৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর ছাড়া পেলেন চবির শিক্ষক হাসান
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫২
৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর ছাড়া পেলেন  চবির শিক্ষক হাসান
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে আসা এক শিক্ষককে শারীরিক হেনস্তার পর টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর ও সহ–উপাচার্যের কার্যালয়ে নিয়ে ৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।


শনিবার (১১ জানুয়ারি) রাত ৯টার দিকে প্রশাসনিক ভবন থেকে বেরিয়ে প্রক্টরের গাড়িতে করে তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
এর আগে দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সামনে চাকসুর চার নেতার নেতৃত্বে ওই শিক্ষককে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে তাড়া করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ সময় শিক্ষকের মুঠোফোনেও তল্লাশি চালানো হয়।


হেনস্তার শিকার ওই শিক্ষকের নাম হাসান মোহাম্মদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর। ক্যাম্পাসে তিনি আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের রাজনৈতিক সংগঠন হলুদ দলের একাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।


এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে কয়েকজন ছাত্র টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে একজনকে পেছন থেকে তাঁকে চেপে ধরতে দেখা যায়। সেখানে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি ও নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা গেছে। এ সময় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ চিৎকার করছিলেন। ওই অবস্থায় তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।


প্রক্টর অফিসে অবরুদ্ধ অবস্থায় ঘটনার বিবরণ দিয়ে হাসান মোহাম্মদ বলেন, পরীক্ষার কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করার সময় শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাকে জানান যে ‘পরিস্থিতি ভালো নয়’। এরপর তিনি কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন চাকসু নেতারা চিৎকার-চেঁচামেচি করলে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। এরপরও তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি এবং তার বিরুদ্ধে মব তৈরি করা হয়েছে।


জানতে চাইলে চাকসুর আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি শিক্ষককে হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, হাসান মোহাম্মদ সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থাকাকালে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে ভূমিকা রেখেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি সরাসরি গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনের তদন্ত চলছিল। তদন্ত চলাকালে কেন একজন অভিযুক্ত শিক্ষক পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করছেন, এ বিষয়ে জানতে তাঁরা আইন অনুষদের ডিনের সঙ্গে কথা বলতে যান। এ সময় তাঁদের উপস্থিতির খবর পেয়ে ওই শিক্ষক পালানোর চেষ্টা করেন। তখন তিনি একটি গাছের গুঁড়িতে আঘাত পেয়ে পড়ে যান।


একই দাবি করেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমানও। তিনি বলেন, ‘তাকে কোনোভাবেই মারা হয়নি। আমরা আইন অনুষদে পরিদর্শনের সময় তার উপস্থিতির খবর পেয়ে সেখানে যাই। তিনি আইন অনুষদের গ্যালারির পেছন দিয়ে দৌড়ানোর সময় ব্যথা পান।’


শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি না জানতে চাইলে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাঈদ বিন হাবিব বলেন, চাকসুর নেতারা হাটহাজারী থানায় মামলা করতে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া মামলা গ্রহণ করা যাবে না বলে জানানো হয়। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে মামলা করার বিষয়টি তুলেছি। প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ‘আমরা জানতে পারি, তিনি (শিক্ষক) ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ ঘরানার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সাবেক সহকারী প্রক্টরও। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত চলমান রয়েছে এবং আগামী সিন্ডিকেট সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’


প্রক্টর আরও বলেন, ‘থানায় মামলা করা হয়েছে, এমন তথ্য আমাদের জানানো হয়েছিল। তবে অতিরিক্ত অভিযোগ এলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রক্টরিয়াল বডি কোনো শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না। তাই আমরা তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাঁকে ছেড়ে দিয়েছি।’


তবে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত কোনো মামলা নথিভুক্ত হয়নি।


চাকসুর আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি বলেন, ‘আমরা প্রায় আড়াই ঘণ্টা থানায় বসেছিলাম মামলা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া মামলা নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। পরে আমিসহ চাকসুর তিনজন নেতা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়ে আসি।’


এদিকে প্রক্টর অফিসে অবস্থানের সময় জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করার অভিযোগ অস্বীকার করেন সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমি এক দিনের জন্যও বের হইনি। কোনো দায়িত্বেও ছিলাম না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মৌন মিছিল হয়েছিল, সেখানেও অংশ নিইনি। শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করে, এমন কোনো বোর্ডের সদস্যও ছিলাম না। সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি কাউকে মামলা দিইনি।’


পরীক্ষার দায়িত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী মো. ইকবাল শাহীন খান বলেন, ‘কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তদন্ত চলাকালে তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সিন্ডিকেট থেকে শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আমাদের কাছে শিক্ষক। এ কারণে তাঁকে পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’


বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তার বেতন বন্ধ রয়েছে। কীভাবে তিনি পরীক্ষার দায়িত্ব পেলেন, তা আমি বলতে পারছি না।’


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com