আমাদের পহেলা বৈশাখ!
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১৯:৪৯
আমাদের পহেলা বৈশাখ!
অনামিকা রায়
প্রিন্ট অ-অ+

আমাদের বাড়িতে একটা অলিখিত নিয়ম চালু ছিলো আমার মা থাকাকালে। পরিবারের কোনো সদস্য বছরের প্রথম দিন বাড়ির বাইরে থাকতে পারবে না। আমরা বেশ সানন্দেই মায়ের নিয়ম মেনে চলতাম।


বাড়ির বাইরে থাকতো মূলত বাবা আর মেজদা। বাবার কর্মস্থলের দূরত্ব বেশি হওয়ায় বাবার জন্যে নিয়ম আবশ্যক ছিলো না কিন্তু মেজদা প্রতিবারই বেশ মুশকিলে পড়তেন। বাড়ির সকলের জন্যে নতুন জামা-কাপড় নিয়ে তাকে যথাসময়ে উপস্থিত হতে হত।


আমি আর অপু একটু পর পর রাস্তায় গিয়ে দেখে আসতাম মেজদা আসছে নাকি! মেজদা আসার পর আমাদের পারিবারিক বৈঠক বসত। সেই বৈঠকেই আমরা পেয়ে যেতাম নতুন জামা-কাপড়।


পয়লা বৈশাখের সকালে আমার মা উপোস করতেন। আমাদের গোয়াল ঘর কাদামাটি দিয়ে লেপে সেখানে ঠাকুরের আসন পাতা হতো। মা সেখানে আয়োজন করে পূজো করতেন। ভগবতী পূজো। ফলমূলের সাথে সাথে পূজোর বিশেষ প্রসাদ করত মা। চাল আর দুধ নিয়ে বিশেষ এক ধরনের মিষ্টিঅন্ন। এই মিষ্টিঅন্নে কিন্তু এক ফোটাও মিষ্টি খুঁজে পাওয়া যেতো না। আমরা বাড়ির সকলে মিলে কলার পাতার থালা বানিয়ে প্রসাদ খেতাম। বিকেলে মেজদার নেতৃত্বে মাকে নিয়ে আমরা সবাই বৈশাখী মেলায় যেতাম। আমার মাকে আমি এই একটি দিনই খুব আগ্রহ নিয়ে সেজেগুজে বাইরে যেতে দেখেছি। মা বড়দা অথবা মেজদার বাইকের পিছনে বসে একগাল হাসি নিয়ে বৈশাখী মেলায় যেত। তার সে আনন্দ এখনও আমার চোখে ভাসে।


বাবা যখন চাকরি থেকে অবসর নিল তখন আমার স্কুলের শেষের দিক। বাবাকে ঘিরে আমাদের বাড়িতে প্রতিদিনই আড্ডা বসত। অনেক লোক আসত বাবার কাছে। বৈশাখের দুপুরে বেশ একটা জমজমাট আয়োজন হয়ে যেত তখন। মায়ের ভগবতী পূজোয় বাবা বেশ সাহায্য করতো তাকে। এমনিতে দু'জনে সাপে-নেউলে হলেও ওইদিন বেশ টুকটাক গল্প করতে করতে পূজোর আয়োজন করতো তারা। কীর্তনীয়া বাড়ির দাদু, সরকার বাড়ির মেজ মামা, চৌধুরী বাড়ির দাদুরা, জগা কাকা, অমল কাকা-কাকি কত মানুষ আসত আমার মার হাতের প্রসাদ খেতে! আহারে! এসব প্রিয়জনের অনেকেই এখন আর আমাদের মাঝে নেই! কিন্তু সেসব প্রিয় সময়গুলো রয়ে গেছে মনের মধ্যে।


একবার আমার বাবার সাথে বেশ মনোমালিন্য হলো! আমরা প্রায় দুদিন কথা না বলে থাকলাম! আমিও বাবার সাথে কথা বলি না বাবাও না। সেইদিন ছিলো বৈশাখের প্রথম দিন। অর্থ সংকট থাকায় আমাদের কারোই সেবছর নতুন কাপড় জোটেনি! তা নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথাও নেই কারো! আমরা দুপুরে বেশ জমিয়ে টিভি দেখতে বসেছি। নববর্ষ উপলক্ষে টিভিতে সিনেমা হচ্ছে। আমি সিনেমা পাগল মেয়ে বেশ জুত হয়ে টিভির সামনে বসেছি। এমন সময় বাইরে থেকে বাবার গলা! আমার নাম ধরে ডাকছেন! আমি কাছে যেতেই আমাকে একটা ব্যাগ দিয়ে বললেন এটা তোমার জন্য এনেছি। আমি ব্যাগ খুলে দেখি একটা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি! আমার জীবনের প্রথম শাড়ি! আমার বাবার কিনে দেয়া প্রথম এবং শেষ উপহার!


সেইদিনের অনুভূতি আমার মনে নেই! তবে এখন আমি অনুভব করি ওই শাড়িটাতে আমার বাবার স্পর্শ আছে! আছে স্নেহ, ভালোবাসা আর আর্শীবাদ। আমি প্রায়ই শাড়িটা বের করে উল্টে-পাল্টে দেখে আবার যত্ন করে গুছিয়ে রাখি। ওই শাড়ির গন্ধ আমার বাবার শরীরের গন্ধের মতো লাগে আমার কাছে! আমার আলমারি ভরা এত শাড়ির মধ্যে ওইটাই আমার জীবনে সবচেয়ে সুন্দর শাড়ি।


একবার বৈশাখের সকাল শুরু হলো রবিঠাকুরের গান দিয়ে। মেজদা সারাদিন রবিবাবুর গান বাজালেন। মা পুজো করলেন। বিকেলে আমাদের বাড়ি ভ্যান ভর্তি করে অতিথি এলো! হঠাৎ করে এমন অতিথি আগমনে আমার মা বিচলিত হয়ে পড়লেন। বড়দাকে ডেকে বাজারে পাঠালেন। বড়দা তাঁর জমানো টাকা খরচ করে বেশ চড়া দামে একটা ইলিশ মাছ নিয়ে এলেন! আমি মায়ের সাথে রান্নার ব্যবস্থা করছি এমন সময় অসময়ে আগত অতিথিরা তাদের বাড়ির পথে রওনা দিলেন। আমরা কিছুতে তাদের বুঝিয়ে ফেরাতে পারছি না। অনুনয়-বিনয় করতে করতে তাদের পিছনে পিছনে রাস্তায় চলে এসেছি। আর তাতেই বাঁধল বিপত্তি! বড়দার কষ্টসাধ্য ইলিশ ততক্ষণে হওয়া! ইলিশে একটা আঁইশ পর্যন্ত পড়ে নেই! বিড়াল বা কুকুর কার পেটে গিয়েছিলেন মাছের রাজাসাহেব তার হদিস আমরা বের করতে পারিনি আর!


আমার ঢাকার বৈশাখগুলো অন্যরকম! এতে কোনো গল্প নেই! উৎসব আছে তবে আনন্দ নেই! রোজকার দিনের মতোই এটা আমার কাছে। বৈশাখের এইদিন এলেই আমার বারবার ওইসব দিনের কথা মনে পড়ে। এত এত রঙের মাঝেও তাইতো নিজেকে কেমন বিবর্ণ মনে হয়!


এই দু'বছরের বৈশাখ তো সবার জীবনেই বিবর্ণ! পৃথিবী আজ সত্যিই জরাগ্রস্ত! পৃথিবীর এই অসুখ সেরে উঠতে উঠতে আরো কত প্রিয়মুখ হারাবো আমরা জানি না!


এই নববর্ষে শুধু একটাই আশা- পৃথিবীর অসুখ সেরে উঠুক! আমরা আবার নব আনন্দে মিলে উঠবো প্রাণের উৎসবে। আমাদের মিলিত কন্ঠ আবার গেয়ে উঠবে মুক্তির গান।


"আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে,


দুঃখ বিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে।


বিশ্বধাতার যজ্ঞশালা, আত্মহোমের বহ্নি জ্বালা


জীবন যেন দিই আহুতি মুক্তি আশে॥"


বিবার্তা/অনামিকা/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com