের পক্ষে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর পুনরায় প্রতিকার চেয়ে আবেদন করা হয়।


অভিযোগে জানা যায়, ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রকৃত ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’টি পরবর্তীতে দাখিল পর্যায়ে উন্নীত হয়ে ২০০২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। তবে একটি প্রভাবশালী জালিয়াতি চক্র পূর্বের ইবতেদায়ী শাখার নাম ও কোড নম্বর জালিয়াতি করে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে একটি অস্থায়ী টিনের ঘর তুলে ভুয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চালায়। প্রকৃত দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষকেরা এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন।


এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে এলাকাবাসীর পক্ষে ফারুক হোসেন নামের এক ব্যক্তি জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে সরজমিন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ঐ বছরের ৬ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষা অফিসার সরজমিন তদন্ত চালিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন, যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়—উক্ত নামে বাস্তবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যমান নেই। তদন্তকালে তথাকথিত প্রধান শিক্ষক শাহিনুর আলম কোনো বৈধ কাগজপত্র বা শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত রেজুলেশন দেখাতে পারেননি। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।


পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঠাকুরগাঁও একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে। দুদকের দীর্ঘ তদন্তেও এই গায়েবি মাদ্রাসার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষে দুদক ভুয়া প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধের পাশাপাশি তৎকালীন ও বর্তমান শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। অভিযোগ রয়েছে, দুদকের সুপারিশপ্রাপ্ত সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সৈয়দ মো. মোকাদ্দেশ ইবনে সালাম ও সম্প্রতি অবসরে যাওয়া সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমানের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটি এতদিন অবৈধভাবে সরকারি সুবিধা পেয়ে আসছিল।


স্থানীয়দের অভিযোগ, পূর্ব বেগুনবাড়ী দাখিল মাদ্রাসার সুপার আব্দুল মতিনের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে কথিত প্রধান শিক্ষক শাহিনুর আলম এই ভুয়া মাদ্রাসাটি দাঁড় করান। নিজেদের আত্মীয়স্বজনদের কাগজপত্রে শিক্ষক বানিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। এমনকি জালিয়াতি নির্বিঘ্ন করতে সুপার আব্দুল মতিন কৌশলে ভুয়া মাদ্রাসার কথিত প্রধান শিক্ষক শাহিনুর আলমকে প্রকৃত দাখিল মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বানান।


দুদক ও জেলা প্রশাসনের তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এবার উপবৃত্তি বন্ধের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়ে এলাকাবাসী অবিলম্বে এই ভুয়া কোড বাতিল, এমপিওভুক্তির চক্রান্ত নস্যাৎ এবং জালিয়াতির মূল হোতা আব্দুল মতিন ও শাহিনুর আলমসহ জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।


বিবার্তা/বিধান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com