ফোন কলেই ‘হোম ডেলিভারি’তে মিলছে মাদক
ভারতের ৫৫ পয়সার নেশাজাতীয় ট্যাবলেট দেশে ৩০০ টাকা
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১৫:০১
ফোন কলেই ‘হোম ডেলিভারি’তে মিলছে মাদক
শরীফুল ইসলাম (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে মাদক। হাত বাড়ালেই মিলছে সর্বত্র। ভারত সীমান্তঘেঁষা হওয়ার কারণে এ উপজেলায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে উদ্‌বেগজনক হারে। আর তা সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে তা পৌঁছে যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে। আবার হোম ডেলিভারিতেও ভারত থেকে আসা এসব মাদক সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ফলে ঘরে বসেই মিলছে ট্যাপেন্টাডল, ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক। আর এই ‘হোম ডেলিভারি’ নয়া পদ্ধতি মাদক নিয়ন্ত্রণে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রশাসন। তবে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসার সময় এসবমাদকের চালানের কিছু অংশ সীমান্তরক্ষী বিজিবির অভিযানে উদ্ধার হলেও পুলিশের অভিযান ততটা দৃশ্যমান নয় বলে সচেতন মহলের দাবি।


এর পাশাপাশি মাদকের সহজলভ্যতার কারণে উপজেলাজুড়ে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে ভুক্তবোগিরা মনে করেন।


বিভিন্ন অভিভাবকদের অভিযোগ, মাদকের টাকা জোগাড় করতে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও ক্রমাগত বাড়ছে। রাতের আঁধারে বিভিন্ন এলাকায় পানির বৈদ্যুতিক মোটর, গরু, ছাগল, মুরগিসহ গৃহস্থালির বিভিন্ন সামগ্রী চুরি হচ্ছে বলে তারা জানান। আর এসব চুরির ঘটনার সঙ্গে মাদকাসক্তদের সংশ্লিষ্টতারয়েছে বলে চুরি যাওয়া পরিবারগুলোর দাবি।


মাদকসেবনকারীদের একটি সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুর উপজেলা পরিষদ বা থানার দুই কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ১০টি মাদক বিক্রয় ও সেবনের স্পট রয়েছে। শুধু থানার আশপাশের এলাকায় গত একমাসে একডজনেরও বেশী চুরি হয়েছে। মাদকের টাকা সংগ্রহের জন্য মাদক সেবনকারীরা প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটাচ্ছে।


গত ২ এপ্রিল এক মাদকসেবীকে চুরি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে দৌলতপুর হাসপাতাল চত্বরে আটক করে কোমর ও গলায় দড়ি বেঁধে থানা এলাকায় ঘুরানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় জনতা আটক ব্যক্তিকে দৌলতপুর থানা পুলিশে সোপর্দ করে।


আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের মতে, এখন আর মাদকসেবীদের নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হয় না। একটি ফোন কলেই ‘হোম ডেলিভারি’ পদ্ধতিতে চাহিদা অনুযায়ী মাদক মাদকসেবী বা ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। আর একাজেনিয়োজিত রয়েছে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সী নারী-পুরুষ।


গোয়েন্দা সূত্র মতে, রমরমা অবৈধ মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী ও অসাধু ব্যক্তিরা জড়িত। এদের মধ্যে রয়েছে খোদআইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু সদস্যও। আছেন নামধারী ভূঁইফোড়রাও এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিবর্গ।


বিজিবি ও পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রমতে, দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের বাংলাবাজার সীমান্ত এবং উদয়নগর বিওপি-সংলগ্ন পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সীমান্তের একটি অংশ ভারত সীমানা ঘেঁষা হওয়ায় ওইসব এলাকায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উদয়নগর সীমান্তকে মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক পাচারকারী ও মাদকচোরাকারবারিরা।


জানা গেছে, আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ ও পশ্চিম ধর্মদহ, প্রাগপুর ইউনিয়নের জামালপুর, মহিষকুন্ডি মাঠপাড়া ও বিলগাথুয়া, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মুন্সিগঞ্জ, ঠোটারপাড়া, চরপাড়া, চল্লিশপাড়া, মরারচর ও ভাগজোত এবং চিলমারী ইউনিয়নের চরচিলমারী ও উদয়নগর সহ সীমান্ত এলাকার পদ্মা নদীর বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করে দেশে মাদক পাচার হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। দৌলতপুরে প্রতি মাসে প্রায় ৫-৬ কোটি টাকার মাদকের কারবার হয়ে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট ওইসব সূত্রগুলো দাবি করেছেন।


বর্তমানে মাদক কারবারীদের প্রধান লক্ষ্য ১৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ও যুবকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক কারবারী বিবার্তাকে জানান, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের চাহিদা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। আকারে ছোট হওয়ায় এসব মাদক সহজে বহন করা যায়। প্রশাসনের নজর এড়াতে সরাসরি বেচাকেনার পরিবর্তে ফোনের মাধ্যমে ‘হোম ডেলিভারি’ সিস্টেমে বেচাকেনা করা হয়ে থাকে। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাত্র ৫৫ পয়সায় সংগ্রহ করা এসব নেশাজাতীয় ট্যাবলেটবাংলাদেশে এনে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে।


সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় বহিরাগত মোটরসাইকেল আরোহী ও অপরিচিত মানুষের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। বিশেষ করে বিকেল ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সীমান্ত এলাকায় তরুণদের মাদকসেবনের প্রবণতা বাড়ে, যা স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত
উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এছাড়াও সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও সীমান্ত এলাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকলেও সীমান্ত দিয়ে মাদকের অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না বলেও তারা মনে করেন।


কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) এর তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় অভিযানে প্রায় ১৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।


এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ২৭৯ বোতল বিদেশি মদ, ৯ লিটার দেশি মদ, ৩ হাজার ২৯৫ বোতল ফেনসিডিল, ১৬১ কেজি ৩৭৫গ্রাম গাঁজা, ২৫ হাজার ৭২টি ইয়াবা, ২ কেজি ৩৮৫ গ্রাম হেরোইন, ১২ বোতল এলএসডি, ১ কেজি আফিম, ২৫০ গ্রাম কোকেন, ১ লাখ১৬ হাজার ৩৬৮ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ১ লাখ ৬ হাজার ১৭৯ পিস সিলডেনাফিল ট্যাবলেট, ৪৬ হাজার ৫০৩ পিস ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট এবং ৫১ হাজার ৭৮০টি সাইপ্রোহেপ্টাডিন ট্যাবলেট।


এছাড়াও গত এক সপ্তাহে সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১ কোটি টাকারমাদক উদ্ধার করেছে বিজিবি।


অপরদিকে, দৌলতপুর থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে ১০৬টি মাদকের মামলা দায়ের করা হয়েছে। আরগ্রেফতার করা হয়েছে ৭৭ জনকে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি গত ১৯ জুলাই আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গড়–রা এলাকা থেকে জব্দ হওয়া ৪০০ বোতল ফেনসিডিলআত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তেকালা পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই ফিরোজ হোসেনের বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্ত সংবাদ বিভিন্ন গণামাধ্যমে প্রকাশ হলে ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে বলেজানিয়েছেন দৌলতপুর থানা পুলিশ।


এদিকে মাদকের অবাধ বিস্তারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও চরম উদ্‌বিগ্ন। প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামানমুকুল সরকার বিবার্তাকে বলেন, আগের তুলনায় মাদকের বিস্তার অনেকগুণ বেড়েছে। এখন প্রকাশ্যেই বেচাকেনা হচ্ছে। মাদকের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে তরুণ সমাজ।


দৌলতপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম মহি বলেন, মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত, তা অনেকেই জানেন। মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এখন প্রয়োজন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর আইন প্রয়োগ।


দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, মাদকাসক্তরা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তারা শারীরিক ও মানসিক জটিল রোগেও আক্রান্ত হচ্ছেন, যা সমাজের জন্য বড় হুমকি।


মাদকের বিস্তার আগের তুলনায় বেড়েছে বলে স্বীকার করেন দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান। তিনিবলেন, এটি রোধে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।


ভেড়ামারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, দৌলতপুর ‌সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এখানে মাদকের বিস্তার তুলনামূলক বেশি। মাদকের বিস্তার রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আরও দ্রæত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


সীমান্তে মাদক প্রতিরোধে বিজিবির টহল ও জনবল বাড়ানো হয়েছে বলে জানান কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি। তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত মাদক জব্দ হচ্ছে। তবে দেশের অভ্যন্তরে থাকা মাদক জব্দে পুলিশের সহযোগিতা প্রয়োজন। যৌথ অভিযানের মাধ্যমেই মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।


মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন কমিটির সভায় কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের এমপি আলহাজ¦ রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেছেন, মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবেনা, সে যদি আমার দলের নেতাও হয়ে থাকে তাকে ছাড় দেওয়া হবেনা। মাদক নিয়ন্ত্রণে তিনি প্রশাসনকে আরো দায়িত্বশীল ও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।


সর্বোপরি মাদকের ভয়াল থাবা থেকে যুবসমাজসহ সব বয়সীদের রক্ষা করতে এক্ষুনি প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ। এমনটাই মনে করেন সচেতন মহল।


বিবার্তা/শরীফু/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com