ধুলার নগরী ঢাকা
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:২৪
ধুলার নগরী ঢাকা
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

রাজধানী ঢাকা সবার কাছে যানজটের নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন ওই নগরী ধুলার নগরীতে পরিণত হয়েছে।রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানজটের পাশাপাশি ধুলাবালি মিশ্রিত বাতাসের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন সাধারণ মানুষ। শুধু তাই নয়, ধুলার কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিনিয়ত হাসপাতালে যেতে হচ্ছে অনেককেই। এ ক্ষেত্রে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু এবং বৃদ্ধরা।


সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।



রাজধানী ঢাকার চিত্র


সরেজিমনে রাজধানীর কাটাবন, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, পল্টন, আগারগাঁও ও পুরান ঢাকার লালবাগ, আজিমপুর, চকবাজার, বেগমবাজার, ইমামগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে প্রায় সব সড়কেই উড়ছে ধুলা।


মেট্রোরেলসহ চলমান কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ধুলার রাজ্যে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি ধুলা উপদ্রব কমানোর কাজ চালিয়ে গেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দিন দিন ধুলার উপদ্রব বাড়বে। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি দফরগুলোর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনো নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।


গতকাল বুধবার (১১ ডিসেম্বর) রাত ১০টার পর রাজধানীর শাহবাগ, কাটাবন, কারাওয়ান বাজার, ফার্মগেট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ওইসব এলাকায় ছোট যানের পাশাপাশি বাস ও ট্রাক চলাচল করছে। কিন্তু ট্রাক চলাচলের কারণে বাসের সাথে ধুলাবালির পরিমাণটা বেশি উড়ছে। এ সময় পথচারীরা মুখে হাতে দিয়ে রাস্তা পার হতে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ মাস্ক ব্যবহার করে রাস্তায় চলাচল করতেও দেখা গেছে।কিন্তু মাস্ক ব্যবহারকারীরাও ধুলার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন।


জাহাঙ্গীর নামের এক পথচারি বিবার্তাকে জানান, তার বাসা কারওয়ান বাজার এলাকায়। তিনি নীলক্ষেত এলাকায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। সেই সুবাদে প্রতিদিন কাটাবন মোড় হয়ে কারওয়ান বাজারে যান। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে বাসের সাথে অনেক বেশি ধুলাবালি উড়ছে। তাই রাতে বাসায় যাওয়ার সময় তাকে মাস্ক ব্যবহার করতে হয়।



এভাবে নাক মুখ চেপে ধরে চলাচল করছে নগরবাসী


তিনি বলেন, মাস্ক ব্যবহার করলেও চলে না। রাস্তায় ধুলার পরিমাণ এত বেশি; অনেক সময় ধুলার কারণে রাস্তাও দেখা যায় না।


তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় চলাচল করা সম্ভব হবে না। তাই সময় থাকতেই এ সমস্যার মোকাবেলা করা দরকার।


ফার্মগেটের আশরাফুল আলাম নামের এক বাসিন্দা বিবার্তাকে বলেন, তিনি গত ১০ দিন ধরে সর্দি-কাশি রোগে ভুগছেন।ঔষধ খেয়েও তার রোগ কমছে না।


ডাক্তারদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ধুলাবালুর কারণে আমার এই রোগ হয়েছে।


ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দীর্ঘ দিন কর্মরত সাংবাদিক বুলবুল চৌধুরী। তিনি বিবার্তাকে বলেন, শীত আসলে সর্দি-জ্বরে আক্রন্ত রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা যায়। কিন্তু অন্যবারের তুলনায় এবার রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।


আমাদের বিবার্তা২৪ডটনেটের প্রধান প্রতিবেদক উজ্জ্বল এ গমেজ মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, বেড়িবাধ, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসহ রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ঘুরেছেন। তিনি বলেন, আমি সব সময় মোটরসাইকেলে চলাফেরা করি। কিন্তু ধুলার কারণে আমার মোটরসাইকেল চালাতে খুবই সমস্যা হয়। মাঝে মাঝে কিছুই দেখি না। বেশি বিপদে পড়ি বাচ্চকে সাথে নিয়ে বের হলে। চোখে ধুলাবালি গেলে সে খুবই অস্বস্তিতে পড়ে।



একটি বাস চলে যাওয়ার পরের চিত্র


বিবার্তার নিজস্ব প্রতিবেদক সৌখিন আদনান থাকেন মিরপুর এলাকায়। এলাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে তিনি বলেন, মিরপুর ডিএইচএস থেকে শুরু করে আগারগাঁও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ধুলাবালু। ওই রাস্তায় চলাচলকারী লোকজন সবাই মাস্ক ব্যবহার করেন। তারপরও তারা অস্বস্তিতে রয়েছেন।


এদিকে, ধুলাবালুর কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও কিছু সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ তা অনেক কমিয়ে আনতে পারে বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা।


আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস ও এয়ার ভিজ্যুয়াল গবেষণা জরিপ মতে, ২০১৮ সালের দূষণের সূচকে বিশ্বের তিন হাজার ৯৫টি শহর রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দূষিত ৩০টি শহরের ২২টি ভারতের। বাকিগুলোর মধ্যে দুটি পাকিস্তানে, পাঁচটি চীনে ও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা রয়েছে।


বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বায়ুদূষণের ফলে শুধু ফুসফুসকেন্দ্রিক রোগ বিস্তার লাভ করতে পারে এমনটি নয়। এর মাধ্যমে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের মতো মারাত্মক রোগও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি অনেক ছোটখাটো রোগবালাইসহ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও শিশুদের মধ্যে অ্যাজমার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়েতে পারে। বায়ুদূষণের লাগাম টেনে না ধরতে পারলে শ্বাসজনিত নানা রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সার ও জেনেটিক পরিবির্তনজনিত নানা অজানা রোগে ভুগতে হতে পারে চরমভাবে। এতে এক দিকে যেমন চিকিৎসাব্যয় বেড়ে যাবে তেমনিভাবে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে উৎপাদনশীতাও ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে।


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সুমন প্রধান বিবার্তাকে বলেন, সাধারণত শীতকাল আসলে এজমা ও শ্বাসকষ্ট রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। কিন্তু অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার এসব রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।


নগরীতে ধুলাবালুর পরিমাণ বেশি হওয়াতে এসব রোগে লোকজান আক্রন্ত হচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা রোগীদের মাস্ক ব্যবহার করে সাবধানে চলাচল করার পরামর্শ দিয়ে থাকি। কিন্তু সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট দফতর ধুলা মুক্ত নগরী না করা পর্যন্ত এ সমস্যা সমাধান হবে না।



রাজধানীর একটি সড়কের চিত্র


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগে. জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন বিবার্তাকে বলেন, এ বিষয়টি আমাদের পরিবেশ শাখা ও বর্জ ব্যবস্থাপনা শাখা দেখবাল করছে।


তবে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন বিবার্তাকে বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে সকাল-বিকাল বিভিন্ন এলাকায় পানি ছিটানোর কাজ চলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ধুলা মুক্ত করার জন্য ৯টি পানির গাড়ি রয়েছে। সেগুলো দিয়ে প্রতিদিন দুইবার নগরীর প্রধান সড়কে পানি ছিটানো হয়।


বিবার্তা/খলিল/উজ্জ্বল/জাই

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com