‘জয়িতা’ পলির জয়যাত্রা
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০১৮, ২২:২৩
‘জয়িতা’ পলির জয়যাত্রা
সোহান সিরাজ
প্রিন্ট অ-অ+

গোলাপি রঙের শাড়ির আঁচলে তার ফুল-পাতার নকশা। চোখে মুখে জীবন জয়ের তৃপ্তিভরা হাসি। তিনি মিস পলি; ২০১৭ সালের ‘জয়িতা’ পুরষ্কারপ্রাপ্ত। হিজড়া তার লৈঙ্গিক পরিচয়।


বুটিকসের কাজ করে এখন সফল ব্যবসায়ী ‘পলি হিজড়া’। এ নামেই তিনি সবার কাছে পরিচিত। রাজশাহী মহানগরের ২নং ওয়ার্ড জুড়ে রয়েছে তার কর্মী। মাত্র ২৫ জন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন তার একশোরও বেশি কর্মী রয়েছে। যারা তৈরি করেন শাড়ি, বেডশিট, সালোয়ার কামিজ ইত্যাদি। বিক্রি হয় দেশের প্রায় সর্বত্র। এবার পলির পরিকল্পনায় রয়েছে নকশি কাঁথা আর পুতি দিয়ে শোপিস বানানো।


হাতের এসব কাজের ওপর নিজে প্রশিক্ষণও দেন। কাজের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে হাতে কলমে শেখান কর্মীদের। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা 'বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি'র মাধ্যমে এলাকায় এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করেন। তার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের আরো অনেকে। এমনকি সামজিক ও পারিবারিকভাবে নিগৃহীত বহু নারী তার হাত ধরেই পেয়েছেন বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন।


সব মিলিয়ে এখন দারুণ ব্যস্ত পলি। দ্রুত বর্ধনশীল এই শিল্প ব্যবসা আর সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে আশাবাদী তিনি। সরকারের দেয়া ‘জয়িতা’ সম্মাননা তার কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন মিস পলি।


তবে জীবনের শুরুটা ছিল অবর্ণনীয় কষ্টের। একেবারে জন্মলগ্ন থেকেই পলিকে টিকে থাকার যুদ্ধ করতে হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ‘বন্ধু’র মিডিয়া ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০১৭ প্রদান অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন পলি। অনুষ্ঠান শেষে কিছুক্ষণ কথা হলো তার সঙ্গে। সে সময় জীবন ও কর্মের কথা জানতে চাইলে শুরু করেন নিজের ভূমিষ্ট হওয়ার ক্ষণটি থেকে। অত্যন্ত দুঃখের হলেও অকপটে বর্ণনা করেন সেই অসহনীয় বেদনার দিনগুলোকে।


তিন ভাইবোনের মধ্যে পলি সবচেয়ে বড়। জন্ম দেয়ার জন্য তার মা নানার বাড়ি যান। জন্মের সময়ই পলির লৈঙ্গিক ত্রুটি বুঝতে পারেন সবাই। এই ত্রুটির কথা জানতে পেরে বাবা শুধু সন্তানই নয়, মাকেও মেনে নিতে অস্বীকার করেন! অগত্যা নানার বাড়িতেই থেকে যান মা ও সন্তান; নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। তবুও লৈঙ্গিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহের কমতি ছিল না এতুটুকুও।


তিন মাস বয়সে নানা দ্বিতীয় বিয়ে করলে সেখানে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে তাদের। জন্মের ১৮ মাস পর সন্তানকে নিয়ে বড় ভাসুরের বাড়িতে যান মা; অনেক কষ্টে পলির চাচাকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এই সন্তান তাদের; এ সন্তান সৃষ্টিকর্তার দান। চাচা ভাতিজিকে মেনে নেন এবং ভাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেন মেনে নিতে। মায়ের অনেক কান্নাকাটি আর অনুনয়ের পর পারিবারিকভাবে এক পর্যায়ে স্ত্রী ও সন্তানকে মেনে নেন তার বাবা, যদিও মন থেকে দুজনকে মেনে নিতে পারেননি আজও। তখন থেকে শুরু হয় বাবার বাড়িতে পলির বেড়ে ওঠা। চাচা-চাচিদের স্নেহ পেলেও বাবার ভালবাসা পাননি কখনও! এমনকি অন্য ভাই বোনেরাও কথা বলতো না তার সাথে।


বাবা উঠতে বসতে অকথ্য আর অবর্ণনীয় নির্যাতন করতেন মা ও তার ওপর। ঠিকমত খাবারও দেয়া হত না পলিকে। ঈদ উপলক্ষে সব ভাই বোনেরা নতুন জামা কাপড় পেলেও পলি ছিল সেসব থেকে বঞ্চিত! কিন্তু মা সন্তানকে বঞ্চিত করেননি কখনও। কাঁথা সেলাই করে টাকা জমিয়ে পলিকে নতুন জামা কিনে দিতেন মা।


স্কুলে ভর্তি হতেও করতে হয়েছে সংগ্রাম। মা ছাড়া কেউ রাজি ছিল না লেখাপড়া করাতে। কিন্তু পড়ার প্রতি পলির ঝোঁক ছিল প্রবল। তাই সবার আপত্তির মুখেই মা অনেক কান্নাকাটি করে অনেক কষ্টে তার বাবাকে বোঝান; জমানো টাকা দিয়ে পলিকে শেষ পর্যন্ত স্কুলে ভর্তি করাতে সক্ষম হন।


ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলে পলির মধ্যে মেয়েলি ভাব বুঝতে পারে সহপাঠী ও শিক্ষকেরা। শুরু হয় আরেক নির্যাতন! ক্লাসে তো বটেই; মাঠেও ছিল নিগৃহীত পলি। খেলতে দেয়া হতো না তাকে। এক সময় ওই স্কুল থেকে বের করে দেয়া হলো তাকে। এক বছর পর পাশের একটি গ্রামে এক শিক্ষকের সন্ধান পান মা; প্রকাশ না করলেও যিনি তৃতীয় লিঙ্গের বলে মনে করতো সবাই। তারই সহযোগিতায় সেই স্কুলে পলি আবার ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়। আগের মতই সহপাঠী আর শিক্ষকদের নির্যাতন থাকলেও সহযোগী ওই শিক্ষকের অনুপ্রেরণা আর মায়ের ইচ্ছায় সবকিছু উপেক্ষা করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন পলি। দৈনিক জমানো মুষ্টি চাল আর হাতের কাজ থেকে রোজগার করা টাকা দিয়ে পলির লেখাপড়ার খরচ চালাতেন মা।


দশম শ্রেণীতে ফরম পূরণের কিছু টাকা মা জোগাড় করেছিলেন মুরগি বিক্রি করে। আর বাকি টাকা দিয়েছিলেন খালা। এসএসসি পরীক্ষার আগে মা বলেছিলেন, ‘পাশ না করলে তোর বাবার অনেক কথা শুনতে হবে! পারলে বিষ খেয়ে স্কুলেই মরে থাকিস!’ কিন্তু মেধাবী পলি শুধু পাশই করেননি, পরীক্ষায় ভালো ফলও করেছিলেন। এতে বাবা-চাচারাসহ অবাক হয়েছিলেন শিক্ষকেরাও।


বাড়িতে বোনের বিয়ের প্রস্তাব এলে পলির জন্য তা ভেঙে যেত। বাবা তাই এক সময় বাড়ি থেকে বের করে দেয় পলিকে। তখন পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেয় সে। কিন্তু ওই বাড়ির এক ছেলের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হলে ১৪ দিনের মাথায় সেখান থেকে সরে যান পলি। এবার আশ্রয় নেন শিরোইল স্টেশনে; সেখানে রাতে এক হিজড়া এসে তাকে সর্দারনি মায়া খানের কাছে নিয়ে যান। মায়া তার সব কষ্টের কথা শোনেন ও নিজ ডেরায় আশ্রয় দেন। পলি শর্ত দেয়, সেখানে থাকতে সে রাজি আছে কিন্তু কোনো ধরনের যৌন পেশায় লিপ্ত হবে না সে। শর্ত মেনে নিয়ে মায়া তাকে নিজের কাছে রাখেন এবং হাতের ও সেলাইয়ের কাজ শেখান।


সেখানে থেকেই ২০০৯ সালের দিকে ‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জীবন মানোন্নয়ন ও স্বাবলম্বী করে তুলতে বিভিন্ন কাজ করে এই সংগঠন। এক সময় বিভিন্ন এনজিও ও সংস্থা থেকে সহযোগিতাও পান পলি। এর পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজও চালিয়ে যান। একইসঙ্গে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনাও। ২০১২ সালে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করেন।


২০১৫ সালে তার পাশে দাঁড়ায় ‘বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’। সংস্থাটি তাকে প্রশিক্ষণ আর আর্থিক সহায়তা দেয় যা তাকে নতুন জীবনের সন্ধান দেয়। চলতে থাকে ‘বন্ধু’র কাছে হাতে কলমে ব্যবসায়িক পরিকল্পনার উপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ। এতে সে ব্যবসার বিভিন্ন ধাপসহ নানা বিষয় সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান লাভ করে। এই প্রশিক্ষণ জীবনে নব উদ্যোমে নিজেকে তৈরি করেন পলি।


প্রশিক্ষণ শেষে সরকারের তরফ থেকে কোনো ঋণ সুবিধা না পেলেও জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক (ডিডি) মো. মোজাম্মেল হক তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। হাতে তুলে দিয়েছিলেন সেলাই মেশিন ও ৮ হাজার টাকা। এর সাথে নিজের কিছু পুঁজি যোগ করে মোট ২০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন পলি। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে পলি’র কাজের দক্ষতা, বাড়তে থাকে কাজের পরিসর ও মাত্রা। এভাবেই সফলতার দিকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছেন মিস পলি। যার পুঁজির পরিমাণ এখন তিন লাখেরও বেশি।



শুরুতে ভাড়া বাড়িতে নিজের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন পলি। যদিও সহজে তাকে কেউ ভাড়া দিতে চাইতো না। পলি বলেন, যারা ভাড়া দিতো তারাও নানাভাবে অত্যাচার করতো। কিন্তু কখনই এলাকা ছেড়ে যেতেন না। সব সময়ই মায়ের আশেপাশে থাকতে চাইতেন। পলি বলেন, আমার বেঁচে থাকাই মায়ের জন্য; মা-ই স্বপ্ন।


২০১৫ সালে বাবা তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু বাবা তাকে মেনে নিলেও মনে নিতে পারেননি আজও। তবুও বাবা মায়ের সাথে থাকতে পেরে রাজ্যের স্বস্থি পলির। বলেন, ‘হিজড়াদের জন্য জীবনকে আমি উৎসর্গ করেছি। তাদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে যাব আজীবন। সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নিজেদের অধিকার আর সম্মান প্রতিষ্ঠায় তাদের তৈরি করে দিয়ে যেতে চাই আমি।


সারা জীবনের সংগ্রামে সফল যে পলি, সে রাজনীতির প্রতিও আগ্রহ করেন। জানান, সুযোগ হলে সময় বুঝে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চান। তবে কোনো দলের হয়ে নয়; আপাতত স্বতন্ত্র থাকার ইচ্ছা তার।


‘জয়িতা’র মত সমাজ বা অন্য কারও কোনো স্বীকৃতি নয়, বাবা মায়ের সেবা করার পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গ এবং নির্যাতিত নারীদের উন্নয়নের জন্যই কাজ করে যাচ্ছেন পলি। বলেন, তার সকল কার্যক্রমকে বিবেচনা করে সরকার তাকে ‘জয়িতা’ সম্মাননা প্রদান করেছে। এই স্বীকৃতি তৃতীয় লিঙ্গের সকল মানুষকে বেঁচে থাকার এবং জীবন জয়ের প্রেরণা জোগাবে।


বিবার্তা/কামরুল/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com