
কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের নদীবেষ্টিত এই ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া মানেই এক অনিবার্য সংগ্রামের শুরু। এখানে শৈশবের সংজ্ঞা ভিন্ন—খেলনা, বই কিংবা নিরুদ্বেগ সময়ের বদলে ছোট্ট কাঁধে ভর করে দায়িত্বের ভার। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দিন শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই দিয়ে; এখানে শিশুরা বড় হয় সময়ের আগেই।
সূর্য ওঠার আগেই চরের শিশুরা ছুটে যায় মাঠে—কেউ ফসলের পরিচর্যায়, কেউবা একবেলার আহারের আশায় দিনমজুরির খোঁজে। অনেকেই খালি পায়ে, অপুষ্ট শরীরে; তবুও তাদের ক্ষুদ্র হাত জানে জমি চাষের কৌশল, আলুর গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়ার নিয়ম, কিংবা ধান কাটার ছন্দ। মাটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল পেশাগত নয়, আবেগময়—প্রায় পবিত্র। মাটির গন্ধই যেন তাদের কাছে জীবনের গন্ধ।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তাপাড়ের চর রাজপুর এলাকার কৃষক সুবল চন্দ্র বর্মণ বলেন, “প্রতিদিন সকালে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠে ছুটে যায়। কেউ বাবার সঙ্গে জমি চাষ করে, কেউ সেচের পানি তোলে, আবার কেউ ফসল কাটে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার দুই সন্তান—একজনের বয়স ১১, আরেকজন ১৫। দুজনই স্কুলে পড়ে, আবার নিয়মিত আমাকে মাঠে সাহায্য করে। আমিও ছোটবেলায় এভাবেই বড় হয়েছি। মাটির গন্ধে বেড়ে ওঠা, কাজের মধ্য দিয়েই নিজেকে গড়ে তোলা—এটাই চরজীবনের স্বাভাবিক শিক্ষা।”
তার ছেলে গোবিন্দ চন্দ্র রায় (১৫) স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। ছোট্ট শরীর, কিন্তু কাজের অভ্যাস বড়দের মতোই। কখনো মই টানে, কখনো কোদাল দিয়ে মাটি কাটে, আবার কখনো ফসল কাটতেও পিছপা হয় না। তবুও মুখে তার ক্লান্তির ছাপ নেই, আছে সহজ সরল হাসি।
গোবিন্দ বলে, “আমি পড়াশোনাও করি, কাজও করি, আবার খেলাধুলাও করি। স্কুলেও যাই, মাঠেও যাই। সময় কম, কিন্তু কাজ করতে খারাপ লাগে না। কৃষিকাজ আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব।”
চরের অধিকাংশ শিশুই কোনো না কোনোভাবে স্কুলে ভর্তি হয়—সাধারণত স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণির পর তাদের পথ থেমে যায়। কারণ একটাই—দারিদ্র্য। স্কুলের ঘণ্টা বাজার আগেই অনেকের হাতে উঠে যায় কোদাল, কিংবা গরু চরানোর লাঠি। মেয়েরা ঘরের কাজ সামলে মাঠে যায়, ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করে, রান্নাবান্না করে—একাধিক দায়িত্ব তাদের কাঁধে এসে পড়ে অল্প বয়সেই।
হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি চরের কৃষক এন্তাজ আলী বলেন, “আমার ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু সে কাজ না করলে আমরা ফসল ফলাতে পারব না। একসঙ্গে স্কুলব্যাগ আর কোদাল বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব না—তবুও আমাদের শিশুরা সেটাই করে।”
তিনি যোগ করেন, “ছোটবেলা থেকেই তারা কাজ শিখে নেয়। কষ্টের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই তাদের বড় হওয়া। এই জীবনই তাদের সংগ্রামী করে তোলে।”
বিকেলের শেষভাগে কিছু সময়ের জন্য চরভূমির দৃশ্য পাল্টে যায়। ধুলোমাখা, খালি পায়ে, ছেঁড়া জামা পরা ছেলেদের দল জড়ো হয়ে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় মেতে ওঠে। নেই কোনো কোচ, নেই উন্নত সরঞ্জাম, নেই দর্শকের ভিড়—তবুও তাদের খেলায় থাকে অদম্য প্রাণশক্তি। তাদের হাসি-আনন্দ চরভূমির নীরবতা ভেঙে দেয়—দুর্দশার বিরুদ্ধে ক্ষণিকের এক প্রতিবাদ হয়ে।
গংগাচড়ার বিববিনা এলাকার আসরাফ আলী বলেন, “আমাদের কিছু ছেলে এখন জেলা পর্যায়ে খেলছে। তারা নিজেরাই শিখেছে—কেউ তাদের প্রশিক্ষণ দেয়নি।”
তিনি বলেন, “ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব—সবকিছুর মাঝেও তাদের চোখে যে দৃঢ়তা, তা অবিশ্বাস্য। চরশিশুরা আসলে এই দেশের অজানা যোদ্ধা।”
১৪ বছর বয়সী রাজু ইসলাম তাদেরই একজন। সকালে স্কুল, বিকেলে মাঠ—এই দুই জগতের মাঝেই তার জীবন। সে বলে, “আমরা জানি কীভাবে জমিতে কাজ করতে হয়, কীভাবে মাঠ থেকে খাবার আনতে হয়। কিন্তু ভালো স্কুলে ভর্তি হতে হয় কীভাবে, তা জানি না।”
সে আরও বলে, “আমাদের স্বপ্ন চরেই থেকে জীবন গড়া। আমরা যদি চর ছেড়ে চলে যাই, তাহলে এই জমি কে চাষ করবে? আমরা শুধু নিজেদের জন্য না—দেশের মানুষের জন্যও ফসল ফলাই। যতটুকু পারি পড়াশোনা করব, কিন্তু কৃষিকাজ ছাড়ব না। এটা আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব।”
চরের শিশুরা শুধু ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করে না—তারা লড়াই করে প্রকৃতির সঙ্গেও। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও গঙ্গাধরের ভয়াল স্রোত যেকোনো সময় কেড়ে নিতে পারে তাদের ঘরবাড়ি। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখতে পারে—নদী গিলে নিয়েছে সবকিছু। তবুও তারা আশা ছাড়ে না। তাদের চোখে এখনো স্বপ্ন বেঁচে থাকে—ভালোভাবে বাঁচার, আরও শেখার, আরও উঁচুতে ওঠার।
চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “চরশিশুরা উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রায় অদৃশ্য। তাদের ভবিষ্যৎ ধুলো আর অবহেলার নিচে চাপা পড়ে আছে।” “তবুও সুযোগ ও সহায়তা পেলে তারা এই দেশের গল্প বদলে দিতে পারে। তারা শুধু শ্রম দেয় না—তারা স্বপ্নও দেখে। আর সেই স্বপ্নই একদিন ইতিহাস হতে পারে, যদি আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই,’ তিনি বলেন।
তিনি জানান, দুই জেলায় প্রায় ৫০০টিরও বেশি চরে প্রায় দুই লাখ পরিবার বসবাস করে। প্রতিটি পরিবারের শিশুর জীবনেই লুকিয়ে আছে একেকটি গল্প—সংগ্রামের, টিকে থাকার, আর স্বপ্ন দেখার। এই গল্পগুলোকে মূলধারায় তুলে আনা এবং চরশিশুদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি—এ দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]