
মাত্র ২৭ লিটার দুধ নিয়ে শুরু হওয়া একটি ছোট্ট উদ্যোগ আজ পূর্ণাঙ্গ কারখানায় রূপ নিয়েছে। ঠাকুরগাঁও শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকার উদ্যোক্তা মাসুমা খানমের হাত ধরে এখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে মানসম্মত মোজারেলা চিজ, পনির ও ঘি। তাঁর এই উদ্যোগ কেবল নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এলাকার দুস্থ ও স্বল্প আয়ের নারীদেরও। মাসুমার উৎপাদিত এসব পণ্য রাজধানীর রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুড শপে সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে।
একসময় অভাব-অনটনে দিশেহারা মাসুমা আজ জেলার পরিচিত ও সফল নারী উদ্যোক্তাদের একজন। শহরের নিশ্চিন্তপুরে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বেসরকারি সংস্থার কারখানা ভাড়া নিয়ে ২০১২ সালে পনির তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ লিটার দুধ প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি মোজারেলা চিজ উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া চাহিদা অনুযায়ী পনির ও ঘি তৈরি করা হচ্ছে। উৎপাদিত এসব পণ্য রাজধানীর রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুড শপে সরবরাহের পাশাপাশি একটি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে কারখানার কর্মী গোলাপি আক্তার জানান, সংগৃহীত দুধ ছেঁকে পাস্তুরাইজ করার পর কালচার, ক্যালসিয়াম ও রেনেট মিশিয়ে জমাট বাঁধা হয়। এরপর বিশেষ ফ্রেম দিয়ে কেটে কয়েকটি ধাপ পার করে তৈরি হয় মোজারেলা চিজ। প্রতি কেজি পনির প্রায় ৮০০ টাকা এবং ঘি ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়িক সাফল্যের চেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকেই বড় অর্জন মনে করেন মাসুমা খানম। বর্তমানে তাঁর কারখানায় নয়জন নারী নিয়মিত কাজ করছেন। তাঁদের একজন সোনিয়া আক্তার জানান, ২০১৬ সাল থেকে এখানে কাজ করে তিনি সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাচ্ছেন। আরেক কর্মী সুমি আক্তারও নিজের আয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার কথা জানান।
মাসুমার এই পথচলা সহজ ছিল না। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাসের পর ইয়ার মাহমুদ খানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৮২ সালে স্বামী অসুস্থ হয়ে চাকরি হারালে দুই সন্তান নিয়ে শুরু হয় কঠোর সংগ্রাম। জীবন বাঁচাতে মুন্সিগঞ্জ থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে ননদের বাসায় এসে পুরোনো কাপড় ও লোহা কেনাবেচার কাজও করতে হয়েছে তাঁকে।২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারিতে বড় ধাক্কা সামলাতে হয় এই উদ্যোক্তাকে। রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় আটকে যায় প্রায় ৮০ লাখ টাকার বকেয়া। সেই ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না পারলেও হাল ছাড়েননি তিনি। সব খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ থাকে তাঁর। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে 'শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা' এবং ২০২৫ সালে রংপুর বিভাগের শ্রেষ্ঠ 'জয়িতা' সম্মাননা পান মাসুমা খানম। অদম্য এই নারী ভবিষ্যতে কারখানাটি আরও বড় করে আরও বেশি অসহায় নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চান।
বিবার্তা/বিধান/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]