
কৃষি জমিতে পোলট্রি-মুরগি বিষ্ঠা ফেলায় দুর্গন্ধে রোগ-জীবাণু ছড়াচ্ছে। এতে করে ভোগান্তি পড়ছে এলাকার মানুষ এবং প্রান্তিক কৃষককেরা।
রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার গোগ্রাম ইউনিয়নের কমলাপুরে তিন ফসলের কৃষি জমিতে মাঠে প্রতিরাতে ফেলা হচ্ছে গাড়ি বোঝাই পোলট্রি খামারের বিপুল পরিমাণ মুরগির বিষ্ঠা। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য বর্জ্য কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই খামার থেকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে আশপাশের কৃষি জমিতে। সকাল-সন্ধ্যা বিষাক্ত গন্ধে মানুষ ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। বৃষ্টি হলে খাড়ির পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে কৃষিকাজে ব্যবহার করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে গোগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, বারবার অভিযোগ করার পরেও খামার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং অভিযোগের পর বর্জ্য ফেলার মাত্রা আরও বেড়েছে। আগে এসব বর্জ্য রাজশাহীর বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো। এখন গভীর রাতে, রাত ১টা থেকে ৩টার মধ্যে কিছু গাড়ি চালক গোপনে বর্জ্য ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এতে তীব্র দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে সেখানকার জনজীবন। সেইসাথে ছড়াচ্ছে রোগজীবাণু, ব্যাহত হচ্ছে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মৎস্য উৎপাদন। প্রভাশালীদের দাপটে অসহায় ঐ এলাকার কৃষক ও সাধারণ মানুষ। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। শনিবার (৪ এপ্রিল) গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত হলে, গ্রামবাসীরা অভিযোগ করে বলেন, রাজশাহীর স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের বিভিন্ন মুরগির খামার থেকে মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্য এনে কমলাপুর গ্রামের ফসলি জমি ও বিল এলাকায় খোলামেলা স্থানে ফেলা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বর্জ্য ফেলার ফলে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বেড়েছে মাছি-সও, নানা রকমের পোকার উপদ্রব। তারা আরো জানান, দুর্গন্ধযুক্ত (বিষ্ঠা ফেলা স্থান) সেই জমির পাশ দিয়েই এ অঞ্চলের রাস্তা, এ রাস্তা দিয়ে কৃষক ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত চলাচল করেন। দুর্গন্ধের কারণে সেখান দিয়ে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এলাকার কয়েকজন কৃষক বলেন, দুর্গন্ধে এখানে দাঁড়ানোই যায় না। শুধু তাই নয়, মুরগির বিষ্ঠা ফেলার কারণে এলাকায় মাছির উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এসব মাছি ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি করছে। এছাড়াও ওই এলাকার আশপাশে অসংখ্য পুকুর রয়েছে যেখানে মাছ চাষ করা হয়। পরিবেশ দূষণের কারণে মাছের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন মৎস্য চাষীরা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কমলাপুর গ্রামের নুরুলের ছেলে হজরত আলির নিয়ন্ত্রণে থাকা জমিতেই এসব মুরগির বিষ্ঠা ফেলা হচ্ছে। তিনি ওই জমিগুলো আদি-বর্গা হিসেবে চাষ করে থাকেন এবং তার নিয়ন্ত্রণে থাকা জমিতেই বর্জ্যগুলো ফেলা হচ্ছে। হজরত আলির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায়, মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে হযরত আলী এসব অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে উলটো সাংবাদিকদের সঙ্গে হুমকির সুরে কথা বলেন। পরে কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি কমলাপুর গ্রামের মোড়ে উপস্থিত হলে স্থানীয়দের সঙ্গে তার তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। এসময় সাংবাদিকদের সামনেই তিনি স্থানীয় ভ্যান চালককে মোটর সাইকেলের হেলমেট দিয়ে মারতে যান। আরও কয়েকজন গ্রামবাসী ঠেকাতে গেলে তাদের সাথেও মারমুখী আচরণ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এই কর্মযজ্ঞের হোতা হিসেবে নাবিল গ্রুপের নাম উল্লেখ করেন। তিনি জানান, নাবিল গ্রুপের লোকজন রাতের আঁধারে এগুলো ফেলে যায়! এ বিষয়ে নাবিল গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজার বেলাল হোসেন বলেন, “আমরা নিজেরা বর্জ্য ফেলি না, বরং থার্ড পার্টির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। তাদের পরিষ্কারভাবে বলা আছে, আশপাশে কিংবা খোলা স্থানে ফেলা যাবে না। তারা যদি শর্ত ভঙ্গ করে, তবে চুক্তি বাতিল করা হবে।” তবে নাবিল গ্রুপের ঠিকাদার বাবলু সরকার বলেন, ডিসি, ইউএনও এবং ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নেয়া আছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে আমাদের কাছে।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানান, কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও বিষয়টি লিখিতভাবে জানানোর পরামর্শ দেন।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুস সাদাত রত্ন বলেন, এর আগেও কয়েকবার জরিমানা করা হয়েছে তারপরও এরা এগুলো করছে। তারা রাতের আঁধারে এগুলো বহন করে ফেলে চলে যায় তাই ধরা সম্ভব হয় না। তবে এবার তাদের ডাকা হয়েছে, তারা আমার কাছে আসবে। আপনার অনুমতি নিয়ে তারা এগুলো করছে বলে অভিযোগ উঠেছে জানালে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। তবে তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলা অফিসের উপর-পরিচালক তাসমিনা খাতুন বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র তাদের দেওয়া হয়েছে। ডিসি স্যারের কাছে তারা আবেদন করলে ডিসি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তর সব কিছু দেখে তাদের অনুমতি দিয়েছে৷ তবে সবকিছুই আইন ও নিয়ম মেনে চলতে হবে৷ এরপরেও যদি জনভোগান্তি হয় তবে আমরা অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
বিবার্তা/মোস্তাফিজুর/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]