
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের মনোনয়নপত্র ও হলফনামা ঘিরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। হলফনামায় অসম্পূর্ণ, ভুল ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল না করে হলফনামা সংশোধনের সুযোগ দেওয়ায় নির্বাচন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) যাচাই-বাছাই শেষে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা খন্দকার নাসিরুল ইসলামকে বিকাল চারটার মধ্যে হলফনামা সংশোধনের সুযোগ দেন। তবে নির্বাচন আইন অনুযায়ী হলফনামায় মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রমাণিত হলে সংশোধনের সুযোগ নেই; বরং তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
নির্বাচনী আইন ও বিধি অনুযায়ী, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। ফলে নাসিরুল ইসলামের ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত আইনসঙ্গত কি না— তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, হলফনামা সংশোধনের সুযোগ দিলেও আয়কর–সংক্রান্ত অসঙ্গতি এভাবে সংশোধনযোগ্য নয়। কারণ, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যে আয়কর রিটার্ন, টিআইএন সনদ ও ইনকাম ট্যাক্স সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আগে থেকেই যাচাইকৃত ও সার্টিফায়েড দলিল। যাচাই-বাছাইয়ের সময় যদি প্রার্থীর হলফনামায় উল্লেখিত আয় ও সম্পদের তথ্যের সঙ্গে জমাকৃত আয়কর নথির মিল না থাকে, তাহলে শুধু হলফনামা সংশোধন করলেই তা বৈধ হয়ে যায় না। সে ক্ষেত্রে সংশোধিত আয়কর নথির সার্টিফায়েড কপি দাখিল প্রয়োজন হয়, যা মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নতুন করে দাখিল বা সংশোধনের সুযোগ নেই।
তাদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে মনোনয়নপত্র বাতিলই নির্বাচনী আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফরিদপুর-১ আসনের সম্ভাব্য এনডিএফ জোট প্রার্থী শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর বলেন, ‘হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা নিজের নামে আয়কর রিটার্ন জমা না দেওয়া শুধু মনোনয়ন বাতিলের কারণ নয়, এটি ফৌজদারি অপরাধ। অথচ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তাকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন। এই প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, তা আমরা বুঝে গেছি।’
সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ফরিদপুর জেলা কমিটির আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান অপু বলেন, ‘প্রশাসন এখনই একটি নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দিচ্ছে। আমরা এই পক্ষপাতমূলক আচরণ মানি না।’
সূত্র বলছে, খন্দকার নাসিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে এবং তিনি কয়েকটি মামলার এজাহারনামীয় আসামি। তবে এসব তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। বিষয়টি ফরিদপুর-১ আসনের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী রিটার্নিং কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অবহিত করেন। এছাড়া নাসিরের বিরুদ্ধে ঢাকা ব্যাংকের ফরিদপুর শাখায় ঋণখেলাপি থাকার অভিযোগও রয়েছে।
জানা গেছে, খন্দকার নাসিরুল ইসলাম মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যে আয়কর নথি জমা দিয়েছেন, তা তাঁর নিজের নামে নয়। নথিতে নাম রয়েছে ‘খন্দকার নাসিউল ইসলাম’। ওই নামের ব্যক্তির টিআইএন নম্বর ২২১০৫৩৮৭৯৯৪১।
‘খন্দকার নাসিউল ইসলাম’ নামে জমা দেওয়া আয়কর বিবরণী অনুযায়ী মোট সম্পদের পরিমাণ ৪৯ লাখ ৪৪ হাজার ২৯৫ টাকা। অথচ বিএনপি প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের জমা দেওয়া হলফনামায় তাঁর সম্পদ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা। এই সম্পদের বিপরীতে আয়কর-সংক্রান্ত কোনো প্রাসঙ্গিক নথি সংযুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
দায় (ঋণ) সংক্রান্ত তথ্যেও বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। হলফনামায় খন্দকার নাসিরুল ইসলাম তাঁর দায় দেখিয়েছেন ১৬ কোটি ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ২৪১ টাকা। অথচ ‘খন্দকার নাসিউল ইসলাম’ নামে জমা দেওয়া আয়কর নথিতে ব্যাংক ঋণ দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ওই আয়কর বিবরণীতে গাছ বিক্রি বাবদ ১৭ লাখ ২০ হাজার ৩০৫ টাকা আয়ের তথ্য থাকলেও খন্দকার নাসিরুল ইসলামের হলফনামায় অন্যান্য আয়ের উৎস ও অর্থের বিস্তারিত হিসাব উল্লেখ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
হলফনামা যাচাইয়ে আইন অনুযায়ী কঠোর অবস্থানের পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় নির্বাচন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন, আইন যেখানে স্পষ্ট, সেখানে একজন প্রার্থীকে কীভাবে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলো?
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]