বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতি
ঢাবির বঙ্গবন্ধু হলের নাম পরিবর্তন হঠকারিতা
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫২
ঢাবির বঙ্গবন্ধু হলের নাম পরিবর্তন হঠকারিতা
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তনে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।


শনিবার (১০ জানুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়। এর মধ্যে অন্যতম নিন্দনীয় হলো বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ ও নাম বদলের সংস্কৃতি। বহু বছর ধরে এই সংস্কৃতি চলে আসলেও, এই সংস্কৃতিকে একটা ‘শিল্পে’ রূপ দিয়েছিল বিগত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকার। সেটা এতটাই যে, বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজে বহু মানুষের অবদান থাকলেও, শুধু শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থে স্থাপনা নির্মাণ একটা প্রতিকারহীন প্রবণতায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল স্পষ্টত দলীয়করণের উর্ধ্বে পারিবারিকীকরণ। এই প্রবণতায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছেন খোদ শেখ মুজিবুর রহমান। সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ও এ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনার হিসাব করলেও দেখা যাবে, শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবন, হল, অনুষদ ভবন, বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সড়ক ও চত্বরের নাম পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বস্তুত, নামকরণ ও নাম পরিবর্তনের কোনো নীতিমালা বাংলাদেশে না থাকায় এ ধরণের অদ্ভুত কর্মকাণ্ড বছরের পর বছর ঘটেই যাচ্ছে।


বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, রাষ্ট্র ও জনগণের টাকা খরচ করে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় এই নামকরণের সংস্কৃতি স্পষ্টতই বন্ধ হওয়া উচিত বাংলাদেশে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কারও নামে স্থাপিত স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতিতেও রেশ টানা প্রয়োজন। কিন্তু, নয়া বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষায় জন্ম নেওয়া জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমরা দেখতে পেলাম, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মরিয়া হয়ে উঠল। যেগুলোর প্রয়োজন ছিল, সেগুলো নিয়ে খুব বেশি সমালোচনার অবকাশ না থাকলেও, এমন অনেক স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে কিংবা করতে উদ্যত হয়েছেন সংশ্লিষ্টজনরা যা অনভিপ্রেত ও অপ্রয়োজনীয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি খড়গ পড়েছে শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলোর ওপর। কিন্তু, পাশাপাশি দেখা গেছে যা কিছু ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে’র নামে স্থাপিত, সেগুলোতেও হাত দেওয়া হয়েছে।


এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নামান্তরিত না হলেও, দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর পূর্বনাম বাতিল করে কোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন না করেই অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ঘটনার নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। যেমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু হলের নাম রাখা হয়েছে বিজয় ২৪, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নতুন নাম শেরে বাংলা একে ফজলুল হক হল, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু হলের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে মওলানা ভাসানী হল। এছাড়া, এর আগে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের দাবি উঠেছিল। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তি ও শিক্ষাবিদের নামে থাকা ভবনগুলোর পরিচয় বদলে ফেলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, এগুলো কোনো চেতনা থেকে নয়, বরং, যা কিছু বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত সেগুলোকে মুছে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের নীলনকশা চলমান রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে। আমরা আবারও এই প্রবণতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।


আমরা মনে করি, এই প্রবণতারই সর্বশেষ নজির গড়া হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কারিগর এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে থেকেও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত প্রায় ৪০ বছর আগের একটি হলের নাম পরিবর্তন করে শহিদ ওসমান হাদির নামে বদলে দেয়ার সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। জানা যাচ্ছে, এই সুপারিশ সিনেটে চূড়ান্ত করা হতে পারে। বরাবরের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এই পরিবর্তন-প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করছে এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার দাবি জানাচ্ছে।


আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নতুন দুই ছাত্রাবাস নির্মিত হয় তখন জাতীয় দুই নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়; ছাত্রাবাস দু’টি পাশাপাশি অবস্থিত। এরপর বহু সরকার এসেছে ও গিয়েছে, কখনো এই দুই ছাত্রাবাসের নাম পরিবর্তনের কথা ওঠেনি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ডামাডোলে অনেক ভাঙচুর ও পরিবর্তন হচ্ছে, যার অনেক কিছুই ন্যায্য নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়টি সংঘটিত হয়েছিল শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এবং তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধের লড়াই চূড়ান্ত বিজয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন শেখ মুজিবুরের নাম স্মরণ করেই। জাতীয় নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের নামে বাংলাদেশের প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি পাশাপাশি ছাত্রবাস থাকার যে সহাবস্থানগত সৌন্দর্য, তা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিকে স্পন্দিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু, তার মানে এই নয় যে, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে বলে শেখ মুজিবুরের নাম মুছে ফেলতে হবে। বরং, তাঁর নামে একটি ছাত্রাবাস থাকা কেবল ন্যায্যই নয়, প্রয়োজনীয়ও বটে।


উল্টো ওই ছাত্রাবাসের নাম পরিবর্তন করে শহিদ ওসমান হাদির নামে বদলানো এক হটকারী সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ক উদ্দেশ্যের বহিঃপ্রকাশ। শহিদ হাদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের বিপরীতে দাঁড় করানোর এই কূটকৌশলের আমরা নিন্দা জানাই। জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে তরুণ হাদি এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হন। তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার প্রতি মানুষের আবেগ আকাশচুম্বী হয়। তার প্রতিবাদ ও যথাযথ বিচার চেয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু মানুষের আবেগকে পুঁজি করে ও হাদির নাম ব্যবহার করে নিজ নিজ রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাইছে কোনো কোনো পক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে শহিদ হাদির নামে নতুন কোনো ভবনের নাম দেয়া যেতে পারে, কিন্তু প্রায় তিন-চার দশক ধরে জাতীয় নেতার নামে যে ছাত্রাবাস এক নামে পরিচিত, তা বদলে দেয়ার উদ্যোগকে আমরা সন্দেহ করি ও মনে করি হীন রাজনৈতিক ক্ষুদ্রতা থেকে উদ্ভূত। অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানাই আমরা।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com