আমন বীজ রোপণের ভরা মৌসুমে কুষ্টিয়ায় তীব্র সার সংকট
বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ২১:৩৯
আমন বীজ রোপণের ভরা মৌসুমে কুষ্টিয়ায় তীব্র সার সংকট
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

কুষ্টিয়ায় আমন ধান বীজ রোপণের ভরা মৌসুমে তীব্র সার সংকট দেখা দিয়েছে। বীজ রোপণের সময় কৃষকরা সার না পেয়ে সারের এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরতে হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দামে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি (পটাশ) সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে। নিরুপায় হয়ে চাষীরা অতিরিক্ত মূল্য দিয়েসার কিনে ধান বীজ রোপণ করায় তাদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।


কৃষকদের অভিযোগ, প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের দুর্বল নজরদারির সুযোগে একশ্রেণির ডিলার ও ব্যবসায়ী সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন। দিনের বেলায় সার নেই বলে কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হলেও রাতের আঁধারে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের সার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।


কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম ২৭ টাকা হলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে। একইভাবে টিএসপি ২৭ টাকার পরিবর্তে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, ডিএপি ২১ টাকার পরিবর্তে প্রায় ৪০ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকার পরিবর্তে ৩০ থেকে ৩২ টাকা কেজি দরেবিক্রি হচ্ছে ভূক্তভোগি কৃষকদের অভিযোগ।


সীমান্তবর্তী কৃষি প্রধান দৌলতপুর উপজেলার সাদিপুর এলাকার কৃষক আবুল কালাম আজাদ জানান, ঠিকমতো সার পাচ্ছি না। দোকানে গেলে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কয়েকবার ঘুরার পরসার পেলেও পরিমাণ দেওয়া হচ্ছে কম, আবার দাম চাওয়া হচ্ছে বেশি। অনেক সময় সার দেওয়ার ভয়ে দোকান বন্ধ করে চলে যায় সার ব্যবসায়ীরা। পরে রাতের আঁধারে তা বিক্রি করা হয়।


একই এলাকার কৃষক তৌফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, জমিতে সার দেওয়ার পরও আগের মতো কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে না। তারদাবি, ১০ কেজি সারের জায়গায় ২০ কেজি দিলেও কাজ হচ্ছে না।


আবার সারও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। ইউরিয়া ২৭ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকার পরিবর্তে ৩০ থেকে ৩২ টাকা অতিরিক্তদামে কিনতে হচ্ছে।


কৃষক আব্দুল গনি ও হেলাল জানান, সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরির পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সেচ দিতে বাড়তি খরচ হচ্ছে।অনেক সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বৈদুতিক মোটর ও মেশিন দুই দিকেই খরচ দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার আমন চাষের ব্যয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুন হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ দামে সার কিনতে হলে আমন চাষে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।


কৃষকদের আরও অভিযোগ, প্রতি বিঘা জমিতে আমনের চারা রোপণে শ্রমিকদের মজুরি দিতে হচ্ছে প্রায় ৩২০০ থেকে ৩৫০০ টাকা। এর সঙ্গে সার ও সেচের বাড়তি খরচ যোগ হওয়ায় উৎপাদনব্যয় বেড়ে হচ্ছে দ্বিগুন বা তারও বেশী।


তবে খুচরা সার বিক্রেতাদের দাবি, ডিলাররাই তাদের কাছে বেশি দামে সার সরবরাহ করছেন। তাদের ভাষ্য, পেঁয়াজ ওঠার পর থেকেই ডিলাররা সার সংকট দেখিয়ে প্রতি বস্তায় সরকারি মূল্যের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। বিভিন্ন স্থান থেকে বাড়তি দামে সার সংগ্রহ করতে হওয়ায় তারাও বেশি দামে বিক্রিকরতে বাধ্য হচ্ছেন।


অন্যদিকে, বাড়তি দামে সার বিক্রি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সারের ডিলাররা। তাদের দাবি, তারা অতি সীমিত লাভে সার বিক্রি করছেন। ডিলারদের ভাষ্যমতে, প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের সরকারি মূল্য ১২৫০ টাকা, টিএসপি ১২৫০ টাকা, ডিএপি ৯৫০ টাকা এবং এমওপি ৯০০ টাকা। এর সঙ্গে প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা পরিবহন খরচ দেওয়া হয়। এছাড়া খুচরা বিক্রেতারা অনেক সময় কৃষকদের বাঁকিতে সার দেন এবং ৬ মাস থেকে এক বছর পর টাকা আদায় করেন। এ কারণে তাদের কিছুটা বেশি দামে সার বিক্রি করতে হয় বলে দাবি করেছেন ডিলাররা।


দৌলতপুর উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উপজেলার চাহিদার তুলনায় অনেক সময় কম পরিমাণ সার বরাদ্দ আসে। ফলে ডিলারদের বাইরে থেকে সার সংগ্রহ করতে হয় এবং এতে বাড়তি খরচের কারণে কোথাও কোথাও দাম বেড়ে যেতে পারে।


কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে দৌলতপুরউপজেলায় আবাদ হচ্ছে প্রায় ১৯ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে। গত মৌসুমে কুষ্টিয়া জেলায় ৮৮ হাজার ৯১৯ হেক্টর জমিতে আমনেরআবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩ লাখ টন। চলতি মৌসুমে দৌলতপুর উপজেলায় ১ লাখ ৯ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


এদিকে, সার সংকট ও বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহানা পারভীন বলেন, দৌলতপুরে ইউরিয়াসহ অন্যান্য সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সার সংকটের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কৃষক আমাদের কাছে লিখিত বা সরাসরি অভিযোগ করেননি। তবে কৃষকরা যাতে
সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পান, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে তদন্ত ও তদারকি করা হচ্ছে।


তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে দৌলতপুর উপজেলায় ২ হাজার ৯০০ জন প্রান্তিক কৃষককে আমন চাষের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের কাছে সার সঠিক মূল্যে ও যথাযথ পরিমাণেসরবরাহ হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ নজরদারি করছে।


কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান বিবার্তাকে জানান, সারের দাম বেশি নেওয়ার কোনো তথ্য তাঁদের কাছে ছিল না। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তারা অবিলম্বে তদন্ত করে দেখবেন এবং ডিলার ও সাব-ডিলাররা কোনো অনিয়ম করছেন কি না তার সতত্যা যাচাই করবেন।


কৃষকদের দাবি, আমন চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে দ্রুত বাজার তদারকি ও অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মজুতদারি ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
জানিয়েছেন কৃষকরা।


বিবার্তা/শরীফুল/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com