পার্বত্য শান্তি চুক্তি: শেখ হাসিনার সময়োচিত পদক্ষেপ
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৩:৫২
পার্বত্য শান্তি চুক্তি: শেখ হাসিনার সময়োচিত পদক্ষেপ
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

দুই যুগ আগের কথা। আধুনিক রাষ্ট্র ধারণার আবির্ভাব এবং কার্যকারিতায় পাহাড় এবং পাহাড়ের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব তখন বহুলাংশে হুমকির মুখে ছিল। যার ফলশ্রুতিতে পাহাড় সবসময় রাষ্ট্রকে এড়িয়ে চলতো এবং রাষ্ট্রের ‘উন্নয়নের লম্বা হাত’ থেকে নিজেকে দূরে আড়াল করে রাখতো।


প্রথমবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা অনুধাবন করেছিলেন, বৈচিত্র্যপূর্ণ বৃহৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে মূল ধারার বাইরে রেখে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়া অসম্ভব। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর, জল-জমি-জঙ্গল কে আঁকড়ে বেঁচে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল কাঠামোতে যুক্ত করার মহৎ উদ্দেশ্যে শান্তির শ্বেত-কপোত আকাশে উন্মুক্ত করে বেশ স্বাড়ম্বরতার ভেতর দিয়ে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান শেখ হাসিনার মহত্তম প্রয়াস এবং যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের প্রতিফলিত রূপ ছিল ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’।


মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিই হচ্ছে শান্তির পক্ষে। সকলের মত পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীও শান্তি চায়। কিন্তু শান্তিপ্রিয় পার্বত্যবাসীর জন্য পার্বত্য সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছিল মূলত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকেই। সে সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান ওই এলাকায় স্থায়ী বসবাসের জন্য অন্যান্য স্থান থেকে মানুষ স্থানান্তর শুরু করেন। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দারা কখনোই গ্রহণ করতে পারেনি। তৎকালীন সরকারি প্রশাসন সমতল জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের নদীভাঙা ভূমিহীন, দিনমজুর, অসহায়, দুস্থ পরিবারগুলোকে এনে সরকারি খাসভূমিতে পুনর্বাসন করে। এই পুনর্বাসনের কয়েক বছর যেতে না যেতেই শান্তিবাহিনী নামক উপজাতীয় গেরিলারা সরকারের ওপর প্রতিশোধ নিতে পুনর্বাসিত বাঙালিদের ওপর হামলা চালায়। বাঙালি হত্যা ও নিপীড়ন মাত্রা অতিক্রম করে বর্বরতার সবশেষ মাত্রাকে। সুরক্ষিত ওই অঞ্চলে ভারতের জঙ্গিরা সহায়তা করত শান্তিবাহিনীকে। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের জড়িত হওয়াটা ছিল ব্যয়বহুল। কিন্তু, শান্তিপ্রতিষ্ঠায় তাদের সঙ্গে আমাদের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধ করতে হয়েছে দৃঢ়চিত্তে। ৬ জন তরুণ অফিসার, ১ মেজর, ৩ ক্যাপ্টেন ও ২ লেফটেন্যান্টসহ ৩১২ জন দেশপ্রেমিক সৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।


১৯৯৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর পার্বত্য জেলায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুটনৈতিক দূরদর্শিতায় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পুনরায় সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। শান্তির এই প্রত্যয়কে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ধারণ করে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান এবং দেশে প্রচলিত বিধিবিধান ও আইন যথাযথ অনুসরণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে কয়েক দফা সংলাপের পর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের উপস্থিতিতে সরকারের পক্ষে চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং জেএসএস-এর পক্ষে সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) চুক্তিতে সই করেন। যার ফলশ্রুতিতে দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ইতি টেনে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে সন্তু লারমার নেতৃত্বে প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর সদস্যরা সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।


এভাবেই অবসান হয় এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের। ইতোমধ্যে "পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি"র ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। আর নয়টি ধারা বাস্তবায়নাধীন আছে। শান্তিচুক্তির আংশিক ও অবাস্তবায়িত ধারাগুলো বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য জেলায় শান্তি আনয়নের পাশাপাশি ওই এলাকায় অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধনের মাধ্যমে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মানোন্নয়নে সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট রয়েছে। " পার্বত্য শান্তি চুক্তির" পূর্বে ভূমিবিষয়ক আইন ও বিধিমালা না থাকলেও এখন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন ২০০১ প্রণয়ন এবং ২০১৬ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য জেলাগুলোতে যেখানে এডিপিভুক্ত প্রকল্প ছিল ১টি, এখন সেখানে ২০টির অধিক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।


শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলের জেলাগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায়ও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। শান্তিচুক্তির পূর্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। শান্তিচুক্তির পর ১৭৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে উপজাতি ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ কোটার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও বিশেষ কোটার ব্যবস্থা রয়েছে পার্বত্য উপজাতিদের জন্য। শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তিন জেলায় এ পর্যন্ত ৫৬০ কি.মি. এর বেশি বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়, এরকম ৪৭ হাজার পরিবারের মধ্য থেকে ৫ হাজার ৫০০টি পরিবারকে সৌর বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে; শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যন্ত ছিল না।


শেখ হাসিনা সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্যবস্থাপনায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাস্তা ও বিভিন্ন আকারের সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করছে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে টেলিযোগাযোগ, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের আওতা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা হয়েছে, যা শান্তিচুক্তির আগে ছিল না বললেই চলে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় চুক্তির আলোকে পার্বত্য জেলায় বেশকিছু এলাকা পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে, যা এখন দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গায় পরিণত হয়েছে। নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য দেশ-বিদেশি হাজার হাজার পর্যটক বান্দরবানের নীলগিরিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের যেসব স্পটে ছুটে যান তার পুরো অবদানটাই শেখ হাসিনা সরকারের। নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ ও রাস্তা নির্মাণ না করা হলে রাত্রিযাপন করে নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করা দূরের কথা, সেখানে কেউ যাওয়ার কল্পনাও করতেন না।


শান্তিচুক্তি’ স্বাক্ষরের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের দ্বার উন্মুক্ত হলে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংগঠন ও দেশী-বিদেশী এনজিও তাদের সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করে। ১৪৫টির বেশি এনজিও পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের যাবতীয় উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত আছে কেবল শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে বলেই।


উল্লেখ্য, শান্তি চুক্তির গুরুত্ব দেখা যায় তুলনামূলক উন্নয়ন চিত্রে। পাহাড়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পের অধিকাংশই স্থানীয় উপজাতিদের কল্যাণে পরিচালিত হচ্ছে। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের উন্নয়নের জন্য বছর বছর মোটা অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে। তবে সরকারের গৃহীত প্রকল্পের শতকরা ৯০ভাগ উপজাতীয়রা এবং ১০ভাগ বাঙালিরা অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ সিংহভাগ ব্যয় হয় উপজাতিদের উন্নয়নের জন্য।


চাকমা উপজাতির জন্য মোট প্রকল্প ১৮৬ টি(৪৫%), অন্যান্য উপজাতিগুলোর জন্য মোট প্রকল্প ১৯৪টি(৪৬%)। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের জন্য মোট প্রকল্প ৩৮০টি(৯১%)। পক্ষান্তরে বাঙালিদের জন্য মোট প্রকল্প ৩৬ টি (৯%)। পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ মোট সদস্য সংখ্যা ৩৪। এর মধ্যে ১২টি অ-উপজাতির জন্য রাখা হয়েছে। চেয়ারম্যান পদটি সবসময়ের জন্য উপজাতি গোত্রের জন্য সংরক্ষিত।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে ১৯৭২ সালের ২২ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রণীত ‘ইন্ডিজেনাস অ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন, ১৯৫৭’ (কনভেনশন নম্বর ১০৭)-এ অনুস্বাক্ষর করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ও সেটেলার বাঙালিদের মধ্যে বিরাজমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক "পার্বত্য শান্তি চুক্তি" স্বাক্ষর এবং বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম : শান্তির অন্বেষায়’ প্রবন্ধে ১৯৯৮ সালে লিখেছেন, ‘পাহাড়ে বসবাসকারী কি পাহাড়ি কি বাঙালি সকলেই দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত। শান্তি স্থায়ী করতে হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হবে।... শিক্ষায় স্বাস্থ্যকর্মে উন্নত সমাজ গড়তে পারলেই স্থায়ী শান্তি স্থাপন হবে।’ (শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১, পৃষ্ঠা: ২৩৯)।


শান্তির প্রত্যয়কে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ধারণ করে শেখ হাসিনার উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামে যে শান্তির বীজ উপ্ত হয়েছিল, দুই যুগ পরে সেই শান্তিবৃক্ষ আজ ফলবান। জনপ্রত্যাশা থেকে ছিটকে পড়া কিছু রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সুশীলরা মেট্রোপলিটন আয়োজনে বসে সরকারের সমালোচনা করাকে ‘নিজেকে আলোচনায় রাখার’ মাধ্যম মনে করে। এসব কর্পোরেট বিলাপ বাদ দিয়ে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে এবং পাহাড়ি-বাঙ্গালি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করা উচিত।


এস. এম. রাকিবুল হাসান
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১নং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ।


বিবার্তা/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com