
কক্সবাজারের পর্যটননির্ভর এলাকা কলাতলীতে দীর্ঘ একযুগ ধরে চলমান পাহাড় কাটার ভয়াবহ চিত্র নতুন করে সামনে এসেছে। শহরের কলাতলী বাইপাস সড়কের বিকাশ বিল্ডিং সংলগ্ন ঝিলংজা মৌজার ১৭০৫০ দাগভুক্ত পাহাড় শ্রেণির প্রায় এক একর আয়তনের একটি বিশাল পাহাড়কে খণ্ড খণ্ড করে অন্তত পাঁচটি স্পটে কাটা হচ্ছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে। এতে ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি ঘনফুট মাটি অপসারণ করা হয়েছে এবং ওই পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ১০টি প্লট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের একাধিক অভিযান, মামলা ও সরঞ্জাম জব্দের পরও রহস্যজনকভাবে থামছে না এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। বরং গত ছয় মাস ধরে প্রকাশ্যেই দিন-রাত পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ ইউনুস জানান, পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের জিজ্ঞাসা করলে তারা প্রকাশ্যেই দাবি করে “প্রশাসন ম্যানেজ করা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালে প্রশাসনের অভিযানে একটি এস্কেভেটর জব্দ করা হলেও পরদিন অস্ত্রধারীরা তাকে মারধর করে জিম্মি করে সেই যন্ত্রটি ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় তিনি থানায় মামলা দায়ের করেন।
পাহাড় কাটার কাজে নিয়োজিত এক শ্রমিক জানান, তিনি মিয়ানমার থেকে এসে কম মজুরিতে কাজ করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো পাহাড়টি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ভাগ করে প্লট আকারে বিক্রি করা হয়েছে। যার প্লট, তার অংশের পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে দেওয়া হয় এবং সেই অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন ঈদগাঁও এলাকার নুরুল আলম, মহেশখালীর ডা. সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রামের আতিকুল ইসলাম শিবলী, নুনিয়ারছড়ার সাজ্জাদ, লাইটহাউজ এলাকার মুনিব খান এবং কেয়ারটেকার জুবায়েরসহ আরও কয়েকজন। পাহাড়টির দক্ষিণ অংশে মঞ্জুর ও জাকির নামের দুজনও কাটার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় শ্রেণির এই জমিগুলো প্রথমে ভূয়া দলিল ও খতিয়ান তৈরি করে নিজেদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। পরে জমির মূল্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পাহাড় কেটে নিচু করে প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড় কেটে ফেলা মাটি রাতের অন্ধকারে ডাম্পার ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কলাতলীর খালেক নামের এক ডাম্পার মালিকের মাধ্যমে এসব মাটি পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কাছাকাছি কিছু প্লট, যার মধ্যে একটি পিবিআই সংশ্লিষ্ট জমিও রয়েছে, সেখানে এই মাটি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও অধিকাংশই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, বহু সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গিয়ে ছবি তুললেও তা সংবাদমাধ্যমে তেমনভাবে প্রকাশ পায় না, ফলে দৌরাত্ম্য আরও বাড়ছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক খন্দকার পাশা বলেন, পাহাড় কাটার খবর পেয়ে একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পাঠানো হয়েছে। জড়িতদের তথ্য সংগ্রহ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, এর আগেও সদর এলাকায় একাধিকবার অভিযান চালিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এভাবে পাহাড় কাটা চলতে থাকলে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্যই নষ্ট হবে না, বরং ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হবে। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই অবৈধ সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।
বিবার্তা/ফরহাদ/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]