আশ্বাসে আর বিশ্বাসী নয় চরবাসী
দৌলতপুরে ব্রিজের অভাবে চরবাসীর দূর্বিসহ জীবন
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ২০:২৬
দৌলতপুরে ব্রিজের অভাবে চরবাসীর দূর্বিসহ জীবন
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

দিন বদলের সাথে বদলিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যবস্থা। উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার, পরিবর্তন হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থায়। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের দূর্গম চরবাসীর জীবন-মানের। এখনও পায়ে হেঁটে, অথবা গরু বা ঘোড়ার গাড়িতে করে তাদের যেতে হয় উপজেলা ও জেলা শহরে। শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় স্কুলে। বন্যা বা বর্ষায় সে পথও হয়ে যায় রুদ্ধ। ব্রিজের অভাবে এখনও তারা রয়েছে অনেক পিছিয়ে। আশ্বাস মিললেও দীর্ঘ ৫৪ বছরে বাস্তবায়ন হয়নি প্রতিশ্রুতির।


দৌলতপুর উপজেলা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন। পদ্মা নদী বেষ্টিত দূর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এখানকার লক্ষাধিক মানুষের জীবন-যাত্রা এখনও রয়েছে পুরোনো ধারায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে এখনও তাদের গরু-মহিষ বা ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করতে হয়। বর্ষা বা বন্যায় নৌকা হয়ে উঠে তাদের একমাত্র যোগাযোগের বাহন। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিপণ্য বিপণনে পিছিয়ে রয়েছেন অবহেলিত জনপদের মানুষগুলো। পিছিয়ে থাকা চরাঞ্চলের মানুষের যুগোপযোগী হতে প্রয়োজন ভাগজোত ও সুকার ঘাটে দুটি ব্রিজ।


মাত্র দুটি ব্রিজের অভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। বর্ষা মৌসুম এলেই রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে পুরো এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর পানি নেমে গেলে পায়ে হেঁটে কিংবা গরু-মহিষের গাড়ি বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে চলাচলই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।
ভূক্তভোগী স্থানীয়দের মতে, বছরের পর বছর ধরে প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে উন্নয়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি আজও। আধুনিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে ভারত সীমান্তঘেঁষা রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের কৃষি নির্ভর বিস্তীর্ণ জনপদ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্বাচন এলেই উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি মিলে, ভোট শেষে তা আর আলোর মুখ দেখে না।


৪৬৮ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দৌলতপুর উপজেলা ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হলেও এ উপজেলায় এখনো পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, হয়নি একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনও। বিশেষ করে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত ঘাট এবং চিলমারী ইউনিয়নের সুকারঘাট এলাকায় ব্রিজ না থাকায় এই দুই ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দুর্যোগ নিত্যদিনের। তাই দুর্ভোগ লাঘবে প্রয়োজন দুটি ব্রিজ।


দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানা গেছে, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত ঘাটে ৩৫০ মিটার এবং চিলমারী ইউনিয়নের সুকারঘাটে মাত্র ৯৬ মিটার দীর্ঘ দুটি ব্রিজ নির্মাণের জন্য সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ভাগজোত ও সুকারঘাট ব্রিজ নির্মাণের। পাশাপাশি চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিসহ নানা ধরণের আশ্বাস ছিল অহরহ। তবে নির্বাচনের পরও তা বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি ভূক্তভোগী ও অবহেলিত চরবাসীর।


স্থানীয় শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান বলেন, আমি বর্তমানে ঢাকায় একটি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। আমার বাড়ি রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর চরে। ছোটবেলায় বন্যার সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ থাকে যার কারনে প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া সম্ভব হতো না। পানি বাড়লে প্রায় ছয় মাস শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকতো। আমার পরিবারের সামর্থ্য ছিল বলে ঢাকায় পড়তে যেতে পেরেছি, কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা সেখানেই থেমে যাচ্ছে। দ্রুত ব্রিজ দুটি নির্মাণ হলে এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।


রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভাগজোত ও সুকারঘাটে দুটি ব্রিজ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় আমরা শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে অনেক পিছিয়ে আছি। বর্ষাকালে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটে কিংবা, গরু বা মহিষ বা ঘোড়ার গাড়ি অথবা মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হয়। লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত ব্রিজ নির্মাণ জরুরি।


স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, এই দুই ইউনিয়নের শিশুরা সঠিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। বন্যার সময় স্কুল ও রাস্তাঘাট পানির নীচে তলিয়ে যায়। বছরের প্রায় ৬ মাস শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় শিক্ষকরা এখানে চাকরি করতে আগ্রহী হন না। কেউ এলেও কিছুদিন পর বদলি নিয়ে চলে যান। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে।


তিনি আরো বলেন, এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। উপজেলা সদর হাসপাতাল প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তার মধ্যেই মারা যান। কৃষকরাও ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রি করতে পারেন না। নৌকা কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে ফসল বাজারে নিতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়।


এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আসাদুল্লাহ বাচ্চু বলেন, ব্রিজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বাজেটে অনুমোদন পেলেই নিয়ম অনুযায়ী কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।


এ বিষয়ে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ভাগজোত ও সুকারঘাটে ব্রিজ এবং নদীভাঙন সমস্যা আমার উপজেলার অন্যতম বড় সমস্যা। বিষয়টি আমি সংসদে উত্থাপন করেছি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটারও দিয়েছি। দ্রুত ব্রিজ নির্মাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।


স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ব্রিজ দুটি নির্মাণ করা হলে বদলে যাবে সীমান্তবর্তী দুই ইউনিয়নের বিস্তীর্ন জনপদের জীবনচিত্র। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে, পাশাপাশি আধুনিকতার ছোঁয়ায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠির জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। তবে অবহেলিত চরবাসী আশ্বাসে আর বিশ্বাসী নয়, তারা চাই এর বাস্তবায়ন।


বিবার্তা/শরীফুল/এসএম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com