খামেনিকে হত্যার ৪ মাস পর নিন্দা জানাল বাংলাদেশ
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ২০:২৬
খামেনিকে হত্যার ৪ মাস পর নিন্দা জানাল বাংলাদেশ
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর শুধু ‘শোক ও দুঃখ’ প্রকাশ করলেও চার মাস পর শেষকৃত্যের সময়ে এসে তার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ।


শুক্রবার (৩ জুলাই) তেহরানে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের সঙ্গে সাক্ষাতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের এই অবস্থান তুলে ধরেন।


দুই স্পিকারের সাক্ষাতের খবর দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘মহামান্য’ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ‘মর্মান্তিক মৃত্যুতে’ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এবং তার ‘নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা’ জানিয়েছেন।


“জাতীয় শোকের এই সময়ে ইরানের সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সহমর্মিতা জানিয়েছেন তিনি।”


গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার শুরুতে নিজ বাসভবনে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি। ব্যাপক হামলার মধ্যে ইরানও পশ্চিম এশিয়ার আরবদেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। মার্কিন ঘাঁটি থাকার কারণে ওই দেশগুলোকে হামলার ‘বৈধ টার্গেট’ হিসাবে বর্ণনা করে তেহরান।


সে সময় বাংলাদেশের অবস্থান ঘিরে সমালোচনা হয়। হামলার শুরুর পরদিন এক বিবৃতিতে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের’ নিন্দা জানালেও তাতে ইরানের ওপর হামলার প্রসঙ্গ রাখেনি ররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যার বিষয়েও কিছু বলা হয়নি ওই বিবৃতিতে।


এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পরদিন ২ মার্চ আরেক বিবৃতিতে খামেনি মৃ্ত্যুতে ‘মর্মাহত’ হওয়ার কথা বলে ঢাকা। তবে সেখানে তাকে হত্যার নিন্দা জানানো হয়নি।


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই বিবৃতিতে বলেছিল, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতির লঙ্ঘন করে এক ‘টার্গেটেড হামলায়’ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের কথা জেনে সরকার মর্মাহত। ইরানের ভ্রাতৃপ্রতীম জনগণের প্রতি আন্তরিক শোক জানাচ্ছে সরকার।


“বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, সংঘাতের মাধ্যমে কোনো সমাধান আসে না। কেবল সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হতে পারে।”


সরকারের এমন অবস্থানের মধ্যে ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রাহিমি জাহানাবাদী বলেছিলেন, ঢাকার কাছে তেহরান কোনো ‘যুদ্ধের রসদ’ চায় না, কেবল ‘আক্রান্ত হিসেবে সমর্থন’ চায়।


এরপর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আনা হয়েছিল। ইরানের পাল্টা হামলার মধ্যে ‘সংহতি’ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লেখা চিঠি নিয়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে গেছেন তার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।


শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘কয়েক শতাব্দীর বন্ধুত্ব’ এবং দুই দেশের মধ্যে ‘গভীর সাংস্কৃতিক ও মানুষে মানুষে বন্ধনের’ কথাও তুলে ধরেছেন।


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের ক্ষেত্রে স্পিকার কলিবফের গঠনমূলক ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের স্পিকার। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, এই চুক্তি ইরানি জনগণ ও বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলটিতে ‘স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি’ বয়ে আনবে।


বিবৃতিতে বলা হয়, চলমান শান্তি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন হাফিজ উদ্দিন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সবপক্ষ সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারবে।


স্পিকার কলিবফকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন।


খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে বৃহস্পতিবার তেহরানে যান স্পিকার। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ইরানের ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজি বাবাই।


প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাকে বিদায় জানাতে ছয় দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ইরান সরকার। শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় রাখা হয়েছে খামেনির মরদেহ; শনিবার তার জানাজা হবে।


এদিকে তেহরান সফররত জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা শুক্রবার খামেনির কফিনের সামনে গিয়ে দোয়া-মোনাজাত করেছেন।


ফেইসবুকে এক পোস্টে জামায়াত বলেছে, “ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শহীদ আয়াতুল্লাহিল সাইয়্যিদ আলি হুসাইনি খামেনি রাহিমাহুল্লাহ এর জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ ও ১১ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।”


খামেনির জন্য শোক ও স্মরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তা ও বিদেশি প্রতিনিধিরা শুক্রবার তেহরানে পৌঁছেছেন।


শনি ও রোববার ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় বিদায় অনুষ্ঠান হবে, এর মধ্যে প্রথম দিন জানাজার কর্মসূচি রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।


সোমবার তেহরানে হবে প্রধান শোকযাত্রা। এ সময় খামেনির কফিনের পাশাপাশি একই হামলায় নিহত তার মেয়ে, জামাতা ও পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) ও নাতনির মরদেহ বহন করা হবে।


শোকযাত্রার পর প্রয়াত নেতার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরানের শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্র ও ধর্মীয় শিক্ষানগরী কোমে, যেখানে মঙ্গলবার জানাজা ও শোক অনুষ্ঠান হবে।


এরপর বুধবার খামেনির কফিন নেওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকে। সেখানকার নাজাফ ও কারবালা শহরে শোকযাত্রা ও জানাজা হবে। ইরানের সমমনা ও মিত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন সেখানে।


এরপর বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদ শহরে আরেকটি শোভাযাত্রার পর হযরত ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com