তিস্তা চরের সূর্যমুখী বাগান যেন পর্যটন কেন্দ্র
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১১:১৫
তিস্তা চরের সূর্যমুখী বাগান যেন পর্যটন কেন্দ্র
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিস্তীর্ণ জমিতে তামাক চাষ হতো। তবে চলতি মৌসুমে তামাকের পরিবর্তে তেলজাতীয় ফসল সূর্যমুখী চাষে ঝুঁকছেন চরের কৃষকেরা। ইতোমধ্যে ভালো ফলন ও লাভের সম্ভাবনা দেখে অনেকেই নতুন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।


সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচর জমি এখন যেন হলুদের সমারোহ। দূর থেকে মনে হয়, বিস্তীর্ণ প্রান্তরে হলুদ গালিচা বিছানো। কাছে গেলে দেখা যায় সারি সারি সূর্যমুখী ফুল সূর্যের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে দুলতে থাকা এসব ফুল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, বরং সম্ভাবনার নতুন বার্তাও দিচ্ছে চরাঞ্চলের কৃষকদের। প্রতিদিন দর্শনার্থীরা ভিড় করছে ওই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার জন্য।


লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের তিস্তা চর এলাকায় এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। উপজেলার উত্তরাংশে ধরলা এবং দক্ষিণে তিস্তার প্রবাহঘেরা দুর্গাপুর ও মহিষখোঁচা ইউনিয়নের চরভূমিতে পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচজন কৃষককে সূর্যমুখী চাষের প্রদর্শনী দেওয়া হয়। এর মধ্যে মহিষখোঁচায় তিনজন এবং দুর্গাপুরে দুজন কৃষক প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে এ ফসল আবাদ করেন।


উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বর্ষা শেষে জেগে ওঠা অনাবাদি চরাঞ্চলকে উৎপাদনের আওতায় আনতে কৃষি মন্ত্রণালয় একটি চর উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। ওই প্রকল্পের আওতায় তামাকনির্ভর জমিতে বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখী চাষের প্রদর্শনী শুরু হয়। কৃষকেরা জমি ও শ্রম দেন, আর প্রকল্প থেকে বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়। তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে কৃষকদের আগ্রহী করাই ছিল এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।


কৃষকরা বলছেন, স্বল্প খরচে তুলনামূলক বেশি লাভের সম্ভাবনা তাদের সূর্যমুখীর দিকে আকৃষ্ট করছে।


চরাঞ্চলের কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রতি বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়। ফলন পাওয়া যায় ৬ থেকে ৭ মণ পর্যন্ত। বাজারে প্রতি মণ প্রায় ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব। এতে খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ হতে পারে। তার মতে, তামাক চাষের তুলনায় এ ফসলে খরচ ও শ্রম কম।


স্থানীয় তামাক চাষি আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘‘অধিক লাভের আশায় স্বাস্থ্যঝুঁকি জেনেও অনেকেই তামাক চাষ করেন। তবে সূর্যমুখীর বাজার স্থিতিশীল থাকলে কৃষকেরা ধীরে ধীরে তামাক থেকে সরে আসবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’’


সূর্যমুখীর খেত দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল মিয়া মনে করেন, তামাকের বিকল্প হিসেবে লাভজনক ফসল প্রতিষ্ঠিত হলে চরাঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবেন এবং দেশের ভোজ্যতেল উৎপাদনও বাড়বে।


মহিষখোঁচা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার রায় জানান, তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে এবং লাভজনক বিকল্প প্রদানের লক্ষ্যেই সূর্যমুখীর প্রদর্শনী চালু করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন ভালো হয়েছে। ভবিষ্যতে এর পরিসর বাড়ানো গেলে তামাকের আগ্রাসন কমবে বলে তিনি আশাবাদী।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইখুল আরেফিন বলেন, ‘‘সূর্যমুখীতে রোগবালাই কম হয় এবং উচ্চ ফলনশীল ফসল। উৎপাদিত তেল স্বাস্থ্যসম্মত। কৃষকদের উৎসাহিত করতে সরকার বীজ ও সার সহায়তা দিচ্ছে। সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারিত হলে চরাঞ্চলের কৃষকদের আর্থিক উন্নয়ন ঘটবে এবং জাতীয় পর্যায়ে ভোজ্যতেল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’’


সব মিলিয়ে তিস্তার চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর এই সফল আবাদ তামাকনির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাজার সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে তেলজাতীয় ফসলই হতে পারে কৃষকদের প্রধান ভরসা বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।


বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com