গণমাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রোটোকল প্রকাশ
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০০:৪১
গণমাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রোটোকল প্রকাশ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

দেশের সংবাদমাধ্যমে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ‘যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা’ (সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট রেসপন্স প্রোটোকল) প্রণয়ন করেছে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন বাংলাদেশ।


বুধবার (২৫ মার্চ) রাজধানীর হোটেল হলিডে ইন-এ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রোটোকলটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।


এফসিডিও-এর সহায়তায় বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন পরিচালিত ‘স্ট্রেনথেনিং উইমেন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক টু ট্যাকল সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় প্রোটোকলটি প্রণয়ন করা হয়।


অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। কেবল নীতিমালা নয়, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার।


সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, “যৌন নিপীড়ন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রোটোকল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রতিটি নিউজরুমে এ নিয়ে আলোচনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মালিক-সম্পাদকসহ সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।” তিনি জেলা পর্যায়েও উদ্যোগটি সম্প্রসারণের আহ্বান জানান এবং উল্লেখ করেন, পুরুষ সাংবাদিকরাও হয়রানির শিকার হন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, প্রোটোকলটি পুরো সিস্টেমের জন্য প্রযোজ্য। জেন্ডার-ফ্রেন্ডলি মিডিয়া হাউসকে স্বীকৃতি দিলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।


চ্যানেল আই-এর প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান রনি বলেন, “এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, তবে এইচআর নীতিতে অন্তর্ভুক্তি জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে নিপীড়ক থেকে যায়, ভুক্তভোগী চাকরি হারান—এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।”


বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সংগঠন ওকাব সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য আইনের প্রয়োগ ও চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস অ্যানালিস্ট শারারত ইসলাম বলেন, “এটি সহজ ও কার্যকর দলিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন জরুরি; মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নেই। বড় গণমাধ্যমগুলো এগিয়ে এলে অন্যরাও উৎসাহিত হবে।”


প্রোটোকল প্রণেতা সুলাইমান নিলয় অনলাইনে যুক্ত হয়ে জানান, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে এই নীতিমালা সহায়ক হবে।


বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “সংবাদমাধ্যমে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা ১০ শতাংশের কম। নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া এই ভারসাম্য আনা সম্ভব নয়। প্রোটোকলটি মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনার জন্য দায়বদ্ধতার কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।”


উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (ডব্লিউজেএনবি) কো-অর্ডিনেটর এবং অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আঙ্গুর নাহার মন্টি বলেন, “লোকলজ্জার কারণে যৌন হয়রানির ঘটনা প্রায়ই আড়ালে থাকে। সহকর্মীরা নিরাপদ বোধ না করলে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই নীতিমালা নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির প্রাথমিক ভিত্তি; নারী-পুরুষ সবার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।”


বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের আরাফাত সিদ্দিকী মূল প্রবন্ধে প্রোটোকলের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও সুরক্ষা নেটওয়ার্কের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থা WAN-IFRA Women in News, City, St George's University of London এবং বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন ২০২৫ সালে একটি যৌথ জরিপ পরিচালনা করে। পূর্ণাঙ্গ জরিপটি শিগগিরই প্রকাশ করা হবে জানিয়ে আরাফাত ৩৩৯ জন সংবাদকর্মীর ওপর পরিচালিত ওই জরিপের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, ১৫ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে সরাসরি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। মৌখিক হয়রানির শিকার নারী ৬০ শতাংশ ও পুরুষ ৯ শতাংশ; অনলাইন হয়রানিতে নারী ৪৮ শতাংশ ও পুরুষ ১৫ শতাংশ; শারীরিক হয়রানিতে নারী ২৪ শতাংশ ও পুরুষ ৭ শতাংশ। এছাড়া ৭ জন নারী ও ২ জন পুরুষ ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা জানান। জরিপ অনুযায়ী, মৌখিক হয়রানির অভিযোগে ৪৩ শতাংশ নারী ও ৬০ শতাংশ পুরুষের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রথম আলো অনলাইন (ইংরেজি) সম্পাদক আয়েশা কবীর, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনিমা সুলতানা, শাহনাজ বেগম, নাদিরা কিরণ, নাজনীন আখতার, ইন্টারনিউজের কান্ট্রি প্রতিনিধি শামীম আরা শিউলি, বৈশাখী টিভির হেড অফ নিউজ জিয়াউল কবীর সুমন এবং বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাসিমা আক্তার সোমা।


উপস্থিত ছিলেন ইআরএফ প্রেসিডেন্ট দৌলত আক্তার মালা, আইপিএইচ পরিচালক সাইকোলজিস্ট নাজমুল হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মিনহাজ উদ্দিন, ডিজিটাল রাইটসের মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, জিআইজেএন সম্পাদক তানভীর সোহেল, চ্যানেল ওয়ানের আমিন আল রশীদ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের উপসম্পাদক রাজু আহমেদ, দীপ্ত টিভির হেড অফ নিউজ এস এম আকাশসহ আরও অনেকে। অংশগ্রহণকারীরা সম্মিলিতভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রোটোকলটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com