জিআই স্বীকৃতি পেলো নেত্রকোণার ‘বালিশ মিষ্টি’
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৭
জিআই স্বীকৃতি পেলো নেত্রকোণার ‘বালিশ মিষ্টি’
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

এক সময় যা ছিল শুধুমাত্র নেত্রকোণার স্থানীয় মিষ্টান্ন আজ তা পুরো জাতির ঐতিহ্যের অংশ। দীর্ঘ প্রায় ১২০ বছরের ইতিহাস ও স্বাদের অনন্য বৈচিত্র্যে ভর করে নেত্রকোণার বিখ্যাত ‘বালিশ মিষ্টি’ পেয়েছে দেশের ৫৮তম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি।


নেত্রকোণাশহরের বারহাট্টা রোডের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী গয়ানাথ ঘোষ প্রায় এক শতাব্দী আগে প্রথম তৈরি করেন এই মিষ্টি। পরে ১৯৬৫ সালে ভারতে চলে যাওয়ার আগে এই দোকানেরই কর্মচারী নিখিল চন্দ্র মোদকের হাতে দিয়ে যান দোকানের সকল দায়িত্ব। নিখিল চন্দ্র মোদকও মালিকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই দোকানের নাম পরিবর্তন না করে গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারই রেখেছেন।


দেখতে ছোট বালিশের মতো হওয়ায় নাম দেওয়া হয় ‘বালিশ মিষ্টি’। এই দোকানের ক্রেতাদের কাছে বালিশ মিষ্টি এক আবেগের নাম।


নামের মতোই এর স্বাদেও রয়েছে অনন্যতা না এটি সন্দেশ, না একেবারে রসগোল্লা; বরং এক বিশেষ প্রস্তুত প্রণালী ও উপাদানের মিশেলে তৈরি হয় এমন স্বাদ, যা একবার মুখে দিলেই চেনা যায়, এটি নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি। কারিগরের নিখুঁত কৌশল এই মিষ্টি করে তুলে আরও অনন্য। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশি কারিগর ও দোকানের কর্মচারীরা।


স্থানীয়রা জানান, তারা নিজেরা যেমন এ মিষ্টি উপভোগ করেন, তেমনই পরিবারের জন্যও নিয়ে যান তারা। সারা দেশেই এ মিষ্টি বেশ পরিচিত বলেও জানান তারা।


বালিশ মিষ্টি তৈরি হয় দেশীয় গাভীর খাঁটি দুধ-ছানা, চিনি ও ময়দা দিয়ে। প্রথমে দুধের ছানার সঙ্গে সামান্য ময়দা মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করা হয়। এর পরে বানানো হয় বিভিন্ন সাইজের বালিশ। পরে তা ভাজা হয় চিনির গরম রসে। এর পর ঠান্ডা করেও চিনির রসে ডুবিয়ে রাখা হয় অনেকক্ষণ। এক সময় তা রসে টইটম্বুর হয়ে যায়। বিক্রির সময় বালিশের ওপর দেয়া হয় ক্ষীরের প্রলেপ বা দুধের মালাই। এ ছাড়াও বালিশ বানানোর প্রক্রিয়ায় কিছুটা গোপনীয়তা আছে যা ব্যবসার স্বার্থে প্রকাশ করতে চান না কারিগররা।


ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার দিক বিবেচনা করে বিভিন্ন আকৃতি ও দামে বিক্রি করা হয় এ মিষ্টি। এ মিষ্টিটি ৩০, ৫০, ১০০, ৩০০, ৫০০, ১০০০ টাকা দামে বিভিন্ন আকৃতিতে পিস হিসেবে বিক্রি করা হয়। বড় আকৃতির বালিশ মিষ্টি একা খাওয়া সম্ভব হয় না, এক হাজার টাকার বালিশ মিষ্টি ৫/৬ জনে অনায়াসে খাওয়া যায়।


দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে স্থানীয় উৎসব, উপহার ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এখন অপরিহার্য এই মিষ্টি। দেশের বাইরে প্রবাসী নেত্রকোণাবাসীর হাত ধরেও ‘বালিশ মিষ্টি’ পৌঁছে গেছে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি আমেরিকাতেও। এটি এখন শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়—নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।


২০২৩ সালে নেত্রকোণা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পণ্যের ইতিহাস, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও বিশেষত্বের দলিলসহ ‘বালিশ মিষ্টি’র জিআই স্বীকৃতির আবেদন করা হয়। পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর (ডিপিডিটি) দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এই মিষ্টিকে দেশের ৫৮তম জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।


গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কর্ণধার ও পরিচালক খোকন চন্দ্র মোদক বলেন, ‘বালিশ মিষ্টি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে এইটা আমাদের গর্ব নেত্রকোণা জেলারও গর্ব।’


এর আগে ২০২১ সালে নেত্রকোণার দুর্গাপুরের বিজয়পুরের সাদামাটি জিআই স্বীকৃতি পায়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ‘বালিশ মিষ্টি’ যুক্ত হলো দেশের ঐতিহ্যের মর্যাদাপূর্ণ তালিকায়।


বিবার্তা/িএমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com