ফেরিওয়ালাদের কাঁধে উড়ছে লাল-সবুজের বিজয় নিশান
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩:৫৩
ফেরিওয়ালাদের কাঁধে উড়ছে লাল-সবুজের বিজয় নিশান
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

সোমবার ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিল।দীর্ঘ নয় মাসে ত্রিশ লাখ বাঙালির প্রাণ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নেয়া খানসেনারা নতজানু হয়ে লড়াকু বাঙালির কাছে পরাজয় মেনে নেয়। এর মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকা।


পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম জানান দেয়ার দিন। এই মহান দিনে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সেই মহান শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করছে। সারা দেশে নানা আয়োজন ও অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে ২০১৯ সালের মহান বিজয় দিবস।


দুই যুগের পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে নতুন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল যে বাংলাদেশ, সোমবার তার ৪৮ বছর পূর্তি উদযাপন করছে জাতি।


এই দিনটিকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে জাতীয় পতাকার বিক্রি করছেন ফেরিওয়ালারা। জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সেই দিনটিকে কেন্দ্র করে চারদিকে লাল-সবুজের ফেরিওয়ালাদের কাঁধে পতপত করে উড়ছে বিজয়ের নিশান।


ডিসেম্বরের শুরু থেকে ফেরিওয়ালাদের রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, কাঁটাবন, নীলক্ষেত, ধানমন্ডী, শংকর, মোহাম্মদপুর শ্যামলীর পথে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে লাল-সবুজের পতাকা বিক্রি করতে দেখা গেছে। ফেরিওয়ালাদের কাঁধে কাঁধে উড়ছে নানা আকারের জাতীয় পতাকা। কোনোটা ছোট, কোনোটা মাঝারি আবার কোনোটা বড়।


এসব ফেরিওয়ালারা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার বিজয়ের মাস ১৬ ডিসেম্বরকে ঘিরে সারা শহরে পতাকা বিক্রি অনেকটা বেড়েছে। ছোট শিশু থেকে শুরু করে আবাল বৃদ্ধা-বণিতা সব শ্রেণির মানুষেরাই জাতীয় পতাকা কিছেন। ছোট ছোট শিশুরা হাতে পতাকা ও মাথায় ব্যান্ড পরছেন।
মোহাম্মদপুর এলাকায় রাজপথে পতাকা বিক্রি করছিলেন আব্দুল কাসেম। তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমি বাঙালি। দেশকে ভালোবাসি। শুধু পেশার খাতিরেই এই পতাকা বিক্রি করা নয়। এ পেশার মধ্যে রয়েছে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেম। প্রতিবছর বিজয় দিবস উপলক্ষে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে জাতীয় পতাকা বানাই। এর পরে ডিসেম্বর মাস শুরু হলে পথে নেমে পড়ি বিজয়ের পতাকা বিক্রি করতে। ১ ডিসেম্বর থেকে বিক্রি শুরু হয় চলে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আগামীকাল বেশি বিক্রি হবে।


রাজধানীর ফার্মগেটে আরেক পতাকা বিক্রেতা মনিরুল খন্দকার বলেন, আমি মূর্খ মানুষ ভাই। বেশি কিছু জানি না। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সংগ্রাম ও যুদ্ধের গল্প শুনেছি যে আমাদের এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল নয় মাসের সংগ্রাম করে। অনেক মা-বোনদের ইজ্জত কাইরা নিয়েছিল পাকিস্তানীরা। আমি এই পতাকা বিক্রি করি পেটের দায়ে। আর কোনো কারণে না। এবার বেশ ভালই বিক্রি করছি। ভাই আপনি একটা নিয়ে যান। আরেকটা বিক্রি বাড়বে।


সংসারে অভাব-অনটনের কারণে তেমন পড়ালেখা করতে পারেননি আবুল কালাম। পথে পথে ফেরি করে নিত্যদিনের প্রয়োজনী কিছু জামাকাপড়, কখনোবা গামছা, লুঙ্গি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। কালাম বিবার্তাকে বলেন, ভাই আমার কাজ পথে পথে ফেরি করা। বিজয়ের মাসে পতাকা বিক্রি করি। লাল-সবুজের মধ্যে অন্যরকম একটা ভাললাগা কাজ করে। তাই অন্তরের তাগিদ থেকেই পতাকা বিক্রি করছি। কাল সবচেয়ে বেশি বিক্রি করতে পারবো।


ধানমন্ডীতে সালাউদ্দিন নামে এক তরুণ লাল-সবুজের পতাকা বিক্রি করছিলেন। তিনি জানান, ভাই আমি তো আর মুক্তিযুদ্ধ দেখি নাই। কোনো স্বাধীনতার সংগ্রামও দেখি নাই। শুধু শুনেছি। গল্প শুনেই মনে দেশের জন্য কিছু করতে মন চায়। তাই এই পতাকা বিক্রি করে মনের ইচ্ছা পূরণ করতে চাই।


তরুণের কাঁধে হরেক রকম পতাকা দেখে দাম জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, প্রতিটি ১ ফুট স্টিক পতাকার দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা। ৫ ফুট বাই ৩ ফুট পতাকার দাম ১১০ থেকে ১৫০ টাকা। ৬ ফুট বাই সাড়ে ৩ ফুট একটি পতাকা বিক্রি করেন ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। এ ছাড়া হাত ও মাথার ব্যান্ড ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।


বিক্রি কেমন হয় জানতে চাইলে জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিনে বিভিন্ন আকারের ১৫ থেকে ২০টা পতাকা বিক্রি করা যায়। দিনশেষে ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা আয় করা যায়।


এই লাল সবুজের সাথে জড়িয়ে আছে বাঙালির আত্মার এক অদৃশ্য বন্ধন। সেই অদৃশ্য বন্ধনের কারণেই ঘড়ির কাটা ১২ বাজার সাথে সাথেই জাতি সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করবে দেশের পরাধীনতার গ্লানি মোচনে প্রাণ উৎসর্গ করা বীর সন্তানদের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল নামবে। শ্রদ্ধার সাথে তারা শহীদের উদ্দেশে নিবেদন করবেন পুষ্পাঞ্জলি। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সব প্রান্তের মানুষ অংশ নেবে বিজয় দিবসে। আর আকাশ বাতাস মুখরিত হবে মুক্তিযুদ্ধ সময়ের জাগরণী ও বিজয়ের গানে।


বিজয়ের ৪৮তম বার্ষিকীর এই ক্ষণকে রাঙাতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সারা ঢাকা শহর। এদিকে বিজয় দিবসকে সামনে রেখে নগরীর ফুলের দোকানগুলোতেও চরম ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিক্রেতারা। নানা রকম ফুলের তোড়া তৈরিতে ব্যস্ত সবাই। বিজয়ের এই ক্ষণকে স্বাগত জানিয়ে একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে প্রস্তুত রাজধানীর সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিরাও।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com