‘দ্য টু আওয়ার জব’কে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান সানজিদা খন্দকার
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ১৭:১৮
‘দ্য টু আওয়ার জব’কে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান সানজিদা খন্দকার
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

একজন নারী যখন পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে অফিস-আদালতে কাজ করেন তখন তিনি অনেক সম্মান পান। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিয়ের পর অনেক নারীর পক্ষেই চাকরি করা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। কেননা স্বামী, সন্তান, সংসার সামলানোর পর তাঁর হাতে আর সময় থাকে না। ফলে যোগ্যতা আর দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শুধু সংসার নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়।


এমনটা কেন হবে? একজন নারী তাঁর সময়, সুযোগ-সুবিধামতো সংসারের পাশাপাশি চাকরি করবে, ক্যারিয়ার গড়বে, নিজ যোগ্যতায় আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। সংসার জীবনে অন্যের উপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করবে। সংসার নামক রাষ্ট্রে নারী নিজে তৈরি করে নেবে আপন পরিচয়, আপন ভুবন। জীবন হবে স্বতন্ত্র, আপন আলোয় উদ্ভাসিত।


সম্প্রতি এক আড্ডায় এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন উদ্যমী নারী উদ্যোক্তা সানজিদা খন্দকার। কথায় কথায় তিনি জানালেন, বাবা আর্মি অফিসার ছিলেন। এখন অবসরে আছেন। মা গৃহিনী। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট তিনি।



ছোটবেলায় নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নিয়ে পড়ালেখা করেননি। একদিন যে উদ্যোক্তা হবেন তাও ভাবেননি। এ বিষয়ে সানজিদা খন্দকারের সরল ভাষ্য, মা আমাদের নাচ, গান, অভিনয় ইত্যাদি সবকিছু শিখিয়েছেন। সব শিখেই আমরা বড় হয়েছি। আর আমার বাবা সবসময় বলতেন ‘যদি তুমি জীবনে ডাকাত হও, তাহলে চেষ্টা করবে যেন সবচেয়ে বড় ডাকাত হতে পারো।’ বাবার এই কথা মাথায় রেখেই বড় হয়েছি। আমার বাবা আর্মি অফিসার হওয়ায় তাঁকে দেশের নানা জেলায় করতে হয়েছে। সেই সুবাদে আমার স্কুলজীবন রাজশাহীতে, কলেজজীবন চট্টগ্রামে এবং বিশ্ববিদ্যালয়জীবন কেটেছে খুলনায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স করেছি।


‘দ্য টু আওয়ার জব’ উদ্যোগ সম্পর্কে সানজিদা জানান, বিয়ের পরও আমি ট্রান্সকম কম্পানির একটি শাখার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতাম। সেখানে অফিস ছিল সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। প্রথম সন্তান জন্মের পর দেখলাম সন্তানকে সময় দেয়ার পর আট ঘণ্টা কর্পোরেট জব করা আমার পক্ষে অসম্ভব। অফিসে থাকাকালীন আমার সন্তানকে দেখার কেউ ছিল না। তখন ভাবতাম ২ বা ৩ ঘণ্টার জন্য কিছু যদি করতে পারতাম, তাহলে সংসারের পাশাপাশি ক্যারিয়ারটাও চালিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম।


সানজিদা বলেন, এই সমস্যার সমাধান তখন খুঁজে পাইনি। তবে বাধ্য হই জব ছাড়তে। আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর ক্যারিয়ার ব্রেকে ছিলাম। তখন আমাকে সারাদিন সন্তান ও সংসার নিয়ে বিজি থাকতে হতো। মনে হতো, আমার বুঝি আর ক্যারিয়ার গড়া হবে না । বিষয়টি নিয়ে আমি খুব হতাশায় ভুগতাম। আমার ফ্রেন্ড অ্যান্ড ফ্যামিলির অনেকেই একই বাধার সম্মুখীন হন।



সানজিদা বলেন, তবে একজন নারীর জন্য সন্তান ও পরিবার গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবনে সবচেয়ে আনন্দের সময় হল সে যখন মা হয়। সন্তান জন্ম দিয়ে একজন নারী তাঁর জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পায়। সে সন্তান কেন তাঁর জীবনে হতাশার বা ক্যারিয়ার শেষ হবার কারণ হবে? আমি এ নিয়ে খুব ভাবতে থাকি। এক সময় একটা ইনোভেটিভ আইডিয়া পেয়ে যাই। আর কোনো নারীর সংসার-সন্তান যেন তাঁর ক্যারিয়ার গড়ার পথে যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, এ সমস্যা সমাধান করতেই অনলাইন প্লাটফর্ম ‘টু আওয়ার জব’ করার পরিকল্পনা করি। চিন্তা করলাম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে নারীদের এ সমস্যার সমাধান করতে পারি। কোনো নারী যেন ফ্যামিলি ব্যালেন্স করতে গিয়ে ক্যারিয়ার থেকে ছিটকে না পড়ে। এই জন্যই আমরা এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে তাঁর ঘরে কাজ এনে দিচ্ছি, যেন তিনি ঘরে বসে চালিয়ে যেতে পারেন তাঁর কাজ। এই থেকেই শুরু আমার প্রতিষ্ঠানের পথ চলা।


‘দ্য টু আওয়ার জব’-এর ওয়েবসাইটে পেশাদার লেখা, ব্যবসায় সহায়তা, প্রোগ্রামিং, প্রযুক্তি, গ্রাফিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, অডিও সাপোর্ট, মার্কেট রিসার্চ, জীবনধারা, বিনোদন, গবেষণা, বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন ধরনের সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। সানজিদা বলেন, আমাদের প্রধান কাজ হলো টেকনোলজি এবং ডিজিটাল প্লাটফর্ম দ্বারা এমপ্লয়ার ও ওয়ার্কারদের কানেক্ট করা, যেনো মেয়েটা অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রজেক্ট বেসিসে বিভিন্ন কাজ করতে পারে। সেটা জাতীয় পর্যায়ে হোক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা প্রাইভেট বা মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানেরই হোক। এসব মেয়ের নিরাপত্তা এবং স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।


প্রতিষ্ঠানটিতে ইতোমধ্যেই ৭০ জন বায়ার রয়েছেন এবং প্রায় ৫০০ জন নারী রেজিস্ট্রেশন করেছেন। প্রাথমিকভাবে ঢাকার মধ্যে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে ঢাকার বাইরে ভালভাবে মার্কেটিং করা হবে, যাতে সারাদেশের নারীরা এ ব্যাপারে জানতে পারেন।


এ প্লাটফর্মে কাজ করার জন্য নারীকে যে টেকনোলজি এক্সপার্ট হতে হবে এমনটা না। এটা সবশ্রেণির নারীর কাজের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। সানজিদা বলেন, একজন নারী যদি ফেসবুকে সাইন ইন করতে পারেন তাহলেই তিনি এখানে কাজ করতে পারবেন। এটা খুব সহজ করে তৈরি করা হয়েছে। কারণ, আমরা চিন্তা করে দেখেছি যারা এখানে কাজ করবেন তাঁরা কখনো ফ্রিল্যান্সিং করেননি। একজন ডাক্তার হয়তো ফ্রিল্যান্সার হবেন না। তিনি হয়ত অন-লাইন কনসালটেন্ট হবেন। তাই খুব সহজ করে স্টেপ বাই স্টেপ সাজিয়ে এটা তৈরি করা হয়েছে। এখানে শুধু নাম, মোবাইল নাম্বার এবং বাসার কিছু তথ্য দিয়েই তিনি সাইন ইন করতে পারবেন। এরপর তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য তথ্য দিয়ে একটি ফরম পূরণ করবেন। এদের মাঝ থেকেই আমরা বেছে নেবো কাদের দিয়ে আমরা কাজ করাব।



নারীদের কাজ করতে যেন কোনো সমস্যা না হয় এজন্য রয়েছে একটি দক্ষ টিম। এদের কাজ হলো সব সময় ফোনে অ্যাকটিভ থাকা, যাতে যে কোনো সমস্যার সমাধান ফোন করার সাথে সাথে দেয়া সম্ভব হয়। অনেক সময় মেয়েরা বাচ্চার কারণে বাইরে বের হতে পারে না। তখন প্রয়োজনে তাদের বাসায় গিয়ে তাদের সমস্যার সমাধান করাই তাদের কাজ।


সানজিদা বলেন, আমাদের এ উদ্যোগ এমনভাবে যে ভাইরাল হবে তা আমরা আশা করিনি। ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমে শুধু জানাতে চেয়েছি যে আমরা এটি চালু করবো। সেখানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ রেসপন্স করেছেন এবং শেয়ার করে চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেখান থেকেই বিষয়টি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ভাইয়ের চোখে পড়ে। এরপরে তিনি আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। বিবার্তার মাধ্যমে পলক ভাইকে জানাই অফুরান কৃতজ্ঞতা। আরও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই আমার প্রিয়জনদেরকে, যাদের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া এ উদ্যোগ হয়তো বাস্তবায়িত হতো না। তাঁরা হলেন আমার বাবা-মা এবং নিজের পরিবার। তাঁরা যতটা না আমার জন্য ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত ও হাজারো নারীর জন্য।


উদ্যোগ শুরুর সময়ের কথা বলতে গিয়ে অদম্য এ উদ্যোক্তা জানান, একটা বিষয় যখন আইডিয়া হিসেবে থাকে, তখন তার বাস্তবায়নে কেউ তেমন সহযোগিতা করে না। শুরুর দিকে কিছু ব্যাপারে আমার সমস্যা হয়েছে। তবে নিজের চেষ্টায় দুই বছরে এটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। যেহেতু পরিবার মেইন্টেন করে কাজ করতে হয়, তাই স্বাভাবিকভাবে একটু কঠিন তো হবেই। একজন ছেলে উদ্যোক্তা সবটুকু সময় তাঁর কাজে দিতে পাস্ট, কিন্তু একজন মেয়ে তা পারেন না।


সরকারের কাছ থেকে একটা বড় সাপোর্ট পাচ্ছে এই উদ্যোগ। ইতোমধ্যেই লেবারেল আইসিটি ডেভলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানটির সাথে একটি এমওইউ সাইন করেছে। আইটি সেক্টরের এলআইসি এবং প্রতিষ্ঠানটি একসাথে কাজ করছে। এখান থেকে কিছু প্রশিক্ষিত ব্যক্তি পাচ্ছে ‘দ্য টু আওয়ার জব’ যারা এই প্লাটফর্মে এক সাথে কাজ করবে। এদেরকে প্রতিষ্ঠানটি ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করবে।


সানজিদার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনেক বড়। তিনি বলেন, আমরা মেয়েদের যে সমস্যা নিয়ে কাজ করছি এটা শুধু বাংলাদেশের মেয়েদের না বরং গোটা বিশ্বের মেয়েদের সমস্যা। যদিও বাংলাদেশে এটা ব্যাপক আকারের। আমরা চাই একজন নারী ভালো মা হবেন এবং কোনো হতাশা ছাড়াই তাঁর ক্যারিয়ার গড়ে তুলবেন। আমাদের এই প্রচেষ্টাকে আমরা গ্লোবাল পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। এব্যাপারে আমরা এশিয়ার কিছু দেশ নিয়ে কাজ শুরু করতে চাই। এটির বয়স মাত্র এক মাস। এই এক মাসে বায়ার পেয়েছি ৭০ জন এবং সেলার পেয়েছি ৫০০ জন। ভবিষ্যতে এটি আরো অনেক বড় হবে। লাখো নারী কাজ করবেন এই প্রতিষ্ঠানে।


বিবার্তা/উজ্জল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com