চুয়াডাঙ্গায় ট্রেন দুর্ঘটনার ৪৭ বছর
ট্রেন বগিতে পড়ে ছিল বীভৎস লাশ আর লাশ!
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:১৯
ট্রেন বগিতে পড়ে ছিল বীভৎস লাশ আর লাশ!
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

আজ ২৬ জানুয়ারি। ১৯৭৯ সালের এ দিনে চুয়াডাঙ্গায় ঘটেছিল এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বহু ট্রেন যাত্রী ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। আহত ও নিহতের স্বজনদের চিৎকারে ওই এলাকায় সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের।


এ দুর্ঘটনায় সরকারি হিসেবে ৮৬ জন যাত্রী নিহত হওয়ার কথা বললেও প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরো বেশি। আহত হয়েছিলেন অন্তত ৫শ জন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এটাই বৃহত্তর ট্রেন দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত।


জানা যায়, সেদিন দুপুর দেড়টার দিকে খুলনা থেকে ছেড়ে আসা পার্বতীপুর গামী ২৩ আপ রকেট মেইল ট্রেনটি চুয়াডাঙ্গা রেল স্টেশনের অদূরে গাইদঘাট নামক স্থানে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। ট্রেনের ইঞ্চিনটি পার্শ্ববর্তী খাদে ছিটকে পড়ে। আর বগিগুলো একটার ওপর একটা উঠে পড়ে। বগি লাইনচ্যুত হয়ে দুমড়ে মুচড়ে ছিটকে পড়ে রেল লাইনের পাশে।


ঘটনার পরপরই তৎকালীন বিডিআর ও পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয়রা আহত ও নিহতদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আহতদের সংখ্যা এতোই বেশী ছিল যে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে তিল ধরানোর ঠাঁই ছিল না। বিডিআর সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে যশোর সেনানিবাস হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী মশিউর রহমান।


৪ মাস বয়সী শিশু কন্যাকে নিয়ে দর্শনার বাবার বাড়ি থেকে ওই ট্রেনে নিজ বাড়ি জয়পুরহাট যাওয়া কল্পনা মন্ডল সেদিনের ঘটনার বর্ননা দিতে গিয়ে বলেন, আমি এবং আমার মেয়ে দুজনই আহত হই। কোনভাবে ওখান থেকে এসে দর্শনার কেরু কোম্পানির হাসপাতালে ভর্তি হই।


তিনি আরও বলেন, সেদিনের একটি ঘটনা সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়- সেটি হচ্ছে আমরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটছি আর মানুষরূপী এক নরপশু আমাদের সাহায্য করা তো দূরে থাক, আমার গলায় থাকা সোনার হারটি হেঁচকা টানে ছিড়ে নিয়ে চলে গেল।


প্রত্যক্ষদর্শী গাইদঘাট গ্রামের গোলাম রসুল বলেন, ‘ঐ দিন দুপুরে আমরা তিন বন্ধু ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। রেললাইনের একটু দূরেই আমাদের বাড়ি। কোরের মাঠ থেকে বিকট আওয়াজ শুনে দৌড়ে গেলাম দেখতে। এসে দেখি দুর্ঘটনার ভয়াবহতা। ট্রেনের আহত যাত্রীরা যে যেমন পারছে ছুটাছুটি করছে। পুরো এলাকা ধুলোই অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।


তিনি বলেন, আমরা তিন বন্ধু বাড়ি থেকে কলসে করে পানি নিয়ে আসলাম তাদের সাহায্য করার জন্য। আশে পাশের লোকজন সব এগিয়ে আসল উদ্ধার করার জন্য। ট্রেনের ইঞ্জিন ছিটকে পড়েছে পাশের মাঠের মধ্যে। ট্রেনের বগি উঠে গেছে একটার উপরে আর একটা। বগির ভিতরে বীভৎস লাশ আর লাশ! আমরা তখন রেডিওর খবরে শুনতে পাই ৭৪ জন নিহত হয়েছেন।


একই গ্রামের মোহাম্মদ আলমগীর কবির বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় আমি খুব ছোট ছিলাম, তখন আমার মাত্র ১২ বছর বয়স ছিল। তবু সেই কথা পরিষ্কার মনে পড়ে। দুর্ঘটনার কথা শুনে দৌড়ে গেলাম কোরের মাঠে। যেয়ে দেখি আহত যাত্রীদের বাঁচার আর্তনাদ। চোখের সামনে শত শত লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। আহত যাত্রীদের কারও হাত আটকে আছে বগির মধ্যে হাত কেটে বের করতে হয়েছে। যার পা আটকে আছে তার পা কেটে বের করছে। কারো শরীরে রড ঢুকে আছে। রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল।


তিনি বলেন, যে যেভাবে পেরেছে আহতদের সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছে। গ্রামের সবাই সে সময় প্রশাসনের সাথে উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। শত শত আহত মানুষের বাঁচার আকুতি দেখেছি নিজের চোখে সেই কথা এখনো মনে হলে এখনো আতকে উঠি’।


এদিকে চুয়াডাঙ্গার একই স্থানে ৩টি রেল দুর্ঘটনা ঘটায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ওই স্থানে গাইদঘাট নামে একটি রেল স্টেশন স্থাপন করেন। ওই স্থান দিয়ে যাতায়াতকারি প্রতিটি ট্রেন স্বল্প গতিতে অতিক্রম করতে ট্রেন পরিচালকদের নির্দেশ দেন।


গাইদঘাটে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন নিহতদের তালিকা সম্বলিত একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে। কিন্তু বর্তমানে ওই স্টেশনটিও নেই আর ট্রেনও স্বল্প গতিতে অতিক্রম করে না।
ঘটনার দীর্ঘ ৪৪ বছর পরও ওই পথটি ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। এই স্থানের ৩ কিলোমিটার রেললাইন রয়েছে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।


এলাকাবাসীর দাবি, একাধীকবার বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটার পরও ব্যস্ততম গাইদঘাট রেলক্রসিংটি দীর্ঘ সময় ধরে অরক্ষিত রয়েছে। এলাকাবাসী ও পথচারীদের নিরাপত্তায় এ এলাকার রেলপথে যে ক্রটিগুলো আছে তা চিহ্নিত করে ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে।


বিবার্তা/আসিম/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com