
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পলাশী থেকে বাংলাদেশ: ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান অডিটোরিয়ামের সেমিনার কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) উদ্যোগে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলামের সঞ্চালনায় সভায় সভাপতিত্ব করেন জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু।
সভায় প্রধান অতিথি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, প্রধান আলোচক দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং বিশেষ আলোচক হিসেবে বাংলাদেশ সরকাতের তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, অধ্যাপক ড. খো: লুৎফুল এলাহী ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. সালাহউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় কোনো সাধারণ যুদ্ধ ছিল না, তা ছিল যুদ্ধের নামে একটি নাটক। তৎকালীন মীর জাফর, জগতশেঠদের মতো পুঁজিপতি ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে হাত মিলিয়েছিল। ইংরেজদের সেই লুণ্ঠনের ফলেই পরবর্তীতে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল। অথচ ব্রিটিশদের করা সেই ঐতিহাসিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং তরুণ নবাবের পক্ষে আমরা আজ পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী একাডেমিক কাজ করতে পারিনি।" তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার ওপর করা ঐতিহাসিক মিথ্যাচারের সত্যতা উন্মোচনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে বিশেষ পিএইচডি প্রজেক্ট চালুর আহ্বান জানান।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ১৭৫৭ সালে ক্ষমতা হারানোর পর মুসলমানদের স্বাধীন ভূখণ্ড পেতে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ১৯০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাই ইতিহাস থেকে ১৯৪৭ সালকে বাদ দিলে তা হবে বড় বিকৃতি। এরপর ১৯৭১ সালে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বাঙালি মুসলমানরা তাদের নিজস্ব সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে ড. মাহমুদুর রহমান তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, "২০২৪ সালে আমাদের তরুণ প্রজন্ম কোনো বিদেশী সাহায্য ছাড়াই বুক পেতে দিয়ে এ দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। বিগত ১৫ বছর বাংলাদেশ একটি প্রতিবেশী দেশের অলিখিত উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল, যা থেকে ছাত্র-জনতা আমাদের মুক্ত করেছে।
তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, চব্বিশের ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর আজ বিপ্লবীদের নিজেদের মধ্যেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিভেদ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে পরাজিত ফ্যাসিবাদ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু একে অপরকে শত্রু ভাবা যাবে না। আপনারা রাজনৈতিক প্রতিযোগী হতে পারেন, কিন্তু শত্রু নন। নিজেদের মধ্যকার ঐক্য বজায় না রাখলে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন হবে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো কোনো বিদেশী শক্তি যেন আর কখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব গ্রাস করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, পলাশীর যুদ্ধ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—পরনির্ভরশীলতা বর্জন করা। মীর জাফর, জগতশেঠ বা রায়দুর্লভদের মতো তৎকালীন সুবিধাভোগী বণিক গোষ্ঠী দেশের স্বার্থ না দেখে নিজেদের আর্থিক স্বার্থে বিদেশী শক্তির সাথে হাত মিলিয়েছিল। এর কোনো ঐতিহাসিক সুফল দেশ পায়নি, বরং দীর্ঘমেয়াদি লুণ্ঠন চলেছে। গত ১৭ বছরেও আমরা একই রকম হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠনের চিত্র দেখেছি।
ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে উপাচার্য বলেন, বঙ্গোপসাগরের অবস্থানগত কারণে তৎকালীন ব্রিটিশদের কাছে এই অঞ্চলটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বর্তমান বিশ্বেও কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। এখন আর সরাসরি ঘোড়া বা অস্ত্র নিয়ে দেশ দখল করা হয় না; বরং বহুজাতিক কোম্পানি ও পরাশক্তিগুলো ঋণ এবং তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগিতার নামে 'নব্য-উপনিবেশবাদ' (Neo-colonialism) ও পুঁজির আধিপত্য কায়েম করে। রাজনৈতিক দল ও উপদলগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তারা ফায়দা লোটে। আমাদের এই বিভ্রান্তি ও ফাঁদ থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উপাচার্য বলেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর আজ আমরা আন্দোলনের শক্তির মধ্যে যে বিভাজন ও বিভিন্ন ব্যানারে ফাটল দেখছি, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই অনৈক্যের মাধ্যমে আমরা কি আবার জগতশেঠ বা রায়দুর্লভদের উৎসাহিত করছি না? আমাদের আদর্শিক পার্থক্য থাকবে, কিন্তু দেশপ্রেমের জায়গায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যেমন শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক ঐক্যের মাধ্যমে একটি সুন্দর সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও এই চর্চা বজায় রাখতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় থাকবে। পরিশেষে উপাচার্য জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণ করে বলেন, তরুণরা দেশের জন্য প্রাণ দিতে পেরেছে, আর আমরা আমাদের সততা ও শ্রম দিয়ে এই অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করব।
বিবার্তা/সামিয়া তাসনীম/এসএম
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]