বাগদাদের বইয়ের বাজার
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৮, ২০:০২
বাগদাদের বইয়ের বাজার
হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী
প্রিন্ট অ-অ+

আজ থেকে দু' দশক আগে মাহের আবু হিশাম যখন বাগদাদের মুতানাব্বি স্ট্রিটে তাঁর বুকশপটি চালু করেন, তখন প্রতিদিন গড়ে বই বিক্রি অতো গোটা চল্লিশেক। তখন দেশটিতে সাদ্দাম হোসেনের ভয়ঙ্কর স্বৈরশাসন চলছে। কোনো বই শাসকগোষ্ঠীর পছন্দ না-হলেই তারা সেটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতো। তবুও ওই সময় ভালো একটা বইয়ের জন্য পাঠকদের তৃষ্ণা ছিল দেখার মতো।


২০০৩ সালে এসে দৃশ্যপট পাল্টে গেল। মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোটের অভিযানে গদি হারালেন সাদ্দাম। বইপত্রের ওপর থেকে সেন্সরশিপ উঠে গেল। বইপত্রের ব্যবসা তো ভালোই হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটলো উল্টো। দেখা গেলো, এখন প্রতিদিনের বিক্রি অল্প ক'টি বইয়ে এসে ঠেকেছে।


তবে ওই দুর্দিন অবশ্য কেটেও গেল। ফোরাত নদীর তীরঘেঁষে অবস্থিত মুতানাব্বি স্ট্রিটে এখন গড়ে উঠেছে কয়েক ডজন বইয়ের দোকান। গেলেই চোখে পড়ে ট্রলি থেকে নামছে বান্ডিল-বান্ডিল বই। সব মিলিয়ে এলাকাটি যেন হয়ে উঠেছে পরিবর্তনশীল বাগদাদ নগরীর সৌভাগ্যের প্রতীক।


সাদ্দামের পতনের পর থেকেই সেখানে একের পর এক বুকশপ গড়ে উঠতে থাকে। বইপ্রেমী মানুষদের সমাগমে মুখর হতে থাকে এলাকাটি। শুক্রবার ছুটির দিনে গেলেই দেখা যায়, দশম শতাব্দীর কবি মুতানাব্বি, যার নামে এ স্ট্রিট, তাঁর ভাস্কর্যের কাছে অবস্থিত বইয়ের বাজারটিতে যেন মেলা বসেছে চলচ্চিত্রকার, সংগীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী - এরকম মানুষদের।


২০০৬-০৭ সালের দিকে বাগদাদের নিরাপত্তাব্যবস্থার বেশ উন্নতি হয়। কিন্তু তখনো ইরাকের অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটেনি। ফলে অনেক বইপ্রেমী মানুষেরও অবস্থা এমন ছিল যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই তাদের জান কাবার, বই তো বহু পরে।


কথা হয় হিশামের সঙ্গে; তাঁর এক কামরাবিশিষ্ট বুকশপে বসে। চারদিকে রাজনীতি ও ধর্মবিষয়ক বই থরে-থরে সাজানো। আছে একাডেমিক বইপত্রও। হিশাম বলছিলেন, ২০০৩ সালে বইয়ের ব্যবসা বাড়তে থাকে। এসময় যেমন নতুন-নতুন অনেক দোকান হয়, তেমনি বিদেশী নানা রকম বইও আসতে থাকে জোয়ারের মতো। কিন্তু এখন মানুষের হাতে বই কেনার সময় নেই।


অন্য বইবিক্রেতারা বলেন, চড়া কাস্টম ডিউটিও বইয়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া গত মে মাসের নির্বাচনের পর যে অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতেও এ ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে। এক বিক্রেতা বলেন, নির্বাচনের আগে যত লোক বই কিনতো, এখন অত ক্রেতা পাই না।


ফিকশন আসক্তি


দশকের পর দশক ধরে মুতানাব্বি স্ট্রিট বিবেচিত হয়ে আসছে ইরাকের ইন্টেলেকচুয়াল লাইফের একটা কেন্দ্ররূপে। বাগদাদ নগরীতে একটা প্রবাদ চালু আছে : ''কায়রো লিখে, বৈরুত ছাপে আর বাগদাদ পড়ে''।


যখন বাগদাদ অনলাইনে বই কেনার কথা শোনেনি, তখন লোকজন তাদের কাঙ্ক্ষিত বইটির খোঁজে বুকশপে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে যেত। কেউবা কাগজে লিখে আনতো প্রার্থিত বইয়ের নাম।


ইরাকী প্রকাশকরা এখন নতুন-নতুন বই বের করে চলেছেন। বুকস্টলে সেগুলো পাওয়াও যায়। তবে ফুটপাথে যারা বই বিক্রি করেন তাদের সংগ্রহ বিস্ময়কর। তাদের কাছে মিলবে লুট হয়ে যাওয়া বাগদাদ জাদুঘরের গাইড বই থেকে শুরু করে '৮০ দশকে পূর্ব জার্মানি থেকে প্রকাশিত কমিউনিস্ট প্রপাগান্ডামূলক বই, '৭০ দশকে ইরাকের সুদিনের সচিত্র পুস্তক - প্রায় সবই।


মুতানাব্বি স্ট্রিটে বই কিনতে এসেছিলেন আল-মুস্তানসিরিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর আবদুল সাত্তার জাবর। তিনি কিনেছেন আরবীতে লেখা প্রাচীণ রাশিয়ার ইতিহাস। কথায়-কথায় বললেন, ফিকশনের (গল্প-উপন্যাস) চাহিদাই বেশি। ফলে ২০০৩ সাল থেকে ইরাকে ১,২০০এর বেশি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।


বইয়ের ক্রেতাদের প্রোফাইলও বদলে যাচ্ছে। ওখানে দু'বার গিয়ে দেখা যায় অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সের মানুষের সমাগমই বেশি। তরুণ যারা তাদের বেশিরভাগই ছাত্র ; এসেছে পড়াশোনার কাজে লাগে এমন বইয়ের খোঁজে।


দেখা হয় আদনান মনসূরের সঙ্গে। ৭৫ বছর বয়সী এ প্রবীণ মানুষটি পেশাগত জীবনে ছিলেন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক। এখন অবসর নিয়েছেন। তিনি সেই ১৯৫৯ সাল থেকে এ বইবাজারে আসেন। বললেন, পুরনো লোকজন সব একে-একে মারা যাচ্ছেন। কারা কিনবে বই? আজকালকার ছেলেপেলেরা স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটেই বেশি মজা পায়।


শাবান্দর ক্যাফেতে বসে চায়ে চুমুক দিতে-দিতে মি. মনসূর স্মৃতিচারণ করলেন হারানো দিনের, যখন বিক্রেতারা ট্রলির পর ট্রলি ভরে বই আনতেন। তাঁর নিজের সংগ্রহেই আছে প্রায় ছয় হাজার বই। বইয়ে তাঁর বেডরুম পর্যন্ত বোঝাই। সেদিনের কথা বলা হচ্ছে সেদিনও তিনি ধর্ম বিষয়ক ছয়টি একাডেমিক বই কিনেছেন।


মি. মনসূরের প্রিয় বইবিক্রেতা হচ্ছেন হিশাম। হিশাম বলেন, ব্যবসায় যদি লোকসানও হয় তবুও বইয়ের ব্যবসা ছাড়ব না। জানি, আজকাল এটা কোনো ভালো ব্যবসা নয়। কিন্তু আমি বই ভালোবাসি। সূত্র : জর্দান টাইমস


বিবার্তা/হুমায়ুন/সোহান

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com