এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:৪৪
এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?
কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল, যুদ্ধের শেষ দিকে তা রূপ নেয় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যাকাণ্ডে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে এদেশকে আন্তর্জাতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মেধাশূন্য করতেই পাকিস্তানি বাহিনী এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় হত্যা করে অগ্রগামী শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের।


সেদিন ছিলো ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। বিজয় লাভের ঠিক পূর্ব মুহূর্ত। বিভিন্ন এলাকা থেকে বিজয়ের খবর আসছিলো। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ততোদিনে স্বাধীন হয়ে গেছে। মুক্তি বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী তখন দিশেহারা। তখনই তারা এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালায়। আজ ঠিক ৫০ বছর পরেও জাতি সেই শোক, সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।


সেদিন আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, প্রকৌশলী, ডাক্তার , শিল্পী , সুরকার ও সকল পেশার জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিদের নিজ নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়।


ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. মুনির চৌধুরী, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. আনোয়ার পাশা, ড. আবুল খায়ের, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. সিরাজুল হক খান, হুমায়ূন কবীর, রাশিদুল হাসান, সাজিদুল হাসান, ফজলুর রহমান খান, এন এম মনিরুজ্জামান, শরাফত আলী, এ আর কে খাদেম, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, এম এ সাদেক, এম সাদত আলী, সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, ড. হবিবুর রহমান, ড. শ্রী সুখারঞ্জন সমাদ্দার, অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি, ডা. আব্দুল আলিম চৌধুরী, মনসুর আলী, ডা. মোহাম্মদ শফী , শহীদুল্লাহ কায়সার, সেলিনা পারভীন, সিরাজুদ্দীন হোসেন, গোলাম মুস্তফা, আলতাফ মাহমুদ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, ড. আবুল কালাম আজাদ, নাজমুল হক সরকার, নূতন চন্দ্র সিংহসহ অনেক বুদ্ধিজীবীকে নিজ নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্যই মূলত তাদের হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়া এতো বিশাল সংখ্যক বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি।


মুক্তিযুদ্ধের পরে বিভিন্ন নথিপত্র থেকে জানা যায়, পাকিস্তানি বাহিনী ১০ ডিসেম্বর তাদের এই জঘন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং সেই তালিকা পাঠায় তাদের দোসরদের কাছে। এদেশের রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস এই ঘৃণ্য কাজে সহযোগিতা করেছিলো বলেই এতো অল্প সময়ে বাংলাদেশের এতো বিশাল ক্ষতি করা সম্ভব হয়েছিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষে।


আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা পরবর্তীতে এদেশের মাটিতে রাজনীতি করেছে। মহান জাতীয় সংসদের সদস্য হয়ে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পতাকা তাদের গাড়িতে স্থান পেয়েছিল। কেউ কেউ আবার মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিল। এমন কলঙ্ক বয়ে বেড়াতে হয়েছিলো আমাদের। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সেই কলঙ্ক মুক্ত করেছেন। এদেশের মাটিতে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির বিচার হয়েছে। এখনো চলমান রয়েছে অনেক বিচার।


২০১৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বিবৃতিতে বলেছিলেন- যুদ্ধাপরাধী জামায়াত চক্রের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সকলে ঐক্যবদ্ধ হই, এটাই হোক শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার।


আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমরা স্মরণ করছি সেই কালরাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া মহান বুদ্ধিজীবীদের। বছরে শুধু একটি দিন তাদের স্মরণ করলেই জাতির প্রকৃত উন্নয়ন ঘটবে না। তাদের আদর্শ, তাদের চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করতে হবে আমাদের। তারা কিভাবে বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছিলেন তা জানতে হবে আমাদের। তবেই তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। তারা তাদের উন্নত চিন্তা ও শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশকে যে অসাম্প্রদায়িক ও অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য কাজ করে যেতে হবে আমাদের সবাইকে। এই হোক বুদ্ধিজীবী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার।


লেখক: সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ


বিবার্তা/কেআর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com