উৎপাদন খরচ বাড়লেও কমেছে ভুট্টার বাজারদর
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০০:৫০
উৎপাদন খরচ বাড়লেও কমেছে ভুট্টার বাজারদর
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

উৎপাদন খরচ বেড়েছে, বেড়েছে শ্রম ও দুশ্চিন্তাও। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি ভুট্টার দাম। বরং গেল বছরের তুলনায় এবার বাজারে ভূট্টার দাম কমে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের হাজারো কৃষক।


তিস্তা, ধরলা ও ব্রক্ষপুত্র নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, এবার বীজ, সার, ডিজেল ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ বাজারে প্রতিকেজি ভুট্টা বিক্রি করতে হচ্ছে গত বছরের তুলনায় ২ থেকে ৩ টাকা কম দামে।


গেল বছর এই সময়ে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ভুট্টা বিক্রি হয়েছিল ২৯ থেকে ৩০ টাকা দরে। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই ভুট্টাই বিক্রি হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ টাকায়। কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় তাদের লাভের পরিমাণ অনেক কমে গেছে।


এদিকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে অনেক ভুট্টাখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ায় ফলনও কমেছে। ফলে বাড়তি খরচের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।


কৃষকেরা জানান, চলতি মৌসুমে সময়মতো সার ও ডিজেল পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়েও চাহিদামতো সার সংগ্রহ করতে পারেননি তারা। এতে সেচ ও পরিচর্যায় ব্যাঘাত ঘটে। অধিকাংশ কৃষক আশা করেছিলেন, এবার প্রতিকেজি ভুট্টা অন্তত ৩১ থেকে ৩২ টাকা দরে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি তাদের সেই আশা পূরণ করেনি।


লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীর চর গড্ডিমারী এলাকার কৃষক শামসুল আলম এবার ২২ বিঘা জমিতে ভুট্টাচাষ করেছেন। গত বছর তার আবাদ ছিল ২০ বিঘা জমিতে। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় এবারও প্রায় ৩৭ মণ ফলন পেয়েছেন। তবে উৎপাদন খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।


তিনি বলেন, “গেল বছর এক বিঘা জমিতে ভুট্টাচাষে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছিল। এবার সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকায়। সার, ডিজেল ও শ্রমিকের পেছনে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়েছে। অনেক সময় বেশি দাম দিয়েও সার পাইনি। অথচ এখন ভুট্টা বিক্রি করতে হচ্ছে আগের বছরের চেয়ে কম দামে।”


শামসুল আলম বলেন, “ভুট্টা এখন চরাঞ্চলের কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসল। অন্য ফসলে যে লাভ হয় না, ভুট্টা সেই ঘাটতি পূরণ করে। কিন্তু এবার বাজারদর কম হওয়ায় লাভ অনেক কমে গেছে। প্রতিকেজি ভুট্টা ৩২-৩৩ টাকা হলে আমরা ভালোভাবে লাভবান হতে পারতাম।”


রংপুরের মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক সেনা মিয়া বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে তার দুই বিঘা জমির ভুট্টা নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে তিনি মাত্র ২৮ মণ ফলন পেয়েছেন, যেখানে অন্য জমিতে বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে ৩৮ মণ।


তিনি বলেন, “এবার ভুট্টাচাষে আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। সময়মতো সার ও ডিজেল পাইনি। বাড়তি টাকা খরচ করেও প্রয়োজনীয় সরবরাহ মেলেনি। এখন আবার বাজারে ভুট্টার দামও কম। এতে লাভ অনেক কমে গেছে।” ভুট্টাই এখন চরাঞ্চলের কৃষকের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। অন্য ফসলে তেমন লাভ নেই।


কালীগঞ্জের কাকিনা রুদ্রেশ্বর চরের কৃষক ফজর আলী বলেন, এবার সারের দাম বেশি, তেলের দাম বেশি। প্রতি বিঘায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু বাজারে ভুট্টার দাম কম। ছয় মাসের পরিশ্রমের পরও তেমন লাভ থাকছে না।


ভুট্টা ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় এ বছর দাম কিছুটা কমেছে।


কাকিনা চাপারতল এলাকার ব্যবসায়ী আশরাফুল হক বলেন,“গেল বছরের ভুট্টা এখনো গুদামে আছে। ফিড মিলগুলো থেকে আগের মতো চাপ দিয়ে ভুট্টা কেনা হচ্ছে না। তাই আমরা কৃষকদের কাছ থেকে ২৭-২৮ টাকা কেজিতে ভুট্টা কিনছি। এখন বাজারে চাহিদা কিছুটা কম থাকলেও মাসের মাঝামাঝি থেকে দাম বাড়তে পারে। ফিড মিলগুলোতে চাহিদা বাড়লে কৃষকেরাও ভালো দাম পাবেন।”


পাটগ্রামের বাউড়া এলাকার ভুট্টা ব্যবসায়ী নিবারুন চন্দ্র সেন জানান, তার গুদামে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ কেজি ভুট্টা মজুত রয়েছে। গেল বছর ফিড কোম্পানিগুলো যেভাবে ভুট্টা কিনেছিল, এবার তেমনটা হচ্ছে না। বাজারে সরবরাহ বেশি। ফলে দাম কমে গেছে। তবে কৃষকেরা এখনো ভুট্টাচাষে লাভবান হচ্ছেন, যদিও লাভের পরিমাণ কমেছে। তিনি নিজেও ৩০ বিঘা জমিতে ভুট্টাচাষ করেছেন বলে জানান।


তিনি বলেন, এবার ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু প্রতি বিঘায় আড়াই হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। বাজারদর কম থাকায় আশানুরূপ লাভ পাচ্ছি না।”


বাউড়া এলাকার একটি ভুট্টা ক্রয়কেন্দ্রের ম্যানেজার দেলোয়ার হোসেন বলেন, “বাজারে এখনো গেল বছরের ভুট্টা মজুত রয়েছে। তাই নতুন করে জোর দিয়ে কেনা হচ্ছে না। তবে সামনে চাহিদা বাড়লে দামও বাড়বে। যেসব কৃষকের তাৎক্ষণিক টাকার প্রয়োজন নেই, তারা কিছুদিন ভুট্টা মজুত রাখতে পারলে ভালো দাম পেতে পারেন।”


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশে ৬ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ লাখ ৭৯ হাজার টন। গত অর্থবছরে ৬ লাখ ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করে উৎপাদন হয়েছিল ৭৩ লাখ ৯৯ হাজার টন।


রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় এবার ১ লাখ ২৭ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে ভুট্টাচাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লাখ ২৮ হাজার ৯০০ টন। কৃষি বিভাগ বলছে, গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০০ হেক্টর বেশি জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে।


রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “রংপুর অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ ভুট্টা উৎপাদিত হচ্ছে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ ২৬টি নদ-নদীর চরাঞ্চলে। ভুট্টাচাষ এখন চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান বদলে দিচ্ছে।”


তিনি আরও বলেন, “ভুট্টা শুধু অর্থকরী ফসল নয়, এর মোচাও কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস। প্রতি বিঘার ভুট্টার মোচা বিক্রি করে কৃষকেরা তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করছেন। বাজারদর কিছুটা কম হলেও সামনের দিনে চাহিদা বাড়লে কৃষকেরা আরও ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছি।


বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com