
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়; ইতিহাস, স্থাপত্য আর আবেগের অনন্য এক মেলবন্ধন। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে থাকবে উত্তর আমেরিকার তিন দেশজুড়ে—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬টি স্টেডিয়ামে। পেলের ব্রাজিল আর ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার ইতিহাস লেখা আজতেকা থেকে শুরু করে বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সোফি স্টেডিয়াম—প্রতিটি ভেন্যুই যেন নিজস্ব গল্প নিয়ে অপেক্ষা করছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের।
পাঠকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬টি ভেন্যুর পরিচিতি তুলে ধরা হলো। যেখানে অনেক স্টেডিয়াম আমেরিকান ফুটবলের জন্য পরিচিত হলেও, এবার সেগুলোই হয়ে উঠবে বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১১টি ভেন্যু যুক্তরাষ্ট্রের, মেক্সিকোর ৩টি ও কানাডার ২টি।
কানাডা
টরন্টো — বিএমও ফিল্ড
ধারণক্ষমতা: ৪৫ হাজার
কানাডার দুটি ভেন্যুর একটি বিএমও ফিল্ড। এটি বিশ্বকাপের অল্প কয়েকটি স্টেডিয়ামের মধ্যে একটি, যা শুধু ফুটবলের জন্যই নির্মিত। ২০০৭ সালে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। বর্তমানে এটি মেজর লিগ সকারের ক্লাব টরন্টো এফসির ঘরের মাঠ।
এখানে মোট ছয়টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে—পাঁচটি গ্রুপ পর্বে এবং একটি শেষ ৩২-এর ম্যাচ। ১২ জুন বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে কানাডার উদ্বোধনী ম্যাচও হবে এই ভেন্যুতে।
ভ্যাঙ্কুভার — বিসি প্লেস
ধারণক্ষমতা: ৫৪ হাজার
১৯৮৩ সালে উদ্বোধন হওয়া বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। জলরাশির পাশ ঘেঁষে থাকা এই স্টেডিয়ামকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ভেন্যুগুলোর একটি ধরা হচ্ছে।
এটি এমএলএস ক্লাব ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপস ও কানাডিয়ান ফুটবল লিগের দল বিসি লায়ন্সের দীর্ঘদিনের হোম ভেন্যু। ২০১৫ নারী বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছিল এখানে।
এই স্টেডিয়ামে সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে রয়েছে দুটি নকআউট ম্যাচ।
মেক্সিকো
মেক্সিকো সিটি — এস্তাদিও আজতেকা
ধারণক্ষমতা: ৮৩ হাজার
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক স্টেডিয়াম আজতেকা। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের পর এখানে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ হতে যাচ্ছে, যা একটি রেকর্ড। আজতেকা স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত হলেও এর বর্তমান নাম এস্তাদিও বানোর্তে।
১৯৬৬ সালে উদ্বোধনের পর ১৯৭০ বিশ্বকাপের মূল কেন্দ্র ছিল এই স্টেডিয়াম। সেই আসরে পেলের ব্রাজিল শিরোপা জেতে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপেও আবার আলোচনায় আসে আজতেকা, সেবার ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়।
১১ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ২০২৬ বিশ্বকাপ। উদ্বোধনী ম্যাচসহ এখানে মোট পাঁচটি খেলা অনুষ্ঠিত হবে।
গুয়াদালাহারা — এস্তাদিও আক্রন
ধারণক্ষমতা: ৪৮ হাজার
আগ্নেয়গিরির আদলে তৈরির কারণে এস্তাদিও আক্রন বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্টেডিয়ামগুলোর একটি।
২০১০ সালে উদ্বোধনের পর এখানে কোপা লিবার্তাদোরেসের ফাইনাল এবং ২০১১ প্যান আমেরিকান গেমসের উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠান হয়েছিল।
গ্রুপ পর্বে এখানে চারটি ম্যাচ হবে, যার মধ্যে ২৬ জুন স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচ অন্যতম।
মনতেরে — এস্তাদিও বিবিভিএ
ধারণক্ষমতা: ৫৩ হাজার ৫০০
স্থানীয়ভাবে ‘এল জিগান্তে দে আসেরো’ বা ‘স্টিল জায়ান্ট’ নামে পরিচিত এই স্টেডিয়াম পাহাড়ঘেরা মনোরম পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে।
২০১৫ সালে উদ্বোধন হওয়া আধুনিক এই ভেন্যুতে বিশ্বকাপে চারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্র
আটলান্টা — মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৭৫ হাজার
এনএফএলের আটলান্টা ফ্যালকন্স ও এমএলএসের আটলান্টা ইউনাইটেডের ঘরের মাঠ মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম ২০১৭ সালে উদ্বোধন হয়। এটিকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব স্টেডিয়াম’ বলা হয়।
স্টেডিয়ামটিতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ছাদ এবং ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও ডিসপ্লে। এখানে বিশ্বকাপের আটটি ম্যাচ হবে, যার মধ্যে একটি সেমিফাইনালও রয়েছে।
বোস্টন — জিলেট স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৬৫ হাজার
নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের ঘরের মাঠ জিলেট স্টেডিয়াম বিশ্বকাপের আগে বড় ধরনের সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে।
এখানে সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে একটি কোয়ার্টার ফাইনাল। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হাই-ডেফিনিশন ভিডিও স্ক্রিনও স্থাপন করা হয়েছে এখানে।
এই মাঠে স্কটল্যান্ডের দুটি গ্রুপ ম্যাচ হবে। এছাড়া ২৩ জুন ইংল্যান্ড মুখোমুখি হবে ঘানার।
ডালাস — এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৯৪ হাজার
টেক্সাসের আরলিংটনে অবস্থিত সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম এনএফএলের ডালাস কাউবয়েজের ঘরের মাঠ।
২০০৯ সালে উদ্বোধনের পর এটি সুপার বোল, বিশ্ব বক্সিং শিরোপা লড়াই ও বড় ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করেছে। বিশ্বকাপে এখানে হবে নয়টি ম্যাচ, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার দুটি গ্রুপ ম্যাচও হবে এখানে। রয়েছে একটি সেমিফাইনালও।
হিউস্টন — এনআরজি স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৭২ হাজার
হিউস্টন টেক্সান্সের ঘরের মাঠ এনআরজি স্টেডিয়াম স্বয়ংক্রিয় ছাদ ও খাড়া গ্যালারির জন্য পরিচিত।
২০০২ সালে উদ্বোধনের পর নিয়মিত বড় ফুটবল ম্যাচ আয়োজন হয়েছে এখানে। ২০১৬ কোপা আমেরিকাতেও এখানে ম্যাচ হয়েছিল।
কানসাস সিটি — অ্যারোহেড স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৭৩ হাজার
বিশাল বাটির মতো নকশার এই স্টেডিয়াম এনএফএলের কানসাস সিটি চিফসের ঘরের মাঠ।
বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চ শব্দসম্পন্ন আউটডোর স্টেডিয়ামের রেকর্ড রয়েছে অ্যারোহেডের। ২০১৪ সালে দর্শকদের চিৎকারের শব্দমাত্রা পৌঁছেছিল ১৪২ দশমিক ২ ডেসিবেলে।
লস অ্যাঞ্জেলেস — সোফি স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৭০ হাজার
সোফি স্টেডিয়াম বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্টেডিয়ামগুলোর একটি। ২০২০ সালে উদ্বোধন হওয়া এই স্টেডিয়াম নির্মাণে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এখানে আটটি ম্যাচ হবে। এমনকি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচও হবে এখানে। তাতে ১২ জুন প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হবে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র।
মায়ামি — হার্ড রক স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৬৫ হাজার
মায়ামি ডলফিনসের ঘরের মাঠ হার্ড রক স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এখানে।
গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপের আটটি ম্যাচ ছাড়াও ২০২৪ কোপা আমেরিকার ফাইনাল হয়েছিল এখানে।
নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি — মেটলাইফ স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৮২ হাজার ৫০০
নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়াম বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। ফিফার করপোরেট স্পন্সরশিপ–সংক্রান্ত নীতির কারণে বিশ্বকাপ চলাকালে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হবে ‘নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়াম’।
এই ভেন্যুতে মোট আটটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে ফাইনাল এবং ইংল্যান্ডের গ্রুপ ‘এল’-এর একটি ম্যাচও।
২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) মেটলাইফ স্টেডিয়ামকে এনএফএলের ‘সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব স্টেডিয়াম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ‘স্টেডিয়াম বিজনেস সামিট’ মেটলাইফ স্টেডিয়ামকে বর্ষসেরা ভেন্যুর পুরস্কারেও ভূষিত করে।
এবারের বিশ্বকাপে এখানে হবে আটটি ম্যাচ, যার মধ্যে একটি সেমিফাইনাল এবং ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালও রয়েছে।
ফিলাডেলফিয়া — লিংকন ফিন্যান্সিয়াল ফিল্ড
ধারণক্ষমতা: ৬৯ হাজার
ফিলাডেলফিয়া ঈগলসের ঘরের মাঠ লিংকন ফিন্যান্সিয়াল ফিল্ডে হবে ছয়টি ম্যাচ।
৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির দিনে এখানে একটি ম্যাচ আয়োজন করা হবে। তুলনামূলক ছোট ও আঁটসাঁট নকশার কারণে স্টেডিয়ামটির পরিবেশ বেশ গর্জনমুখর।
২০০৩ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও বার্সেলোনার প্রীতি ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই ভেন্যুর।
সান ফ্রান্সিসকো/সান্তা ক্লারা — লেভাইস স্টেডিয়াম
ধারণক্ষমতা: ৭১ হাজার
২০১৪ সালে উদ্বোধনের পর দুটি সুপার বোল আয়োজন করেছে লেভাইস স্টেডিয়াম। এছাড়া কোপা আমেরিকা ও এমএলএস ম্যাচও হয়েছে এখানে।
সিয়াটল — লুমেন ফিল্ড
ধারণক্ষমতা: ৬৯ হাজার
এমএলএসের সিয়াটল সাউন্ডার্স ও এনএফএলের সিয়াটল সিহকসের ঘরের মাঠ লুমেন ফিল্ড যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ক্রীড়াসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০১৯ সালে এমএলএস কাপ জয়ের ম্যাচে প্রায় ৬৯ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। ২০২২ কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপ জয়ের ম্যাচেও উপচে পড়া ভিড় ছিল।
এই ভেন্যুতে চারটি গ্রুপ ম্যাচ হবে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচও রয়েছে। এছাড়া দুটি নকআউট ম্যাচও অনুষ্ঠিত হবে।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]