বঙ্গবন্ধুর নামে অপপ্রচার বন্ধে পদক্ষেপ নিন
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৮:৫৪
বঙ্গবন্ধুর নামে অপপ্রচার বন্ধে পদক্ষেপ নিন
ওয়াহিদ রুবেল
প্রিন্ট অ-অ+

লেখাটা শুরু করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অনেক দিনের রাজনৈতিক সাথী তৎকালিন ন্যাপ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য দিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘আইয়ুবের সামিরক শাসন জারির সঙ্গে সঙ্গে আমরা শেখ মুজিবুর রহমানকে পরামর্শ দিয়েছিলাম। কারণ সামরিক সরকারের শেখ সাহেবকে গ্রেফতার করতে দৃঢ় সংকল্প ছিল। আমরা একটি গাড়িতে চড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু অন্য সঙ্গীদের সেখানে রেখে তিনি দেশের অভ্যন্তরে চলে এসেছিলেন। গ্রেফতার বরণের জন্য তিনি তৈরি হয়েই ছিলেন। তিনি হয়তো আত্মগোপনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না’। (আওয়ামী লীগ উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০, পৃষ্টা নং ১০১।)


মূলত এটিই ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপসহীন চরিত্র। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে এ জাতির মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কখনো পালিয়ে কিংবা আত্মগোপনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই তো বারবার গ্রেফতার হয়েছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে। জাতির মুক্তির জন্য মোট ১৪টি বছর কারগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন তিনি। অথচ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এদেশের ইতিহাস নিয়ে বারবার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। এখনো সে ধারা অব্যাহত রয়েছে।


লন্ডনে বসে জিয়াপুত্র তারেক রহমান দেশের ইতিহাস বিকৃত করার পাশাপাশি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মিথ্যাচার করে চলেছেন। আর দেশে বসে তার অনুসারীরাও তারেকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পিতা মুজিবের নামে অপপ্রচারে লিপ্ত। বার বার বঙ্গবন্ধুর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার হীনচেষ্টা করছেন। অনেকে আবার নিজের মতো করে গল্প বানিয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ইতিহাস বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টাও করছেন। কিন্তু মৃত মুজিব জীবিত মুজিবের চেয়ে আরো জীবন্ত, প্রাণবন্ত। তারা যতবারই ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করেছে, ততবারই সত্য প্রকাশ পেয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চরিত্র কেমন ছিল? জীবন যাপন কেমন ছিল? সেটি কি আমরা ধারন করতে পেরেছি? নতুন প্রজন্মের কাছে কি আমরা পিতা মুজিব সম্পর্কে জানাতে পেরেছি? বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সংগঠন কি সে দায়িত্ব পালন করছে?


শত প্রশ্ন আজ একবিংশ শতাব্দিতে এসে আমাদের মনে জাগে। আমি মনে করি সে দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি আমরা। তাই তো এখনো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে সাহস পাচ্ছে অনেকে। এখনো একটি পক্ষ পিতা মুজিবকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হীনতায় ভোগে। এখনো স্বাধীনতার ঘোষক বা জনক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এখনো পিতা মুজিবকে নিয়ে বিভ্রান্ত তথ্য প্রচার করে যাচ্ছে। এদেশে ’২১ আগস্টের মতো ঘটনা ঘটেছে। এখনো স্বাধীন দেশের বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আদালত উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। তাহলে বুঝতে হবে স্বাধীনতার মর্ম আমরা যেমন বুঝতে অক্ষম হয়েছি, তেমনি জাতির পিতার আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেও ব্যর্থ হয়েছি।


প্রতি বছর আগস্ট এলে বাঙালি জাতির শোকের মাস শুরু হয়। পুরো একটি মাস জাতি শোকের ছায়ায় পিতা মুজিবকে স্মরণ করেন। মুজিব তো একদিনে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেননি। ১৯২০ সালে ১৭ মার্চ টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান আর সায়েরা খাতুনের ঘরে আলো করে আসেন শেখ মুজিব। গ্রামের মিয়া ভাই থেকে পিতামাতার খোকা ধীরে ধীরে সবার প্রিয় মুজিব ভাই হয়ে উঠেন। আর সে মুজিব ভাইয়ের হাত ধরে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর আমরা একটি লাল সবুজের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু নতুন প্রজন্ম কি জানে এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় দীর্ঘ ১৪টি বছর জেলের অন্ধকারে কাটিয়েছেন তিনি। এ স্বাধীনতা পেতে কত তাজা প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে ? এ জাতির মুক্তির জন্য ভয়কে উপেক্ষা করে বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন। কিন্তু কখনো স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করেননি। তিনি কতটা আপসহীন ছিলেন সেটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজের বক্তব্যে।


ছোট বেলার একটি ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সকাল ৯টায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরও অনেককে গ্রেফতার করে ফেলেছে। আমাদের বাড়িতে কি করে আসবে-থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা করছিল! প্রায় ১০টার সময় টাউন হল মাঠের ভেতর দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তার উদ্দেশ্য হল আমি যেন সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাতো ভাই, মাদারিপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করত, সে আমাকে বলে মিয়াভাই পাশের বাসায় একটু সরে যাও না। বললাম যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছ’। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃষ্টা নং-১২)।


২৫ মার্চ তাকে গ্রেফতার করার বিষয় সম্পর্কে মার্কিন সাংবাদিক ডেভিডি ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন-


ফ্রস্ট: আপনি তো কলকাতা চলে যেতে পারতেন।


শেখ মুজিব: আমি ইচ্ছা করলে যে কোনো জায়গায় যেতে পারতাম। কিন্তু আমার দেশবাসীকে পরিত্যাগ করে আমি কেমন করে যাব? আমি তাদের নেতা। আমি সংগ্রাম করব। মৃত্যুবরণ করব। পালিয়ে কেন যাব? দেশবাসীর কাছে আমার আহবান ছিল তোমরা প্রতিরোধ গড়ে তোল। সূত্র-স্বাধীনতার বিপ্লবী অধ্যায়-বঙ্গবন্ধু ও অন্যন্য, পৃষ্টা-১৭২।


অথচ আজ ২০২১ সালে এসে আমাদের শুনতে হচ্ছে বঙ্গবন্ধু পালিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। গোপনে রাজনীতি ও গোপন বৈঠক করতে কক্সবাজারের অজপাড়া গ্রাম ইনানীতে এসেছিলেন। যে গল্পটি ২০১০ সাল থেকে প্রচার করা হয়েছে। অপপ্রচারের গল্পে বলা হয়েছে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর বঙ্গবন্ধু পালিয়ে আত্মগোপনে এসেছেন ইনানীর চেংছড়িতে। আরেকটি গল্পে বলা হয়েছে ‘ইনানীতে গোপন বৈঠক করতে’ এসেছিলেন।


বঙ্গবন্ধু যে পালিয়ে রাজনীতি করতেন না সেটি আরো দৃঢ়ভাবে প্রতীয়মান হয় তার নিজের লেখাতেই। একবার পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুকে খবর পাঠিয়েছিলেন। সেসময় তিনি আত্মগোপনে না যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।


অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন ‘তাঁকে (ভাসানী) জিজ্ঞেস করা দরকার, তিনি কেন আমাকে গ্রেফতার হতে নিষেধ করেছেন? আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ আমি গোপনে রানজীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না। মওলানা সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার, কেন পালিয়ে বেড়াব? সূত্র-অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্টা -১৩৪।


কক্সবাজারে ইতিহাসের নামে প্রচার করা গল্প নতুন প্রজন্মকে যেমন বিভ্রান্ত করেছে তেমনি বঙ্গবন্ধুর আপসহীন চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রকৃত ইতিহাসের সাথে প্রচারিত কথিত ইতিহাসের কোনো সত্যতা নেই। প্রকৃত ইতিহাস বলছে ‘১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে ৬টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। তাহলে কার ইশরায় বা কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এমন একটি মনগড়া গল্প প্রচার করা হয়েছিল তা বোধগম্য নয়।


অনেকের মতে, অন্যজনের দখলীয় সরকারি জমি দখল করতে কাল্পনিক ইতিহাস রচনা করেছেন। অনেকে আবার তারেক জিয়ার গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এমন অপপ্রচার বলে মনে করেন। তবে সত্যমিথ্যা যাই হোক বঙ্গবন্ধুর নামে অপপ্রচার করা সব কাল্পনিক ইতিহাস বন্ধ করে প্রকৃত ইতিহাস প্রচার করতে হবে।


আমি দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর নামে অপপ্রচার কথিত আত্মগোপনের ইতিহাস বন্ধের আন্দোলন করে আসছি। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রায় সব স্থানে বিষয়টি আলোচনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর চরিত্র হননের ইতিহাস বন্ধে কেউ এগিয়ে আসেনি।


এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত ইতিহাসের নামে গল্পটির প্রচার বন্ধ করে প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।


লেখক: সাবেক সভাপতি কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com