জনফারুকের স্বপ্ন পূরণের গল্প
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৮, ১৪:১৯
জনফারুকের স্বপ্ন পূরণের গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জনফারুকের স্বপ্ন ছিল দেশের অনেক মানুষকে নিয়ে এক সাথে কাজ করার। সেটা যেকোনো ব্যবসার মাধ্যমে। তবে এমন ব্যবসা, যেন সেটার মাধ্যমে মানুষ কোনো সেবা পেতে পারে, একইসাথে সাধারণ মানুষ আত্মসচেতন হয়, নিজেকে কোনো কিছুর জন্য তৈরি করতে পারে। মানুষের জীবনের প্রয়োজনে ও কল্যাণে হবে সে কাজটি, তৈরি হবে জ্ঞানভিত্তিক একটা সচেতন পৃথিবী। যে ‍পৃথিবীর প্রত্যেক নাগরিক হবে আত্মপ্রত্যয়ী।


আজ তাঁর সে স্বপ্ল পূরণ হয়েছে। বিবার্তার পাঠকদের সে গল্প জানাচ্ছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরে বেড়ে ওঠা জনফারুকের বাবা একজন ব্যবসায়ী। মা গৃহিনী। বড় ভাই পিএইচডি ডিগ্রিধারী এবং বর্তমানে একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। ছোট ভাই একটা প্রাইভেট কম্পানিতে চাকরি করছেন।


ফারুক পড়াশোনা করেছেন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। রাজশাহী পলিটেকনিক থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ব্যবসা করার সময় ভাললাগার কারণেই টেকনোলজি বেইজড পড়াশোনার তাগিদ অনুভব করেন। আবার পড়েন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।


১৯৯৯ সালের দিকে প্রতিষ্ঠা করা হয় ফারুক ইলেকট্রনিক্স। ইলেকট্রনিক্স ব্যবসার পাশাপাশি গাড়ির ব্যবসা ছিল। অনেকগুলো গাড়ি ভাড়ায় খাটানো হতো। সেগুলোর মেইন্টেনেন্সের কাজও দেখাশুনা করতেন ফারুক। ইলেকট্রনিক্স ব্যবসা দেখাশোনার সময় তাঁর মাথায় চাপে নতুন নতুন টেকনোলজি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা।



২০০০ সালে ফারুক দেখলেন টেকনোলজি আরও ফাস্ট হচ্ছে। দিনদিন এই দুনিয়াটা বড় হচ্ছে। সেই সময় বড় ভাই বহির্বিশ্বের নামিদামি কিছু ইউনিভার্সিটির সাথে যোগাযোগ করতেন তাঁর উচ্চতর পড়াশুনার জন্য। এই সুবাদে ইউনিভার্সিটিগুলো অনেক ম্যাগাজিন আসতো যা ছিল কিছুটা টেকনোলজিবেইজড। সেগুলো থেকে বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নিতেন ফারুক।


একদিন হঠাৎ মাথায় আসে চাঁপাই নবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও নওগাঁতে কয়েকটা কম্পিউটারের দোকান দিলে কেমন হয়? দেরি না করে অল্পদিনের মধ্যেই সব ব্যবস্থা করে প্রথমে ঢাকা থেকে কম্পিউটারের এক্সেসরিজ আনেন। ওই সময়ে হার্ডওয়্যার সেক্টরে যেসব বড় বড় কম্পানি ছিল যেমন, ফ্লোরা টেলিকম, স্মার্টটেকনোলজি, কম্পিউটার সোর্স, এক্সসেল টেকনোলজিস এগুলোর ডিলার হয়ে যান। এসব কম্পানি থেকে কম্পিউটারের কাঁচামাল নিয়ে সেটআপ করে বিক্রি করতে শুরু করেন।


ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসা বড় হতে থাকে। সব কিছু হয়ে উঠে ডিজিটালাইজড। একটা শো-রুম থেকে বেড়ে তিনটা হয়ে যায়। তখন ফারুক চিন্তা করেন এখন ব্যবসাকে ঢাকায় নেয়া যায় কীভাবে। যখন ব্যবসাটা বেশ জমে উঠছিল তখন চায়না থেকে কিছু আমদানি করা শুরু করেন। এভাবেই তথ্যপ্রযুক্তিপণ্য ব্যবসায় পথ চলা শুরু ফারুকের।


আইটি ব্যবসার প্রতি আগ্রহ দেখে ২০০৬ সালে একদিন ভারতের হায়দারবাদের এক বন্ধু তাঁকে কল সেন্টার অ্যান্ড বিপিও সম্পর্কিত ব্যবসা করার পরামর্শ দেন। তখন তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস-এ ‘নায়াগ্রা সিস্টেমস লিমিটেড’ নামে একটা ফার্ম শুরু করেন।



তখন বিটিআরসির কার্যালয় ছিলো মহাখালী ফ্লাইওভারের পাশে সেতুভবনে। সেখান থেকে কল সেন্টার ব্যবসার লাইসেন্স নেন। আর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁকে সহযোগিতা করেন ইন্ডিয়া ও ফিলিপাইন থেকে আসা দুই বন্ধু। তাঁরা তিন বছর এখানে সার্ভিস দেন। ওই সময়ে তাঁদের একজনকে বেতন দিতেন ১২০০ ও অন্যজনকে ১০০০ ডলার।


২০০৭ সালের দিকে রাশিয়া, আমেরিকা ও ইন্ডিয়া থেকে সফটওয়্যার আমদানি করা শুরু করেন। দেশের নামিদামি সব কল সেন্টারগুলোতে কল সেন্টার সল্যুশন এনে দেন ফারুক। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে নামিদামি কলসেন্টারগুলো। এসব কল সেন্টারে পুরো সল্যুশন, সার্ভিস সাপোর্ট দেয়ার জন্য দক্ষ জনবল তৈরিতে এবং কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সহায়তা করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রথম সারির কল সেন্টারগুলোর কনসালটেন্সির কাজও করেছেন এই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।


এখন তিনি রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ ‘ডিজিটাল হাব বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামক একটি আইটি ফার্মে চিফ অপারেশন অফিসার পদে চাকরি করছেন। পাশাপাশি তাঁর নিজের কিছু ব্যবসা যেমন কল সেন্টার, ডাটা ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, ট্রাভেল এজেন্সি দেখাশুনা করছেন। একইসাথে কল সেন্টার অ্যান্ড বিপিও সেক্টরের প্রফেশনাল কাস্টমার সার্ভিসেসের (পিসিএস) ট্রেনিং পরিচালনা করছেন। এ কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁকে সহযোগিতা করছেন এক ঝাঁক প্রফেশনাল কল সেন্টার বিশেষজ্ঞ।


এ প্রসঙ্গে ফারুক বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্কিল ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি) প্রকল্পের অধীনে এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোরসিং (বাক্য) এ কোর্সটা বাস্তবায়ন করছে। আমরা বাক্যর পক্ষে এ কাজ করছি। এ কোর্সটা করার জন্য প্রার্থীকে কোনো টাকা দিতে হয় না।


এই ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করতে যোগ্যতা হিসেব শুধু গ্রাজুয়েশন বা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস হতে হবে। প্রফেশনাল কাস্টমার সার্ভিস (পিসিএস) এই কোর্সটি পুরোটাই হচ্ছে কল সেন্টার বেইজড একটা ট্রেনিং কিন্তু এই ট্রেনিংটা যে শুধু কল সেন্টারের জন্য তা না। পাশাপাশি কাস্টমার অরিয়েন্টেড যেসব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা যেন সেগুলোতে দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারে সেভাবেই তাদের প্রস্তুত করা হচ্ছে।



ট্রেনিংটা করতে পারলে যে কেউ ব্যাংক ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে পারবে, রেস্টুরেন্টগুলোতে কাজ করতে পারবে, টুরিজম মোটেলে কাজ করতে পারবে, এয়ারলাইন্সে কাজ করতে পারবে, ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতে পারবে, মেডিকেলে কাজ করতে পারবে, টেলিকমিউনিকেশন অথবা যে কম্পানির কাজটা সরাসরি অথবা ফোনের মাধ্যমে কাস্টমারের সাথে যুক্ত সেখানে কাজ করতে পারবে। একটা ব্যাংকের কর্মকর্তাকে কাস্টমারের সাথে কীভাবে সুন্দরভাবে গুছিয়ে কথা বলতে হয়, সুন্দর আচরণ করতে হয়, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামলে কীভাবে মার্জিতভাবে বিষয়টা সমাধান করতে হয়, মাথা ঠান্ডা রেখে কীভাবে কাস্টমারের সব প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে হয় এসব খুঁটিনাটি ও কারিগরি বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখানো হয়।


এতে অংশগ্রহণ করলে প্রার্থীকে কোর্স শেষে প্রার্থীর আসা-যাওয়া খরচ হিসেব ৫ হাজার টাকা দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে উত্তীর্ণ প্রশিক্ষণার্থীদের মূল্যায়নসাপেক্ষে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয় এবং ট্রেনিং শেষে কল সেন্টারে চাকরি প্রাপ্তির বিষয়ে সর্বাত্মক সহায়তা করা হয়। উপজাতি, প্রতিবন্ধী ও নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। আগ্রহীকে বায়োডাটা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষাগত সার্টিফিকেটের ফটোকপিসহ যোগাযোগ করতে হয়।


এর পাশাপাশি টেকনোলজি বেইজড ও ক্যারিয়ার ডেভলপমেন্ট নিয়ে কাজ করা হচ্ছে এই ডিজিটাল হাবে। গ্রাজুয়েশন বা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে একজন তরুণ-তরুণী চাকরির জন্য ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। চাকরি মেলে না। তারা একাডেমিক্যাল পার্ট ভা্লোভাবে শেষ করেছে, কিন্তু ক্যারিয়ারের বিষয়ে অভিজ্ঞতা শূণ্য। কারণ তারা জানেন না কোথায়, কোন কম্পানিতে, কীভাবে চাকরি করবে, কীভাবে চাকরির আবেদন করবে, কীভাবে সিভি লিখবে, ইন্টারভিউতে কী আচরণ করবে, কীভাবে কথা বলবে। এসব বিয়ষ এখানে বিভিন্ন ক্লাসের মাধ্যমে শেখানো হয়।


ফারুক বলেন, আন্তর্জাতিক ফাস্ট ওয়ার্ল্ডডেট কান্ট্রির দিকে যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাবে স্কিলড পার্সনের সংখ্যাই বেশি। আমাদের দেশেও ১৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি ইয়্যুথ রয়েছে যাদের বয়স ২৫-৪০ বছর। এদেরকে আন্তর্জাতিক বাজারে ডে লেবার বলা হয়। শুধু একটি কারণ তারা স্কিল্ড না বা তারা কোনো দিনও কোনো একটা সাবজেক্ট যার উপর সে দক্ষ, এর উপর এসেসমেন্ট করেনি যে আর নাই বা আছে তার কোনো দক্ষতার সনদ। আমাদের দেশে নলেজ এবং এডুকেশনাল সার্টিফিকেট আছে কিন্তু কেউ এগুলোকে যথার্থভাবে অ্যাসেসমেন্ট করেনি। আমরা এ কাজটাই করছি। গ্রাজুয়েশন বা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা তরুণ-তরুণীদের চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি বিষয়গুলো হাতে-কলমে শিক্ষা দিচ্ছি।



আউটসোর্সিংয়ে জন্য আন্তর্জাতিক বাজার অনেক বড়। চাইলে যেকেউ বাসায় বসে কাজ করতে পারেন। কিন্তু কিভাবে, কী কী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজটা আনা যাবে সেটা তারা জানেন না। এর জন্য আমরা আছি আপনাদের সাপোর্ট দেয়ার জন্য। আসেন, কথা বলেন। আমরা আপনাদের দেখিয়ে দেবো, কী করে ঘরে বসে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাজ করে টাকা আয় করা সম্ভব।


ডিজিটাল হাবকে নিয়ে পরিকল্পনা অনেক। ফারুক বলেন, আমাদের কল সেন্টারের সেটআপের কাজ চলছে। তিনতলায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আমাদের পরিকল্পনা, ২০২১ সাল নাগাদ তিন শিফটে ৩০০ তরুণ-তরুণী একসঙ্গে কাজ করবে। ২০১৯ সালে ৭০০ জনকে প্রফেশনাল ট্রেনিং দেয়ার টার্গেট নিয়ে কাজ করছি।


জীবনের অর্জন বিষয়ে ফারুক বলেন, আমি আল্লাহর কাছে যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। চেয়েছিলাম আমি যাতে অনেক মানুষের সাথে কাজ করতে পারি। আজ তা করছি। ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৮,০০০ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আলহামদুল্লিলাহ, সবাই এখন ভালো ভালো জায়গায় চাকরি করছেন। আমার মাধ্যমে অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছে - এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন। এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে আমার আব্বা-আম্মার। আজ এই অবস্থানে এসেছি শুধু তাদের দোয়া ও সহযোগিতায়। ইন্ডাস্ট্রিতে বেড়ে উঠতে আমাকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন আমার প্রিয় ভাই ফিফো টেকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর তৌহিদ হোসেন এবং কয়েকজন বিদেশি বন্ধু।


বর্তমানে ফারুকের নিজের প্রতিষ্ঠানে অনেক ফরেন ক্লায়েন্ট রয়েছেন। তাঁরা ইউএসএ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও সুইডেনের। এসব ক্লায়েন্ট তিনি ও তাঁর ফুল টিম বাংলাদেশ থেকে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছেন।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com