শিক্ষা পুনরুদ্ধারের প্রাণই হলো শিক্ষক
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৩
শিক্ষা পুনরুদ্ধারের প্রাণই হলো শিক্ষক
সাইফুল ইসলাম তালুকদার (রনি)
প্রিন্ট অ-অ+

আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষা উন্নয়নে শিক্ষকদের অবদান স্বীকৃতি দেয়ার জন্য ১৯৯৫ সাল থেকে ইউনেস্কোর মাধ্যমে সারা বিশ্বের ১০০টি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে, ইউনেস্কো প্রতি বছর একটি স্লোগান প্রকাশ করে থাকে। এবাবের স্লোগান হলো ‘শিক্ষা পুনরুদ্ধারের প্রাণই হলো শিক্ষক’।


স্লোগানটির মর্মাথ যতদ্রুত উপলব্ধি হবে শিক্ষা পুনরুদ্ধারে সফলতা দ্রুতই অর্জন করা যাবে। করোনার কারনে গত বছর ১৭ মার্চ বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ৫৪৪ দিন পর গত মাসের ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়গুলো খোলা হয়েছে। ফলে শিক্ষা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ শিক্ষার রুপরেখা তৈরি করার এখনই সেরা সময়। ভবিষ্যৎ শিক্ষার রুপকল্প প্রস্তুত করার জন্য শিক্ষকরাই অন্যতম গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষকদের সার্বিক সহযোগিতার জন্য আমাদের এই মূহূর্তে যে বিষয়গুলো আলোচনা করা দরকার তা হলো-


শিক্ষকতার পেশার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- আলোকিত টিচার্স গত মাসে শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য একটি সার্ভে করেছিলো। সেখানে শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে, শিক্ষকরা কি তাদের পেশাটিকে নিরাপদ মনে করেন? ২৫% শিক্ষকই সন্তুষ্টজনক মন্তব্য করেননি। তাঁদের এই নেতিবাচক মন্তব্যের পেছনে যুক্তিগুলোরও আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। অনেকেই করোনার কারনে বিদ্যালয় বন্ধ থাকার ফলে জীবিকার জন্য অন্য পেশাগুলো বেছে নিয়েছে। অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিয়ে অন্যান্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন।


পত্রিকা থেকে জানতে পারি যে, করোনাকালীন প্রায় ১০ হাজার কিন্ডার গার্ডেন বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক শিক্ষক চাকরি হারিয়েছে। শিক্ষকতা পেশার নিরাপত্তা না থাকার ফলে আগামীতে শিক্ষকতা পেশায় অনেক মেধাবীরাই আসতে চাইবে না। আমাদের এখনই সময় এসেছে, এই পেশার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিক্ষকেরা আগামীতেও যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে, সেই জন্য বিভিন্ন বীমা, বিশেষ ঋণ সহায়তা দিয়ে পেশার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী শিক্ষকদের বেতন সুনিদির্ষ্ট করে কেন্দ্রীয় ভাবে নিয়ন্ত্রন করা। শিক্ষকেরা জেনো বেতন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে তা ভাবতে হবে। সময়ের সাথে জীবন ও জীবিকার কথা বিবেচনা করে তাদের বেতনের মানদন্ড মানসম্মত করতে হবে।


আগ্রহীদেরই শিক্ষকতায় নেয়া দরকার- শিক্ষা সময়ের সেরা বিনিয়োগের ক্ষেত্র। সাসটেনবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা স্থায়ী উন্নয়নের জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগের কোন বিকল্প নেই। ভারতের নোবেল জয়ী শিক্ষাবিদ কৈলাশ সত্যার্থী বলেন, শিক্ষায় ১ ডলার বিনিয়োগ করলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে ১৫ গুন রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে হবে। আগ্রহী শিক্ষার্থীদের স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী মূল্যায়নের মাধ্যমে এই পেশায় আসার জন্য আমন্ত্রন জানাতে হবে।


শিক্ষক দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া- প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পৃথিবী প্রতি সেকেন্ডে বদলে যাচ্ছে। সেই সাথে শিক্ষকদের ও বদলাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একজন শিক্ষক আজকেই আগামী দশকের সময়,সুযোগ ও সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করছে। ফলে শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য যুগোপযুগী ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে।


শিক্ষকদের আত্মোউন্নয়নের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব দিতে হবে। আলোকিত টিচার্স গত মাসে জরিপে শিক্ষকদের একটি প্রশ্ন করেছিল, শিক্ষকেরা তাদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন মনে করেন কিনা? ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষকই মনে করেন তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের দরকার।


করোনার মতো যেকোন মহামারী মোকাবেলায় শিক্ষকদের পূর্ব প্রস্তুত করে রাখতে হবে তার জন্য প্রশিক্ষণ খুব দরকার। করোনার সময়ও কিভাবে শিক্ষাকে পুনরুদ্ধার করা যায় তা নিয়ে সমক্ষ জ্ঞান রাখতে হবে। আলোকিত টিচার্স সবসময়ই যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ ও এককভাবে সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ, কর্মশালার আয়োজন করে থাকে।


বাংলাদেশের যেকোন প্রান্তে বসে শিক্ষকেরা লাইভ ক্লাসে অংশ নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। অনেকেই শিক্ষন-শিখন উন্নয়নের জন্য লাইভ কোর্স গুলো alokitoteachers.com এ ওয়েবসাইটের গিয়ে খুব কম সময়ে হাতে কলমে শিখতে পারবেন।


শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উপাদান হলো শিক্ষার্থী,আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হল শিক্ষক। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ও অভিভাবকের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সফলতা পেতে হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। করোনাকালীন সময়ে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘসময় বাড়িতে অবস্থান করায় শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মানসিকভাবে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে শিক্ষকেরা অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে থাকবে। ফলে অভিভাবকেরা শিক্ষকদের সহযোগীতা করতে হবে। পরস্পর পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, আন্তরিকতা ও আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। নিয়মিত পারস্পরিক শিক্ষক-অভিভাবক যোগাযোগ অব্যহত রাখতে হবে।


শিক্ষকতা হোক আনন্দদায়ক- শিক্ষা হোক আনন্দদায়ক এটা সকলের প্রত্যাশা। কিন্ত শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করার জন্য আমরা সবসময়েই শিক্ষার্থীর কথা বিবেচনা করি বারবার। আমাদের শিক্ষার পাঠ্যক্রমও শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব বেশি দেয়া হয়েছে। আগামী ২০২৩ সালের শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের চাপ কমানোর জন্য নানান পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আমাদের ভাবতে হবে, শিক্ষকদের ও চাপমুক্ত রাখতে হবে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকেরা শিক্ষকতার পাশাপাশি অনেক জরীপ কাজে অংশ নিতে হয়।


অন্যান্য শিক্ষকেরা শিক্ষণের পাশাপাশি অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয় যেমন-বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও একজন শিক্ষককে দেখতে হয়। একজন শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানের কাগজপ্ত্র ,ফাইল পত্র নিয়ে সরকারী বিভিন্ন দপ্তরের দফতরে দফতরে ঘুরতে হয় ফলে একজন শিক্ষক তাঁর মূল কাজ শিক্ষণ থেকে অনেক সময়ই বিচ্যুতি হয়ে যায়। ফলে শিক্ষকদের চাপমুক্ত রেখে শিক্ষাদান ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের বিভিন্ন রিক্রেয়শন লিভের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকের মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধির জন্য বিদ্যালয় থেকে নানান উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে যেমন- মানসিক দক্ষতা নিয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা করা।


শিক্ষকদের স্বীকৃতি দেয়া- শিক্ষকতায় স্বীকৃতি খুব গুরুত্বপূর্ণ মোটিভেশন হিসেবে কাজ করে। ফলে শিক্ষকদের প্রতিটি কাজের স্বীকৃতি দেয়ার ব্যবস্থা করা। ইদানিং কালে অনেক প্রতিষ্ঠানই শিক্ষকদের কাজের স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে। যেমন- বছর শেষে ‘সেরা শিক্ষক’ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই বছর সরকার এ টু আই ও গ্রামীনফোনের উদ্যাগে ‘সংকটে নেতৃত্বে’ শিরোনামে শিক্ষকদের সম্মাননা প্রদান করেছে। এছাড়া আলোকিত টিচার্স ‘টিচার্স ইনোভেটরস-২০২১’ এর মাধ্যমে শিক্ষকদের উদ্ভাবনগুলোর স্বীকৃতি দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। সারা বাংলাদেশের সকল শিক্ষকদের থেকে আসা ইনোভেশনগুলোর মধ্যে সেরা তিনজনকে পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষকদের উদ্ভাবন এবং কাজের স্বীকৃতি প্রদান করতে পারে।


আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে তাঁর প্রতিচ্ছবি হলো আজকের শিক্ষকেরা। শিক্ষকদের মানন্নোয়ন ব্যতিত শিক্ষা ব্যবস্থার মানন্নোয়ন হবে না। ফলে শিক্ষকের দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাধীনতা ও সম্মানের বিষয়ে যত্নশীল হওয়ার মাধ্যমেই আগামীর স্বনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।


লেখক: প্রশিক্ষক- আলোকিত টিচার্স এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অফিসার, আলোকিত হৃদয় ফাউন্ডেশন।


বিবার্তা /এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com