
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের এক স্পর্শকাতর মুহূর্তে শুক্রবার কলকাতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার ত্রিবেদী। রাজনৈতিক পরিবর্তন, উদীয়মান কৌশলগত টানাপড়েন এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আবহে যখন নয়াদিল্লি ও ঢাকা সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তখনই তাঁর এই সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এই আলোচনায় আগামী বছরগুলো দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
ঢাকা যাওয়ার আগে ইউএনআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ত্রিবেদী সমঝোতার সুরে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ এমন দুই অংশীদার, যাদের দায়িত্ব ‘‘প্রায় ১৬০ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা।’’
বাংলাদেশকে ভারতের ‘‘সবচেয়ে বিশেষ সম্পর্ক’’ বলে উল্লেখ করে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সময়ে সময়ে সৃষ্ট উত্তেজনা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি এই অংশীদারিত্বের মৌলিক ভিত্তিকে অক্ষুণ্ন রাখতে চায়।
সংক্ষিপ্ত এই সফরের আগে ত্রিবেদী নেতাজি ভবনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সুভাষচন্দ্র বসুর বাসভবন হিসেবে পরিচিত এই ঐতিহাসিক স্থানে গিয়ে তিনি উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই মহান নেতাকে স্মরণ করেন, যিনি দুই দেশের মানুষই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। ত্রিবেদী বলেন, ‘‘নতুন দায়িত্ব গ্রহণের আগে উপমহাদেশের প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আশীর্বাদ প্রার্থনা করাই যথাযথ বলে মনে করেছি।’’
পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই পদে দ্বিতীয় রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ত্রিবেদী এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী ছিলেন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ— জলবণ্টন এবং বাণিজ্য— নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সময়েই তিনি ঢাকায় পৌঁছবেন।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ নবায়নের সময় এসে গিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ পুনর্বিন্যাস কঠিন হতে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদে চুক্তির মেয়াদ সাময়িকভাবে বাড়ানোই সবচেয়ে সম্ভাব্য সমাধান বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতের প্রাক্তন বিদেশসচিব পিনাক আর চক্রবর্তী এবং অন্যান্য কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট থেকে জলবণ্টন প্রশ্নকে আলাদা করে দেখা যায় না।
ভারতের নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছেন, পরিবর্তিত জলবৈজ্ঞানিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এই চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। হিমালয়ের হিমবাহ গলার হার কমে যাওয়ায় নদীর প্রবাহে প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষিক্ষেত্রে বাড়তি চাহিদার ফলে সীমান্তের দুই পাশেই জলের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জলবণ্টন নিয়ে আলোচনা বৃহত্তর অর্থনৈতিক আলোচনার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ইতোমধ্যেই ৫১০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে এবং দেশটি ক্রমশ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে ভারত অতীতে একতরফাভাবে যে বাণিজ্যিক সুবিধা ও বিশেষ ছাড় দিয়েছিল, তার অনেকগুলিই পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হবে। সেই কারণে দুই দেশের কর্মকর্তারা এখন এমন একটি নতুন বাণিজ্য কাঠামোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন, যা আরও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অস্বস্তির বিষয়গুলিও সামলাতে হবে দুই দেশকেই। জামায়াতে ইসলামী এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির কিছু অংশের ভারতবিরোধী বক্তব্য যেমন নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তেমনই সীমান্তের এ পাশের কিছু রাজনৈতিক মন্তব্যও ঢাকার অস্বস্তির কারণ হয়েছে।
তবুও ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং গভীর জনগণের যোগাযোগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক মন্তব্যের কারণে বিপথে যেতে দেওয়া যায় না। ত্রিবেদীর অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় রাজনৈতিক অস্থির প্রভাব থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে চিন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির দিকেও নিবিড় নজর রাখছে ভারত।
এই কৌশলগত উদ্বেগ সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আলোচনায়। গঙ্গা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকলেও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চিনের অংশগ্রহণ চেয়েছে।
প্রকল্পটির অবস্থান ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি হওয়ায় নয়াদিল্লিতে তা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই সরু ভূখণ্ডই উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ রক্ষা করে।
তবে উদ্বেগ শুধু চিনকে ঘিরেই নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, পাইলট প্রশিক্ষণ নিয়ে আলোচনা এবং পাকিস্তানের চিনা নকশার জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের খবর ভারত ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সক্রিয়তা বাড়ছে বলে যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাও নজরে রাখছেন ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এই উদ্বেগের পেছনে রয়েছে অতীতের অভিজ্ঞতা। ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অভিযোগ, অতীতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক উত্তর-পূর্ব ভারতে সক্রিয় বিদ্রোহী সংগঠনগুলিকে সহায়তা করেছিল। ২০০২ সালে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে হামলাসহ একাধিক সন্ত্রাসবাদী ঘটনার তদন্তে পাকিস্তান ও বাংলাদেশভিত্তিক উগ্রপন্থি সংগঠনের যোগসূত্রের অভিযোগ উঠে এসেছিল।
তবে এই সমস্ত উদ্বেগ সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে অবনতি দুই দেশের পক্ষেই ব্যয়বহুল হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার ভারত। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্ব বাংলাদেশের কাছেও অপরিসীম।
সেই কারণে ঢাকায় ত্রিবেদীর কাজ মতপার্থক্য দূর করা নয়; বরং বৃহত্তর সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যে সেগুলিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা।
শেষ পর্যন্ত এই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে ভারত ও বাংলাদেশ রাজনৈতিক টানাপড়েনের ঊর্ধ্বে উঠে পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতার উপযোগী নতুন সমঝোতা গড়ে তুলতে পারে কি না তার উপর। কৌশলগত সতর্কতা বজায় রেখেও দুই দেশকে স্বীকার করতে হবে যে, ১৬০ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি আজও গভীরভাবে পরস্পরনির্ভর।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]