শহরের যান্ত্রিক জীবন মানুষের হতাশার প্রধান কারণ
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:৪৩
শহরের যান্ত্রিক জীবন মানুষের হতাশার প্রধান কারণ
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

দেশের রাজধানী শহর ঢাকা।এ শহরে বসবাসকারীরাও যেন ঢাকা পড়ে আছেন জ্যাম, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, প্রযুক্তি দাসত্বসহ অনিশ্চয়তার মাঝে। ফলে এ শহরের মানুষকে প্রতিদিন-ই দুর্ভোগ-দুর্দশা পোহাতে হচ্ছে। আর এতে তারা হাঁপিয়ে উঠছেন। যান্ত্রিক এই শহুরেজীবন তাদের জীবনের সুখকে যেন কেড়ে নিয়েছে। হতাশ হয়ে পড়ছেন তারা। কেউ কেউ হতাশ হতে হতে বিষণ্ণতায় ভুগছেন।


চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসের বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার ৬৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে হতাশায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এছাড়া মোট জনগোষ্ঠীর ৪৪ শতাংশই বিষণ্ণতায় ভুগছেন। গবেষকরা বলছেন, শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা, দারিদ্র্যতা, অনুন্নত জীবনযাত্রার মান ও দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার কারণে মানুষ হতাশায় ভুগছেন।



রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা দেশের রাজধানী হলেও এশহর এখন অনেকটা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ট্রাফিক জ্যাম, বায়ু দূষণ, বিশুদ্ধ পানির অভাব, ইভটিজিং, বাজে রাস্তাঘাট নগরবাসীর নিত্যদিনের সমস্যা। যাতে ভুক্তভোগী হয়ে নগরের মানুষ প্রতিনিয়ত হতাশ হচ্ছেন। তাছাড়া দেশের বেশিরভাগ কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য প্রায় সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এ শহরে প্রতিদিনই পাড়ি জমাচ্ছেন গ্রামের অগণিত মানুষ। ফলে এ শহরের ঘনত্ব দিন দিন বাড়ছে। যা শহরের পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। এ শহরে এখন স্বস্তিতে পা ফেলার জায়গা পাওয়াও মুশকিল। দালানকোঠা-বিল্ডিং, অগণিত যানবাহন আর মানুষে ঢাকা পড়েছে এই শহরটি। যার ফলে এখানে বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নেয়াও দায়। এ শহরের অসহায় মানুষের একমাত্র ভরসা রাস্তা-ঘাট। তারা এখানে ঘুমান, প্রস্রাব-পায়খানাসহ যাবতীয় কাজও এখানে সারেন। ফলে এ শহরের অধিকাংশ রাস্তায় হাঁটতে গেলে গন্ধ আসে। যা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে।


নগরবাসী জানান, যান্ত্রিক শহরে বসবাস করে এখানের জীবনযাত্রাও অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। কর্মব্যস্ত এ শহরে কারো দিকে কারো তাকানোর সময় যেন নেই।সবাই শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবছেন। পারস্পরিক সুখ-দুঃখে এখানে কাউকে তেমন একটা পাওয়া যায় না। ফলে একটা সময় মানুষ একাকীত্ব অনুভব করে হতাশ হয়ে যায়।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ফাহাদ ইসলাম মুঠোফোনে বিবার্তাকে বলেন, তিনি শাহবাগে থাকেন কিন্তু তার কর্মস্থল মিরপুর ১৪ তে। তার সকাল ৮টায় অফিস থাকায়, সকাল ৬টায় বাসা থেকে বের হলেও রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যামের কারণে সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারবেন কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে বিকাল ৫টায় অফিস শেষ করলে কখন বাসা পৌঁছাবেন, তারও কোনো ঠিক নাই। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ তো আছেই। প্রতিদিনের এই দুর্ভোগ তার মতো হাজারো মানুষকে হতাশ করছে বলে জানান তিনি।


যান্ত্রিক এই শহরে মধ্যবিও, নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরো বেশি বলে জানালেন পোশাক কারখানার শ্রমিক রতন মিয়া। তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমরা যারা নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ আছি, তাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। তার কারণ হলো, আমাদের আয়ের সাথে ব্যয়ের কোনো মিল থাকেনা। তাছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমাদের আরো বেশি ভোগাচ্ছে। হত-দরিদ্ররা তো অনেকের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পায়। আমরা তো কারো কাছে কোনো কিছু চাইতেও পারি না।



এদিকে মালিকপক্ষও অনেকসময় আমাদের সামান্য পারিশ্রমিক নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। তারা শুধু নিজেদের ভোগ-বিলাসে ব্যস্ত। এসব কারণে এ শহরের সীমিত আয়ের লোকজন ভালো নেই।


এদিকে এই শহরের উচ্চ শিক্ষিত গ্রাজুয়েটরাও হতাশায় ভুগছেন বলে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। আরিফুল ইসলাম নামের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করা এই শিক্ষার্থী বিবার্তাকে বলেন, প্রতি বছর যে হারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গ্রাজুয়েট বের হচ্ছে, সে অনুপাতে তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা ভালো চাকরি পাওয়া নিয়ে হতাশায় ভুগছেন।


তিনি বলেন, ৪০তম বিসিএসে মাত্র ১ হাজার ৯০৩টি পোস্টের জন্য প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। উচ্চ শিক্ষিতরা কি পরিমাণ বেকার আছেন, তা কোনো চাকরির পরীক্ষার আবেদনের সংখ্যা দেখলে ভালোভাবে বুঝা যায়। মূলত ক্যারিয়ার ভাবনায় সুখে নেই এ শহরের গ্রাজুয়েটরা।


রাজধানীর মানুষের হতাশ হওয়ারবিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. আকিব-উল হক বিবার্তাকে বলেন, জীবন, চ্যালেঞ্জ, দৈনন্দিন কাজে প্রতিনিয়ত যদি সাফার করতে হয় তাহলে মানুষের মাঝে হতাশা চলে আসে। রাজধানী ঢাকা শহরের মানুষের ক্ষেত্রে এটা ঘটছে। এ শহরের মানুষ প্রতিদিন যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, বিশৃঙ্খলাসহ নানাবিধ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ হতাশাটা এই যান্ত্রিক শহরের সবার ক্ষেত্রে হচ্ছে। এছাড়া এই শহরের ব্যক্তিভেদে নানান মানুষ নানান বিষয়কে ঘিরে হতাশ হচ্ছেন। কেউ অর্থনৈতিক সমস্যা, কেউবা পারিবারিক সমস্যা, আবার কেউবা যান্ত্রিক এই শহরে টিকে থাকতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন।


তিনি বলেন, যদি কেউ আমাদের কাছে হতাশা নিয়ে আসে। তাহলে আমরা হতাশাটা কোনো লেভেলে আছে, সেটা আগে জানতে চেষ্টা করি। তারপর হতাশার ধরণ অনুযায়ী মানুষকে দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকি।


রাজধানীর মানুষের হতাশা কাটিয়ে উঠা সম্পর্কে এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, ঢাকা শহরের সবার ক্ষেত্রে ভোগান্তির যে হতাশাটা আছে, সেটা কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের সিস্টেমটাকে পরিবর্তন করতে হবে। দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে সবাইকে যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে। যেমন, ট্রাফিক পুলিশ তার দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করলে যানজট একেবারে নিরসন না হলেও অনেকাংশে কমবে, কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া মেনে নিলে শ্রমিকদের হতাশা থাকবে না, উচ্চ শিক্ষিতদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি পারলে তাদেরও হতাশা কমবে। একইভাবে দ্রব্যমল্যের ঊধ্বগতি ঠেকাতে পারলে এ শহরের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তদের হতাশাও কমবে।



বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ড. বেলাল আল মুহতাসিম বিবার্তাকে বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে বর্তমানে কলকারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। আগে একটি কারখানায় যত শ্রমিক লাগত, প্রযুক্তি আসায় মেশিনের সাহায্যে কাজ করায় আগের মতো শ্রমিক লাগছে না। ফলে কারখানা থেকে শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। আর এতে অনেক মানুষ বেকার হয়ে হতাশায় ভুগছে। আবার আমরা দেখতে পাই, রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ মানুষ, ঢাকার বাহিরের। তারা এখানে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন কারণে বসবাস করছেন। কিন্তু তারা নিজ জন্মস্থান ছেড়ে এখানে বসবাস করায়, অনেক আপনজনকে কাছে পাচ্ছেন না। ফলে তারা অনেকটা সোসাইটিলেজ হয়ে পড়ছেন।


তিনি বলেন, এদিকে ঢাকা শহরের মানুষের মাঝে পারস্পরিক আন্তরিকতার অভাবও দেখা যায়। এখানে সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। অন্যের সুখ-দুঃখে তাদের কি যায় আসে ? নিষ্ঠুর এ শহরে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থেকেও অনেক সময় একজনের সাথে আরেকজনের পরিচয় থাকে না। এসব কারণে এ শহরের মানুষ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে হতাশায় ভোগেন।


এই মনোবিজ্ঞানী আরো বলেন, হতাশার আরেকটি বড় কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এ মাধ্যমে মানুষের ভার্চুয়াল বন্ধুর সংখ্যা বাড়লেও বাস্তব জীবনের বন্ধুর সংখ্যা ঠিকই কমিয়ে দিয়েছে এই মাধ্যমটি। মানুষ এমাধ্যমে অত্যধিক আসক্ত হওয়ার পর একটা পর্যায়ে এসে ঠিকই একাকীত্ব অনুভব করে হতাশায় ভোগে। তাছাড়া এ মাধ্যমে অনেক সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে হতাশায় ভোগে।


বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. সারাহ খান বিবার্তাকে বলেন, ভোগবাদিতা, দারিদ্রতা, কর্মবিমুখ শিক্ষা, পারিবারিক দূরত্ব, এক কেন্দ্রীভূত শিল্পায়ন, ধর্মীয় চর্চার অভাব ইত্যাদি কারণে মানুষ হতাশায় ভোগেন। রাজধানী ঢাকার মানুষও এ সমস্যাগুলোর কারণে হতাশ হচ্ছেন। এখানে বড় লোকদের অধিকাংশের ভোগবাদিতার শেষ থাকেনা। এছাড়া তাদের এ শহরের ট্রাফিক জ্যাম, বায়ু দূষণসহ নিত্যদিনের সমস্যাগুলোও ফেইস করতে হচ্ছে। ফলে এখানে উচ্চবিত্তবানরাও সুখে নেই। অপরদিকে এ শহরে সীমিত আয়ের মানুষদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হচ্ছে। ফলে তারাও সুখে নেই। দরিদ্রদের অবস্থাও এ শহরে আরো ভয়াবহ। যান্ত্রিক এ শহরে নানা শ্রেণির মানুষ নানাভাবে হতাশ। এ হতাশা কারো একটু কম, আবার কারো বেশি হয়ে বিষণ্ণতা পর্যন্ত চলে যায়।


বিবার্তা/রাসেল/উজ্জ্বল/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com