চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২১, ১৭:২৭
চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল
মুহাম্মদ সামাদ
প্রিন্ট অ-অ+

এক.


চীনের চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল ২০১৫-এ অংশ নেয়ার সাথে কলকাতার ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এর যোগসূত্রের কথা একটু বলে নিতে হবে। কবি আশিষ সান্যাল-এর পৌরহিত্যে২০০৭ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কলকাতার ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হয়।পৃথিবীর বহু দেশের বিখ্যাত কবিরা এসেছেন কলকাতার পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যালে। ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশ থেকে সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, মাহবুব সাদিক, আসলাম সানী, তারিক সুজাত, মহফিল হক, মাহমুদ কামালসহ অসংখ্য কবি তার আমন্ত্রণে অংশগ্রহণ করেছেন। সদা বিনয়াবনত আশিষদা নিজে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে আমন্ত্রিত কবিদের অভ্যর্থনা করতেন। আমন্ত্রিত হয়ে আশিষদাও বাংলা কবিতাকে নিয়ে গেছেন অনেক দেশের কবিতা উৎসবে। আমাদের জাতীয় কবিতা উৎসবসহ দীর্ঘ সময় ধরে আশিষদা নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশের নানা প্রান্তে অগণিত উৎসবে-অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন। আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করে কৃতার্থ করেছেন। আশিষদা এখন জীবনসায়ান্নে। গত পরশু দিন ফোনে দুর্বল কণ্ঠেও আমার স্ত্রী রীমার হাতের কইমাছ ভাজার তারিফ করলেন। কলকাতার ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এর কবিতাপাঠ ও সেমিনার-ওয়ার্কশপে অন্যান্যদের মধ্যে আশিষদার একজন শক্ত সহযোগী বিশিষ্ট বামপন্থী অবাঙালি লেখক-বুদ্ধিজীবী শ্রী গীতেশ শর্মার শুভ্র শশ্রুমন্ডিত প্রাণময় ছুটাছুটি; ইংরেজিতে অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় টেলিভিশনের খবর পাঠক আশিষকন্যা দুর্বা ভট্টাচার্যের সদা প্রফুল্ল হাসিমুখ আর প্রিয়বন্ধু কাজল চক্রবর্তীর হইচই সব সময় আমার চোখে ভাসে।


আশিষদা’র স্নেহমাখা আমন্ত্রণে ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে পরপর তিনটি ফেস্টিভ্যালে অংশ নিয়ে অনেক কবি ও কবিতার সঙ্গে পরিচয় এবং কয়েকজন কবির সঙ্গে বন্ধুত্ব লাভের সৌভাগ্য হয় আমার। ২০১২ সালে সার্বিয়ার প্রখ্যাত কবি দ্রগান দ্রাগোইলভিচ-এর নেতৃত্বে উৎসবে অংশ নেয়া সার্বিয়ান কবি-প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং পরে সুইডেন প্রবাসী লেখক আনিসুর রহমানের সূত্রে দ্রগানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। আমরা ইংরেজি থেকে নিজ নিজ ভাষায় পরস্পরের কবিতাও অনুবাদ করেছি। ২০১৩ সালের সপ্তম ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল আশিষ দা আমাকে দিয়ে উদ্বোধন করিয়েছেন। গ্রিসের কবি ক্লিওপেট্রা লিবেরির সঙ্গে পরিচয় আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি জ্যামি প্রক্টর শ্যু’র সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল আমার জন্যে সে বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য-দর্শনের সূতিকাগার গ্রিস দেশের কবি ক্লিওপেট্রা লিবেরি আমার আটটি কবিতা গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করে আশিষদার মাধ্যমে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। গ্রিক অক্ষরে নিজের কবিতা দেখে খুব আনন্দিত ও অবিভূত হয়েছি। ২০১৫ সালে চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এ যোগ দিয়ে গ্রিক কবিদের কাছে শুনেছিÑক্লিওপেট্রা লিবেরি গ্রিসের খুব খ্যাতিমান কবি।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি জ্যামি প্রক্টর শ্যু চীনা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে এখন নিজের কাব্যচর্চা আর চীনের কবি-অনুবাদকদের সঙ্গে চীন ও অন্য দেশের সাহিত্য-অনুবাদ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কলকাতায় নতুন অতিথি। পথ-ঘাট তাঁর অচেনা। গীতেশ শর্মার সাথে ওর সাক্ষাতের সময় স্থির করা ছিল। এক সঙ্গে প্রাতরাশ সেরে কিড স্ট্রিটের এমএলএ হোস্টেল থেকে হাঁটা পথে কলকাতা নিউমার্কেট সংলগ্ন জওহরলাল নেহেরু রোডে গীতেশ শর্মার বাড়িতে যাওয়া-আসার পথে জ্যামির সঙ্গে কথা হয়। বিকেলে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে আমরা পাশাপাশি বসি। সে বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। ওকে বলি পঁচিশ কোটির অধিক বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে ১৭ কোটির বসবাস বাংলাদেশে। কথায় কথায় আমি তাকে আমাদের জাতীয় কবিতা উৎসবে যোগদানের জন্যে আমন্ত্রণ জানালে সে তাৎক্ষণিকভাবে সম্মতি জানায় এবং ২০১৪ সালের কবিতা উৎসবে যোগ দিয়ে আশাতীত আনন্দে কয়েকদিন ঢাকায় কাটিয়ে যায়। সেই থেকে জ্যামি আমার চিরশুভার্থিনী।


২০১৪ সালে কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশন মিলনায়তনে ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এর উদ্বোধন করেন কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমরা বিভিন্ন দেশ ও ভাষার কবিরা কবিতা পাঠ করি। সেদিন বাড়তি আকর্ষণ ছিল সুচিত্রাকন্যা অভিনেত্রী মুনমুন সেনের উপস্থিতিতে হৃদয় জয় করা বাংলা চলচ্চিত্রের অমর অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের চিরায়ত রূপ ও অনুপম দেহবল্লরী নিয়ে রচিত নির্মলেন্দু গুণের একটি ব্যতিক্রমী কবিতাপাঠ। মায়ের জন্মভূমি বাংলাদেশের কবিদের কবিতা শোনার জন্যে মুনমুন সেনের উন্মুখ আগ্রহ ও অনুষ্ঠানে সহজ আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়ে আমি তাঁকে আমার সিলেক্টেড পোয়েমস্উপহার দিই।


দুই.


২০১৫ সালের ২০শে জানুয়ারি চীনের পঞ্চম চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যালআয়োজক কমিটির চেয়ারম্যানকবি চিতি মাচিয়া স্বাক্ষরিত এক আমন্ত্রণপত্র আসে। কয়েকদিন পরে জ্যামিরইমেইল পাই। জ্যামি জানায়Ñ চিংহাই উৎসবে সে আমার নাম প্রস্তাব করেছে; উদ্যোক্তারা যদি আমাকে আমন্ত্রণ করেন আমি যেন সম্মতি জানাই। উৎসবের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ৬ থেকে ১১ই আগস্ট ২০১৫ সাল। কাছাকাছি সময়ে ল্যাটিন আমেরিকার নোবেল বিজয়ী লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ-এর দেশ কলম্বিয়ায় একটি সম্মেলনে যোগদানের জন্যে আমার দাওয়াত ছিল। আমি কবিতাআর জ্যামির প্রস্তাবকে প্রাধান্য দিয়ে চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এ যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই।


আমন্ত্রণপত্রে জানানো হয়েছে যে, ২০০৭ সাল থেকে চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল আরম্ভ হয়েছে। বিগত চারটি উৎসবে পৃথিবীর ৬০টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ৯০০জন কবি উৎসবে যোগ দিয়েছেন। আমার অবাক লাগে। এত দেশ, এত অঞ্চল, এত কবি আর কত কবিতা! লক্ষ করলাম ১৯৮৭ সাল থেকে অনুষ্ঠিত আমাদের জাতীয় কবিতা উৎসবের প্রতি বছরের মর্মবাণীর মতোন চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এরবিগত চারটি উৎসবের মর্মবাণী বা মেনিফেস্টো ছিল: ১.


1. Let Mother Nature be deeply revered; 2. Let lifein all shape loose and free; 3. Let civilization be held in genuine sanctity; 4. Let poetry once again take root in human heart. এবারের পঞ্চম উৎসবের মেনিফেস্টো সাবস্ত্য হয়েছে: Innovation of Poetic Language and Structure of Modern Poetry; এবংএই একই শিরোনামে একটি নিবন্ধ রচনা করে ৩০শে মে তারিখের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে।আমি ভাবি, কনফুসিয়াসের কঠোর শৃংখলা ও মা সে তুং-এর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর আবর্তে বসবাসে অভ্যস্ত চীনা কবিদের মুক্তির কী আকুল আকুতি! তারা মাতৃসমা উদার প্রকৃতির কোলে গভীরতম শ্রদ্ধায় অবনত হতে চায়; সম্পূর্ণ বন্ধনহীন ও মুক্ত জীবন চায়; সভ্যতার বিশুদ্ধ পবিত্রতা কামনা করে; পুণর্বার কবিতাকে নিয়ে যেতে চায় মানব হৃদয়ের মর্মমূলে; আর তাই উদ্ভাবন করতে চায় আধুনিক কবিতার নতুন ভাষা ও কাঠামো। বলতে দ্বিধা নেই চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতা তো ভিন্ন কথা বলে। তবু বাঙালি কবির হৃদয় আনন্দে নেচে ওঠে বৈকি!


যাই হোক, ৫ই আগস্ট ২০১৫ তারিখ দুপুরে ঢাকা থেকে চায়না ইস্টার্নের বিমানে রওনা দিয়ে কুনমিং হয়ে রাতে বেইজিং বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। দেখলাম প্ল্যাকার্ড হাতে চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এর অনেক কর্মী বিমানবন্দরে ছুটোছুটি করে নানান দেশের কবিদের অভ্যর্থনা জানিয়ে এক জায়গায় জড়ো করছেন। মনে হল সামান্য ব্যবধানে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যাত্রীদের সঙ্গেকবিদের নিয়ে একাধিক ফ্লাইট একসঙ্গে নেমেছে। আমিও ঝাঁকের কইয়ের মতো অন্য কবিদের সঙ্গে মিশে গেলাম। তারপর নারী-পুরুষ মিলিয়ে আমাদের বিশ-পঁচিশ জনের মতো কবিকে হোটেলের উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমান বাসে তুলে দেয়া হলো। বিচিত্র পোশাক-আশাক, কথা-ভাষা, গায়ের রঙ আর নানান বয়সের কবিদের সহযাত্রী হয়ে যুগপৎ পুলকিত ও বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। দীর্ঘ ভ্রমণের ধকলে অনেকের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। বেইজিংয়েজিঙ্গুচিলং হোটেলে রাতের আহার সেরে বিশ্রাম ও পরদিন দুপুর ১২টায় আবার বিমানে করে চিংহাই যাত্রা। আমাদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন মিজ. জোয়ান্না।


বেইজিং থেকে যাত্রা করে বিকেল তিনটার একটু আগে আমাদের বিমান চিংহাইয়ের পাহাড়-ঘেষা জিনিং এয়ারপোর্টের রুক্ষ মাটি স্পর্শ করলো। ছোট্ট নিরাভরণ এয়ারপোর্ট। মানুষজন নেই বললেই চলে। বাসে করে আমাদের চিংহাই প্রদেশের রাজধানী শহর জিনিং-এর চিংহাই হোটেলে নিয়ে যাওয়া হলো। উৎসবের অতিথিদের জন্যে পাশে শেংলি হোটেলও নেয়া হয়েছে। বিরাট-বিশাল হোটেল। আমার জন্যে নয় তলায় একটি সুপারিয়র ডাবল রুমের ব্যবস্থাকরা হয়েছে। বেইজিং থেকে সকালে গোসল সেরে এসেছি। তাই হাত-মুখ ধুয়ে বিশ্রাম নিলাম। সন্ধ্যায় রাতের খাবার খেতে নিচে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়েছি। এমন সময় জ্যামির আগমন। আমি আসায় জ্যামি খুব উল্লসিত। জ্যামি আজ সুন্দর করে সেজেছে। খোঁপায় পড়েছে একটি অপূর্ব লাল চীনা ফুল। এই আমেরিকান রমণীকে আমি প্রথম মোহনীয় রূপে সাজে দেখলাম। জ্যামি আমাকে উৎসব কর্মসূচির খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। রাত ন’টার পরে আমার চীনা অনুবাদক কবি ইয়াং জংজি এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। খুব সাদাসিধে সহজ-সরল মানুষ। ইয়াং জংজি সস্ত্রীক এসেছেন। জংজির সঙ্গে গল্প করে খুব ভালো লাগল। তিনি জানালেনÑ এ বছর ৮১টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ১৪১জন কবিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। চীনের কবিরা তো রয়েছেনই। বিদেশী কবিদের জন্যে চিংহাই আসা-যাওয়ার পথে দুই রাত বেইজিংয়ে হোটেলে অবস্থান, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান ভাড়াÑ এমন কি উৎসব কমিটির খরচে কিছু কবির জন্যে তাদের দেশে বসবাসরত চীনা তরুণ-তরুণীকে দোভাষী হিসেবে আনা হয়েছে। কবি ও কবিতার এত বড় আয়োজন চীনে আর কখনো হয় নি। প্রাচীন কাল থেকেই চীন কবিতার দেশ। এখন নানান ভাষায় নতুন কবির সংখ্যা ও কবিতার পরিমাণ প্রচুর; কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীদের কবিতার প্রতি ভালোবাসা দিন দিন বেড়েই চলেছে; তারা এখন প্রাচুর্যের চলতি পথে হৃদয়ের কথাও বলতে ব্যাকুলÑ জংজির ভাষ্য। পরের দিন সকালে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা হবে বলে আমরা রাতের মতো আলোচনা শেষ করলাম।


৭ই আগস্ট শুক্রবার সকালে পাশেই শেংলি হোটেলে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিলাম। রঙ-বেরঙের চীনা ভাষার ক্যালিওগ্রাফি আর ফুলে ফুলে সাজানো কবিতার মতোই অপরূপ সুন্দর মঞ্চে চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কবি চিতি মাচিয়ার সভাপতিত্বে ওজ্যামি প্রক্টর শ্যু’রসঞ্চালনায় অনুষ্ঠান শুরু হলো। চিংহাই প্রদেশের একজন মন্ত্রী বিনা বাক্য ব্যয়ে একটি লাল ফিতা কেটে উৎসবের উদ্বোধন করলেন। বিভিন্ন দেশের বিচিত্র সাজ-পোশাক-পরা মিলনায়তন ভরাকবিরা করতালি দিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়লেন। প্রথম অধিবেশনেই আমার বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ হলো। আরও কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি বক্তৃতা করলেন। সবাই ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে; উৎসবের সফলতা কামনা করে; আর উৎসবের মূল থিমÑ আধুনিক কবিতার ভাষা, বিষয় ও কাঠামোকেআরও জীবন ও প্রকৃতি ঘনিষ্ঠ করার আশাবাদ আর অঙ্গীকার ব্যক্ত করে দু’চার মিনিটে তাঁদের কথার সমাপ্তি টানলেন।সভাপতির ভাষণ দিলেন কবি চিতি মাচিয়া।


নানান ভাষার এত কবি একসঙ্গে জীবনে কেউ কখনো দেখে নি। কারো পক্ষে দেখা সম্ভবও নয়। আমি অপরিচিত জনের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে বরাবরই লাজুক। তবু উৎকট ভাষা সমস্যার কারণে চীন ও আরও কিছু দেশের কবিদের সঙ্গে কবিতারএই বিশ্বসভায় কথা বলতে পারছিলাম না। আমার অবস্থা তখন হাতের কাছে ভরা কলস লালন মরে জল পিপাপসার মতোন। ল্যাটিন আমেরিকার কবিরা স্প্যানিশ, রাশিয়ানরা রুশ, মঙ্গোলিয়ানরা নিজের আর চীনা ভাষায় অভ্যস্ত। লাল টকটকে চেহারার লুক্সেমবার্গের কবি জ্যঁ পোরতঁত(ঔবধহ চড়ৎঃধহঃব)-এর সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি সব সময় কালো পোশাকের ওপর ঘাড়ের দুই দিকে নামানো লম্বা মাফলারের মতো লাল উত্তরীয় পরেন। জ্যঁ পোরতঁত প্যারিসে বাস করেন। মজার বিষয় হলো জ্যঁ পোরতঁত লুক্সেমবার্গের জাতীয় সাহিত্য পুরস্কারের সমতুল্য ব্যাটি ওয়েব প্রাইজ পাওয়ায় পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই আমন্ত্রণ পান না কেন রেওয়াজ অনুযায়ীসরকারকে তাঁর ব্যয়ভার বহন করতে হয়। সোভগ্যবান কবি জ্যঁ পোরতঁত। শত ব্যস্ততার মধ্যেও জ্যামি আর জংজি আমার খোঁজ-খবর রাখতে সদা তৎপর। জ্যামি তাঁর দেশের এক দীর্ঘদেহী ও বিশাল গুম্ফধারী প্রবীণকবি জ্যাক হার্শম্যান (ঔধপশঐরৎংপযসধহ)-এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। তিনি গত বছর চতুর্থ উৎসবে ‘গোল্ড তিব্বেতিয়ান অ্যান্টেলোপ অ্যাওয়ার্ড ফর পোয়েট্রি’ শীর্ষক পুরস্কার অর্জন করেছেন। তিনি আর রাশিয়ার আরেক প্রবীণ কবি আলেক্সান্দর খুশনের (অষবীধহফবৎ কঁংযহবৎ)সস্ত্রীক এসেছেন। বিশেষ করে খাবার সময় জ্যাক হার্শম্যন, তাঁর স্ত্রী অ্যাগনেতা আার আলেক্সান্দরের স্ত্রী ইলিনাতাঁদের টেবিলে আমাকে ডেকে নিয়ে একত্রে বসেন। অশীতিপর জ্যাক হার্শম্যন উচ্ছল, হাসিখুশি; মজা করতে ভালোবাসেন। অ্যাগনেতা স্বল্পবাক ও নম্রসম্র নারী। আলেক্সান্দর ও ইলিনাখুব সুন্দর ইংরেজি বলেন।আলেক্সান্দর পোশাক-আশাকে পরিপাটি আর কথাবার্তায় সংযত মানুষ। অন্যদিকে ইলিনা মিশুক ও যতœশীল এক অবিভাভিকা। এঁদের অকৃত্রিমস্নেহ-মমতায় আমার দিনগুলো খুব ভালো কেটেছিল।কবি জ্যাক হার্শম্যান ও আলেক্সান্দর খুশনের যথাক্রমে আমেরিকা ও রাশিয়ার বর্তমান সময়ে প্রধান কবি। যে কেউ ইন্টারনেটে সার্চ করলে তাঁদের কবিতা ও কবিতাপাঠ উপভোগ করে ঋদ্ধ ও আনন্দিত হবেন। এমন দু’জন শক্তিমান ও খ্যাতিমান কবির সান্নিধ্য-লাভ আমার জন্যে সৌভাগ্যের বৈকি!


শেংলি হোটেলে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতার করার সুবাদে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও আমি তাৎক্ষণিক অনেকের দৃষ্টিতে এলাম।অনুষ্ঠানের পর স্থানীয় পত্রিকার দুই তরুণী সাংবাদিক ভিকি ও লিসিউৎসব সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চাইলেন। জানালামÑ সারা পৃথিবীর কবিদের এমন মিলনমেলায় এসে আমি খুব আনন্দিত ও গর্বিত বোধ করছি।সবকিছু গোছানো, ছিমছাম আর খুব সুন্দর বলেযথারীতি আরও কিছু কথা বলে দিলাম। পরদিন পত্রিকায় ছবি দিয়ে আমার সাক্ষাৎকার বেরোলো। চীনা অক্ষরের ঝকঝকে সুন্দর ছবির বাহার দেখলাম বটে কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না। পরের তিন দিনও ভিকি আর লিসি আমাদের সঙ্গে থেকে উৎসব কভার করেছে।


সন্ধ্যায় চিংহাই হোটেলের ইঙবিন হল-এ অভ্যর্থনা-ভোজ অনুষ্ঠানে প্রথমে এগিয়ে এসে কুশল বিনিময় করলেন ইরানের কবিরা।আমি হাফিজ, রুমী, ফেরদৌসি আর শেখ সাদির কবিতা বাংলা অনুবাদে পড়েছি বলে জানালাম। ইতিমধ্যে তাঁরা তিনজন কয়েক ক্যান করে বিয়ার সাবাড় করে দিলেন। ইরানের কবিরা আমার সাত্ত্বিক আচরণে অবাক হয়েছেন। আমাকে সামান্য সামুদ্রিক মাছ, বিফ ও মাটন কাবাবের সঙ্গে পোলাও, সালাদ আর টকদই নিতে দেখে বিয়ার যে মুসলমানের জন্যে হালাল ও স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী তা বারবার বুঝালেন। ভোজ অনুষ্ঠানেল্যাটিন আমেরিকার বেশ কয়েকজন কবির সাথে পরিচয় হলো। এখানে কে যে বিখ্যাত, কে যে অখ্যাত বুঝার উপায় নেই।সবাই নিজেদের মধ্যে নিজেদের নিয়ে মশগুল। পান-আহার আর ছবি তোলায় ব্যস্ত।


পরদিন ৮ই আগস্ট ২০১৫ তারিখ সকালে ছিল চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এর মূল পর্ব। ভোরে চীনের ও বিদেশী কবিদের পাঁচটি বাস, মেডিকেল টিম ও সাংবাদিকদের গাড়ির বহর নিয়ে ‘চিংহাই লেকপোয়েট্রি স্কোয়ার’-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করা হলো।পোয়েট্রি স্কোয়ার জিনিং শহর থেকে গড়ে আড়াই ঘণ্টায় পথ। বাংলাদেশের পিকনিকের মতো ইউরোপ-আমেরিকা-এশিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর ল্যাটিন আমেরিকার কবিদের পাউরুটি, কলা ও সিদ্ধ ডিম দিয়ে পথে সকালের নাস্তা সারতে হলো। আমি তো এই নাস্তায় অভ্যস্ত। জাত কবির বহর। সবাই আনন্দে সকালের নাস্তা চলতি পথে খেয়ে নিল। শহর ছাড়িয়ে যেতেই পথের দুপাশে ছোট-বড় পাহাড়ের পাদদেশেমাইলের পর মাইল রাই-সরিষার ক্ষেত আর পশুচারণ ভূমি।বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চরছে লম্বা লোমে আবৃত শত শত মেষের আর গরুর পাল। আকারে ছোট ভিন্নজাতের এই গরুগুলোর দেহে থেকে পেটের দিকে লম্বা লোম ঝুলে আছে। দূরে সবুজ পাহাড়ের গায়ে ও মাথার আশপাশে সাদা-কালো মেঘের ওড়াওড়ি। কালো মেঘ এগিয়ে এলেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে। পথে এক জায়গায় বাস-গাড়ির বহর থামানো হলো। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা। মোটা পলিথিন আর ত্রিপাল মোড়ানো ছোট্ট চালাঘর তৈরি করে পথের দুপাশে মধু, চা-বিস্কুট ও কোমল পানীয়ের অস্থায়ী কিছু দোকানপাট বসানো হয়েছে। আদিবাসী পাহাড়ি নারী-পুরুষ-বাচ্চারা মিলেসরষে থেকে মধু সংগ্রহ করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করছেন। মধুর রঙ একদম সাদা এবং প্লাস্টিকের ক্যানে তা জমে ডালডার মত হয়ে আছে। সুইডেনের কবি বেঙ্ত বার্গ দুই ক্যান মধু কিনলেন। কেউ কেউ সামান্য পয়সার বিনিময়ে ঘোড়ায় চড়ে আনন্দ করলেন। জমকালো পোশাকে সানগ্লাসপরা এক জাপানি কবি ঘোড়া থেকে নেমে কেন জানি না হঠাৎ আমাকে খুব উৎসাহিত করলেন ওতাঁর ভাড়া করা ঘোড়ায় চড়িয়ে আমাকে ক্যামেরা বন্দি করলেন।ভদ্র মহিলার আনন্দের আতিশয্যে জীবনে সেই আমার প্রথম ও শেষ অশ্বারোহণ। এবার আয়োজক কর্মকর্তা হুয়াং শাওঝেং ও ট্র্যাভেল গাইড মা জিয়ানমিংয়ের ডাকে সবাই হুড়মুড় করে বাসে চড়তে লাগলো।


চিংহাই চীনের বৃহত্তম লেক বা সরোবর। তিব্বতীয় মালভূমিতে অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নোনাজলের এই লেকের উচ্চতা ১০ হাজার সাড়ে ৫০০ ফুট। জলের উপরিভাগের আয়তন ৪৩১৭ বর্গ কিলোমিটার বা ১৬৬৭ বর্গ মাইল।জলের গড় গভীরতা ৬৯ ফুট। এখানে বছরের গড় তাপমাত্রা থাকে ৯.৭ থেকে মাইনাস ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নামের মর্মার্থে এটি নীল-সবুজের সমুদ্র। সকাল থেকে রাতের মধ্যে একাধিকবার তাপমাত্রা ওঠানামা করে। তিব্বতি জনগোষ্ঠীর জন্যে চিংহাই একটি পবিত্র সরোবর। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ আমরা পোয়েট্রি স্কোয়ারে পৌঁছলাম। তখন পাতলা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। বিশাল নীল জলের চিংহাই হ্রদের তীরে মনোরম পরিবেশেঘন ঘাস বিছানো সবুজ চত্বরে নির্মিত হয়েছে এইপোয়েট্রি স্কোয়ার। চিংহাই লেক পেছনে রেখে একটি উঁচু দেয়াল দাঁড় করিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিরাট মুক্তমঞ্চ। মঞ্চের দেয়ালের দুই পাশে চিকন রেখায় হালকা করে দু ফু, চু ইউয়ান, হোমার, দান্তে, গ্যেটে,শেকসপিয়োর, পুশকিন, ওমর খৈয়াম, রিলকে, রবীন্দ্রনাথ, এলিয়ট, ইয়েটস, ওয়াল্ট হুইটম্যান, ল্যাঙ্গস্টন হিউজ, খলিল জিবরান, নাজিম হিকমাত, সেঙ্ঘর,মাহমুদ দারবিশ প্রমুখ কবির মুখমণ্ডল আঁকা। কাছে গিয়ে না দেখলে পরিচিতি বোঝা কষ্টকর। আর সবুজ খোলা মাঠের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছেন উঁচু-উঁচু কালো পাথরে নির্মিত পৃথিবীর মহৎ কাব্যের প্রধান চরিত্রেরা। যেমনÑ খোলা তরবারি উঁচিয়ে যুদ্ধের ভঙ্গিতে হোমার সৃষ্ট ইলিয়াড-এর মহাবীর অ্যাকিলিস; তীর-ধনুক হাতে ব্যাসদেব রচিত মহাভারত-এর বিশ্ব শ্রেষ্ট ধনুর্ধর অর্জুন; অবনত মস্তকে ডেসডিমোনার কাছে পাণি প্রার্থী শেকসপিয়েরের বীর ওথেলো; আর, বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের যুদ্ধরত রাবণকে এখানে দেখে আনন্দে পুলকিত হয়েছি।


আজ সকালে পোয়েট্রি স্কোয়ারে ‘গোল্ড তিব্বেতিয়ান অ্যান্টেলোপ অ্যাওয়ার্ড ফর পোয়েট্রি’শীর্ষক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মুষলধারে ভারী বৃষ্টির বাধায় পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত করে দুপুরের খাবার খেয়ে লেকেপাড়ে উত্তপ্ত বালুদ্বীপে বেড়ানো হলো। কেউ চাইলে গাধা, ঘোড়া বা উটের পিঠে চড়ে বালুদ্বীপ বেড়াতে পারেন। মাথার উপরে খাড়া সূর্যের প্রচ- আলোর বিকিরণ। আয়োজক কমিটি যার যার দেশ থেকে সানগ্লাস নিয়ে যেতে বলে দিয়েছিলেন। এবার তার সদ্ব্যবহার হলো। বালুদ্বীপ দেখে লেকেরপবিত্র পানিতে পা চুবিয়ে পুণ্য অর্জন করে সূর্য ডুবে যাওয়ার বেশ খানিকটা আগে আমরা হাইবেই নামকস্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলেআদিবাসীদের গাঁয়ে পৌঁছলাম। সন্ধ্যায় এখানে কবিতা পাঠের আসর বসবে।


চারিদিকে সবুজ গাছগাছালি আর শস্যের প্রান্তর বেষ্টিত এই আদিবাসী গাঁয়ের পাশেএকটি সুন্দর হোটেলের সামনে আমাদের নামানো হলো। তখনো সন্ধ্যা নামে নি। হোটেল থেকে সামান্য দূরে ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে কাঠের পাটাতন বসানো পথে খানিকটাএগোলে কাঠের তৈরি একটি রঙচঙে মন্দির। মন্দিরের দরজা খোলা। কৌতুহলবশত আমি ভিতরে ঢুকলাম। দেখলাম কিম্ভুতকিমাকার একটি বড় মূর্তিকে ঘিরে কিছু ছোট মূর্তি। কলা, শস্য ও অন্য ফলফলান্তি দিয়ে পূজারী পুজো করে গেছেন। পাশেই কবিতাপাঠের উঁচু মঞ্চ সাজানো হয়েছে। সন্ধ্যার পরপর বনফায়ার বা অগ্নুৎসবের মধ্যে দিয়ে কবিতাপাঠ আরম্ভ হলো। এই আদিবাসীরা দীর্ঘদেহী, নাক খাড়া ও চোখ আমাদের মতো সাধারণ আকৃতির। মাথা থেকে পা পর্যন্ত চামড়ার লম্বা অলেস্টর গায়ে। চারিদিকের ঘন কালো অন্ধকারের মধ্যে আগুন যেন আকাশ ছুঁতে চায়। বারবার লবন মেশানো চা পরিবেশিত হচ্ছিল। এত বড় ও উঁচু অগ্নিকু-ের পাশে বসে ঠাণ্ডার প্রকোপ টের পাচ্ছিলাম না। এমন সময় কবিতাপড়ার জন্যে জ্যামির ডাক পড়লো। জ্যামি কোন রকমে একটি কবিতা পড়ে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললোÑ সামাদ, কোল্ড, সো কোল্ড! এখানে আমার কবিতাপাঠ ছিল না। আমেরিকান মেয়ে জ্যামির অই অবস্থা হলে আমি তো ঠাণ্ডায় জমে যেতাম। অনুষ্ঠান শেষে তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে দৌড়ে বাসে ওঠার সময় আমার পা প্রায় অবশ হয়ে গিয়েছিল।


পরের দিন ঢিলেঢালা সকালে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ৬০০ বছরের পুরনো ‘দ্যান গিয়ের অ্যানসিয়েন্ট সিটি’তে। চিংহাইয়ে পর্যটকদের বড় আকর্ষণ এখন এই প্রাচীন শহর। দু’পাশে সারিবদ্ধ একতলা-দোতলা বহু পুরনো স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বাড়ি-ঘরের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া দীর্ঘ এক উঠোন এখন পর্যটকদের চলাফেরা ও কেনাকাটার জন্যে উম্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ বাড়ির সামনের অংশে দোকানপাট, মাঝখানে নানান কুটীর শিল্পের কারখানা আর পেছনের অংশে বা দোতলায় বাসস্থান। তিব্বতি ছুরি-চাকু-তরবারি থেকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, পশমিনা শাল, চামড়ার জ্যাকেট আর সুন্দর সুন্দর চুরিমালা ও গয়নাগাটির পসার জমিয়ে বসেছেন শহরের বাসিন্দারা। এই প্রাচীন শহরের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী রেস্তোঁরায় দুপুরের খাবার খেয়ে আমাদের মূল ঠিকানা জিনিং শহরের চিংহাই হোটেলে ফিরে আসি।


১০ই আগস্ট ২০১৫ তারিখ উৎসবের সমাপ্তির দিন। সকাল থেকেই কবিদের ভাগ ভাগ করে চিংহাই ও শেংলি হোটেলের কনফারেন্স কক্ষে এবং চিংহাই ইউনিভিার্সিটির একটি মিলনায়নে কবিতাপাঠের আসর বসানো হলো। আমার ভাগ্যে জুটলো চিংহাই ইউনিভিার্সিটির মিলনায়ন। আমাদের মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়া হলো। গিয়ে দেখি কবি-শিক্ষক-শিক্ষার্থীতে মিলনায়তন পরিপূর্ণ। ফেস্টিভ্যাল কমিটির চেয়ারম্যান চিতি মাচিয়া এবং আমেরিকা আর রাশিয়ার দুই প্রবীণ কবি যথাক্রমে জ্যাক হার্শম্যান ওআলেক্সান্দর খুশনের সামনের সারিতে বসা। কবিতাপাঠ, অনুরাগী শ্রোতা-দর্শকদের কৌতুহলী প্রশ্ন আর কবিদের উৎসাহপূর্ণ উত্তরে অনুষ্ঠানটি খুব প্রাণবন্ত হয়েছিল। বৃষ্টির বারণে পোয়েট্রি স্কোয়ারের স্থগিত পুরস্কার বিতরণ এখানে সম্পন্ন হলো। তুমুল করতালি আর উল্লাস ধ্বনির মধ্যে ‘গোল্ড তিবেতিয়ান অ্যান্টেলোপ অ্যাওয়ার্ড ফর পোয়েট্রি’গ্রহণ করলেন রাশিয়ার কবি আলেক্সান্দর খুশনের। আমিও এগিয়ে গিয়ে আলেক্সান্দর খুশনের ও ইলিনাকে অভিনন্দন জানালাম। আবেগঘন পরিবেশে উৎসবের সমাপ্তি-ঘণ্টা বাজলো এই হলঘরেই।


পরের দিন বাংলাদেশ, সুইডেন, গ্রিস, ল্যাটিন আমেরিকা, ডমিনিকান রিপাবলিকসহ কয়েক দেশের কবিদের ফ্লাইট ছিলবিকেলে। তাই সকালে আমরা ‘চিংহাই তিবেতিয়ান কালচার মিউজিয়াম’দেখতে যাই। তিব্বতের প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার এক ঐশর্য্যভরপুর এই জাদুঘর। স্বল্প পরিসরে উল্লেখযোগ্যের মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিদর্শনস্বরূপ এখানে রয়েছে তিব্বতী ভাষায় অস্টম শতাব্দিতে সংকলিতবিশাল বিশাল চিকিৎসাশাস্ত্রেরগ্রন্থ; মানুষের হৃৎযন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি; ৬৬টি ব্যবস্থাপত্র; ১৭০টি চিকিৎসা উপকরণÑ যার মধ্যে ১২৭টি এখনো চীনদেশে পাওয়া যায়। এ ছাড়া ৭৫৫ থেকে ৭৯৫ সাল পর্যন্ত ভারত, ইরান, গ্রিস, নেপাল ও প্রতিবেশী অঞ্চলসমূহের চিকিৎসাশাস্ত্রবিদদের অংশগ্রহণে সম্মেলন আয়োজনের দলিল-পত্র এই জাদুঘরে রয়েছে।প্রাচীন তাঁতেরকাপড় ও সিল্কের ওপর অঙ্কিত‘দি গ্রেট থ্যাঙ্কা অব তিবেতিয়ান আর্টস অ্যান্ড কালচার অব চায়না’শীর্ষক পৃথিবীর দীর্ঘতম বলে খ্যাত চিত্রকর্মটির জন্যে এই জাদুঘর বিখ্যাতÑ যেটির পূর্ণরূপ দিতে শিল্পীদের ২৭ বছর সময় লেগেছে। বৌদ্ধ দেব-দেবী, বিবাহ-উৎসব, ধ্যানস্থান, ভবচক্র ও পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চিত্ররূপের সমাহারেঋদ্ধ চিত্রকর্মটি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিনই বটে। ডমিনিকান কবি মেয়েটির আগ্রহে শাক্যপন্ডিতদের বাণী সম্বলিত চতুষ্পদী কবিতার সংকলন ‘ট্রাইলেঙ্গুয়াল শাক্য লেগশাদ (ঞৎরষধহমঁধষ ঝধশুধ খবমংযধফ)’ গ্রন্থটি কিনে হোটেলে ফিরে এলাম।


বিকেলে জিনিং থেকে রওনা হয়ে সন্ধ্যায় বেইজিং বিমানবন্দরে পৌঁছলাম।বেইজিংয়ে আবার সেইজিঙ্গুচিলং হোটেলে রাত যাপন ও পরদিন দুপুর ১:১০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা। এবার আমাদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন মিজ. ওয়াং।রাতে খাবার সময়এই চীনা তরুণী ওয়াং বোনের মতোনআমার পাশে দাঁড়িয়ে ওয়েটারকে দিয়ে আলাদা করে রাখা একটা পাত্রে মাছ, পাতিহাঁস ও গরুর মাংস আনিয়ে আমার সামনে দিলেন আর বললেন: তোমার নাম দেখে বুঝেছি তুমি মুসলমান। হায় রে ধর্ম, হায় রে খাদ্য!


তিন.


চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এরসময় চীনের কয়েকজন কবি আমার কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পড়তে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এতদিনে তাদের নাম ভুলে গেছি। সেই সময় সঙ্গে থাকা আমার তিন কপিসিলেক্টেড পোয়েমস্-এর এক কপি ইয়াং জংজিকে আর দুই কপি অন্য দু’জনকে দিই। ইমেইলেও দু’য়েকজনকে কবিতা পাঠাই। ২০১৫ সাল থেকে চীনের ইন্টান্যাশনাল পোয়েট্রি ট্র্যানসেøশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ চড়বঃৎু ঞৎধহংষধঃরড়হ ধহফ জবংবধৎপয ঈবহঃৎব) কর্তৃক প্রকাশিত দ্বিভাষিক দি ওয়ার্ল্ড পোয়েটস কোয়ারটারলি (ঞযব ডড়ৎষফ চড়বঃং ছঁধৎঃবৎষু) এবং বহুভাষিক দি জার্নাল অব রেনডিশন অবইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি (ঞযব ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ জবহফরঃরড়হ ড়ভ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ চড়বঃৎু)পত্রিকা দুটি আমার কবিতার চীনা অনুবাদ প্রকাশ করতে থাকে।২০১৮ সালে চীনের ইন্টান্যাশনাল পোয়েট্রি ট্র্যানসেøশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দি গ্রিক একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড রাইটিং, অ্যান্ড দি জার্নাল অব রেনডিশন অব ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি (International Poetry Translation and Research Centre, the Greek Academy of Arts and Writing, and the Journal ofRendition ofInternational Poetry [multilingual]) কর্তৃক ঘোষিত বিশ্বের দশ দেশের কবিদের মধ্যে আমি ‘প্রাইজেস ২০১৮: ইন্টান্যাশনাল বেস্ট পোয়েট’ (চৎরুবং ২০১৮: ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ইবংঃচড়বঃ) সম্মাননা পেয়ে বেশ অবাক হয়েছিলাম। অন্য নয়টি দেশের কবিরা হলেন রুমানিয়ার ড্র্যাগোজ ব্যারবু (উৎধমড়ং ইধৎনঁ), তুরস্কের হিলাল কারাহান (ঐরষধষ কধৎধযধহ), মেসিডোনিয়ার মাইট স্টেফস্কি (গরঃব ঝঃবভড়ংশর), কাতালুনিয়া-স্পেনের তোনিয়া প্যাসোলা (ঞড়হরধ চধংংড়ষধ), সৌদি আরবের আলী আল-হাজমি (অষর অষ-ঐধুসর), ভারতের ম-ল বিজয় বেগ (গধহফধষ ইরলড়ু ইবম), আলবেনিয়ার ফাতিমি কুল্লি (ঋধঃরসব কঁষষর), চীনের দুয়ান গুয়াঙ্গা’আন (উঁধহ এঁধহম'ধহ) এবং বেলজিয়ামের ডমিনিক হেক (উড়সরহরয়ঁব ঐবপয়)। এই সম্মাননার চার বছর আগে চিংহাই লেক কবিতা উৎসব উপলক্ষে প্রেরিত আমার কবিতা পড়ে চীনা অনুবাদক ও কবি ইয়াং জংজি উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন। চীনের কবি-স্থপতি জুটি ল্যাম ও চেরি আমার কবিতাকে উপজীব্য করে তাদের স্থাপত্যকর্মের নকসা প্রণয়ন করেছেন, প্রদর্শনী করেছেন।কিছু মানুষের কবিতা নিয়ে আগ্রহ কী, কী ভালোবাসা! আমি সামান্য কয়েক পঙ্ক্তি কবিতা লিখে এমন ভালোবাসায় অবাক না হয়ে পারি না!


চার.


জীবন চলার পথে অজপাড়াগাঁয়ের সন্তান এই আমি কত দেশের কত বাবা-মায়ের সন্তানের সঙ্গে কীভাবে-যে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসারবন্ধনে, স্নেœহ-মমতার মায়ায় আর সুখ-দুঃখের সহমর্মিতায় জড়িয়ে গেছি তা ভাবলে দু’চোখ জলে ভরে যায়। আমার পেশাগত জীবনে অন্য দেশের বন্ধু ও সুহৃদদের মধ্যে মার্কিন দেশের ড.ক্যাথি জো ফারুক, ড. মাইকেল বাউলার, ড. রুথ চার্লস, ড. জুলিয়া ওয়াটকিন্স, আন্দ্রেয়া বেদিয়াকো, প্রিয় ছাত্রী ড্যানিয়েলা; চীনের ড. শ্যু ইয়াংজাং; জাপানের ড. তাৎসুরু আকিমোতো ও মিজ কানা মাৎসুয়ো; মালয়েশিয়ার ড. জুলকারনাইন হট্টা ও ড. আদি ফারউদিন; ইন্দোনেশিয়ার মিজ নুরুল একা; দক্ষিণ কোরিয়ার ড. য়ি কিম ও মিজ সুজাং কিম; দক্ষিণ আফ্রিকার ড. ভিসান্থি সি পল; আর কবিবন্ধুদের মধ্যে সুইডেনের কৃস্টিয়ান কার্লসন, লারস হেগার, পিটার নীবারি ও বেঙত্ বার্গ; সদ্যপ্রয়াত জর্জিয়ার জুরাব আর্তভেলিয়াসভিলি; চীনের ইয়াং জংজি, শাং শি, ল্যাম ও চেরি; ভিয়েতনামের ন্যুয়েন ফান কোই মাই, ইতালির স্তেফানো স্ত্রাজ্জাবোসকো, মরক্কোর শিহাম, সেনেগলের ইব্রাহিমÑ এঁদেরভালোবাসার কথা লিখতে পারব কিনা জানি না। তাই আমার শুভার্থিনী জ্যামির কথা বলে আজ শেষ করি। যেখানেইকবিতা উৎসব আর কবিতার আয়োজন হয়জ্যামি আমাকে মনে রাখে। আমার বেলায়ও তাই। উল্লেখ্য, কোভিড-১৯-এর মধ্যেও প্রতিবছরের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিবেশী দেশ ইসিউয়াতিনি(পূর্বের নাম সোয়াজিল্যান্ড)-এর রাজপুত্র-কবি জোলানি ম্যাকিবা কবি জ্যামি প্রক্টর শ্যুকে সঙ্গে নিয়ে ইসিউয়াতিনি ও ল্যাসেথোতে অনলাইন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবের আয়োজন করেছেন। চিংহাই লেক ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল-এর মত জ্যামির সুবাদে সেই উৎসবেআমন্ত্রিত হয়ে চীন, জাপান, স্কটল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার নানান দেশের কবিদের সাথে আমিও কবিতা পড়েছি।


লেখক : উপ-উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com