পাকিস্তান কী একই পরিণতির মুখে?
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৬
পাকিস্তান কী একই পরিণতির মুখে?
মো. আবু সাঈদ
প্রিন্ট অঅ-অ+

১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক ভারত ভাগের সময় পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশটি ঠিক কোন অবস্থায় ছিল? এই প্রশ্নটির উত্তর এবং তৎকালীন পরিস্থিতির দিকে একটু আলোকপাত করলেই আজকের পাকিস্তানের চলমান তীব্র অস্থিরতার গভীরতা অনুমান করা মোটেও কষ্টসাধ্য হবে না। দেশভাগের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক শ্রেণির যে চরম বৈষম্য ও শোষণের প্রথা চালু হয়েছিল, আজকের বেলুচদের সঙ্গেও ঠিক একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে পাকিস্তান আজ এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে। ইতিহাসে একটি বহুল প্রচলিত অমোঘ সত্য কথা আছে—‘ইতিহাস থেকে মানুষ কিছু শিক্ষা নেয় না, এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।’ বর্তমান পাকিস্তানি শাসকদের জন্য এই উক্তিটি আজ আবারও চরম সত্য হয়ে সামনে এসেছে।


সীমাহীন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর সামরিক নির্যাতনের কারণে একাত্তরে অবিভক্ত পাকিস্তান ভেঙে গিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল।দুর্ভাগ্যবশত, ইতিহাস থেকে সেই শিক্ষা পাকিস্তান মনে রাখেনি। এককথায় নিজেদের শুধরে নেওয়ার কোনো প্রয়াসই তারা দেখায়নি। ফলে, আজকের পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের উত্তপ্ত বালুতে দেশটির অখণ্ডতা ও ভবিষ্যতের ভাগ্য যেন টগবগ করে ফুটছে।


যদি আমরা একটু ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখব ভারত ভাগের সময় এই অঞ্চলটি ‘কালাত রাজ্য’ (Princely State of Kalat) হিসেবে পরিচিত ছিল। কালাত রাজবংশের শাসনে থাকা এই অংশটিকে মূলত রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করা হয়েছিল। ফলে, জন্মের শুরু থেকেই বেলুচদের মনে এক ধরনের বঞ্চনা ও ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। উল্লেখ্য, জাতিগতভাবে অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা এই বেলুচদের স্বাধিকারের প্রশ্নে ব্রিটিশরাও কখনো সরাসরি শাসন করার বা ঘাটাতে যাওয়ার সাহস দেখায়নি।


কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানের কেন এই অঞ্চলটিকে নিজের দখলে নেওয়ার এত মরিয়া প্রয়োজন পড়ল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এর ভূপ্রকৃতিতে। বেলুচিস্তান মাটির ওপরে মরুময় ও রুক্ষ হলেও, এর মাটির নিচে রয়েছে বিপুল অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রকৃতি এই অঞ্চলকে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ করে রেখেছে। এখানে রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা, তামা এবং কয়লার খনি। একাত্তরের আগে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থেকে যেভাবে সম্পদ লুটে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মরুপ্রান্তরে স্বর্গের প্রাসাদ গড়ার হীন চেষ্টা করা হয়েছিল, ঠিক একই ঔপনিবেশিক আচরণ আজ করা হচ্ছে বেলুচদের সঙ্গে। এখানেই শেষ নয়; পূর্ব পাকিস্তানের ভাষার ওপর যেভাবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আঘাত করেছিল, একইভাবে বেলুচদের ওপরও জোর করে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আর নারী ও শিশুদের প্রতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বর্বর নির্যাতনের যে পুরোনো চরিত্র—যা একাত্তরে বাঙালি দেখেছিল—তার কোনো ব্যতিক্রম আজ বেলুচিস্তানেও ঘটছে না।


সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে বেলুচ স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অঞ্চলের প্রায় ৮৫ শতাংশ ভূমি এবং ১১টি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রসহ বেশ কিছু মূল্যবান স্থাপনা। এমনকি তারা তাদের নিজস্ব জাতীয় সংগীত ও জাতীয় মুদ্রার নকশাও প্রস্তুত করে প্রকাশ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে—তবে কি তাদের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরটুকুই বাকি? কিন্তু বর্তমান বিশ্ব-বাস্তবতায় কে দেবে তাদের এই স্বীকৃতি?


তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো তারা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাচ্ছে না। তবে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, নয়া দিল্লি কৌশলগতভাবে বেলুচদের পাশে রয়েছে। তারা প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করলেও, আজকের দিনে এইটুকু ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বুঝতে গভীর জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে না। বিশাল ভারত নিশ্চিতভাবেই চাইবে তার প্রতিবেশী অঞ্চলের চিরবৈরী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে দুর্বল ও কোণঠাসা করতে। ফলে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ভাঙন ত্বরান্বিত করতে অর্থ, খাদ্য, জ্বালানি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট পরোক্ষভাবে ভারত থেকে বেলুচিস্তানে পৌঁছানো অবাস্তব কিছু নয়। অন্যদিকে, প্রতিবেশী আফগানিস্তানে তালেবান সরকার চলছে, যাদের এখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলেনি। তবে ভারত ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। যা পাকিস্তানের জন্য অস্বস্তিকর। তা ছাড়া, বেশি দিন আগের কথা নয়। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রীর একটি উক্তিও এখানে স্মরণযোগ্য। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যে দেশের জাতীয় স্বার্থেই পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ঐতিহাসিক সত্যটি তাঁর নাতনি বেশ গর্বের সঙ্গেই পুনরুল্লেখ করেছেন।


ভৌগোলিক মানচিত্রে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ১৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বেলুচিস্তান প্রদেশটি পাকিস্তানের মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ থেকে ৪৮ শতাংশ। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রদেশের পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে ইরান। উত্তর-পূর্বে খাইবার পাখতুনখোয়া, পূর্বে পাঞ্জাব এবং দক্ষিণ-পূর্বে সিন্ধু প্রদেশ। উত্তরে আফগানিস্তানের সাথে আন্তর্জাতিক সীমানা ভাগ করেছে এবং দক্ষিণে রয়েছে আরব সাগর।


বেলুচিস্তান অঞ্চলটি মূলত বৃহত্তর ইরানীয় মালভূমির পূর্ব প্রান্ত। যার প্রায় পুরোটাই পর্বতময়। কিছু কিছু পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা ৬ হাজার ফুটেরও বেশি। এর জমি রুক্ষ, বনজঙ্গল ও গাছপালার পরিমাণ খুবই নগণ্য। তবে এর রয়েছে প্রায় ৯৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল কৌশলগত সমুদ্র উপকূল। দক্ষিণের উপকূলীয় মাকরান এলাকা বাদে বেলুচিস্তানের সর্বত্র চরম উপক্রান্তীয় মহাদেশীয় জলবায়ু বিরাজ করে। যেখানে বাৎসরিক বৃষ্টিপাত গড়ে মাত্র ২০০ মিলিমিটার। এই রুক্ষতার মধ্যেও হাতে গোনা কিছু উর্বর উপত্যকায় যব, গম, ধান ও বিভিন্ন ফলমূল উৎপাদিত হয়। ভেড়া, ছাগল ও উটের মতো গবাদিপশু পালন করেন চেলুচরা।


এখানে বেলুচিস্তানের এই ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরার মূল কারণ হলো একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা—স্বাধীনতার পথে থাকা এই প্রদেশটি যদি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে কি তারা অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারবে? নাকি তাদের অবস্থাও প্রতিবেশী আফগানদের মতো এক চিরস্থায়ী সংকটের আবর্তে রূপ নেবে?


এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেলুচ জাতির নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য জানা দরকার। প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ, স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য এই জাতি ঐতিহাসিকভাবে সুপরিচিত। প্রতিকূল মরুভূমি ও পাহাড়ি পরিবেশে টিকে থাকার কারণে তারা অত্যন্ত অনমনীয় এবং নিজেদের অধিকার রক্ষায় আপোশহীন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে আসছে। তাদের সমাজব্যবস্থা মূলত উপজাতীয় বা ট্রাইবাল। যেখানে গোষ্ঠীগত সম্মান রক্ষা প্রধান শর্ত।


বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের এই বেলুচ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তানের মূল অর্থনীতির লাইফলাইন বা প্রধান জোগানদার হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু এই অমূল্য সম্পদে বঞ্চনার শিকার স্থানীয় মানুষ। এখন আবার সেই লুটের মালের নতুন অংশীদার হয়েছে পাকিস্তানের পরম বন্ধু রাষ্ট্র চীন। ‘সিপেক’ (CPEC) প্রকল্পের নামে চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে বেলুচিস্তানের সোনা ও তামার মতো মূল্যবান আকরিক তুলে নিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের কিছু লোক-দেখানো প্রতিশ্রুতির আড়ালে মূলত বেলুচিস্তানে চলছে এক আধুনিক ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন। যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষোভকে দিন দিন চরম বারুদে পরিণত করেছে।


প্রায় ৮০ লাখ জনসংখ্যার এই অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখের মতো জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার জন্য সামরিকভাবে প্রস্তুত বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। পাকিস্তানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাথে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়মিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রায়ই দুই পক্ষের ব্যাপক হতাহতের খবর আসছে।


অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া বেলুচিস্তানের ‘স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা’র বার্তাটি শতভাগ সঠিক কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনো যথেষ্ট সন্দেহ ও বিতর্ক রয়েছে। তবে কয়েক দশক ধরে চলে আসা এই বেলুচ স্বাধীনতার আন্দোলন যে এবার একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ, পাকিস্তান এখন এক অভূতপূর্ব চতুর্মুখী সংকটে জর্জরিত। একদিকে কাশ্মীরে উত্তেজনা, অন্যদিকে আফগান সীমান্তে নিয়মিত সংঘর্ষ, আর তার ওপর চেপে বসা চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির এই ত্রিমুখী টানাপড়েনে পড়া পাকিস্তানের ‘ঘর’ ও ‘কূল’—দুই দিকই এখন খাদের কিনারায়। ইতিহাসকে উপেক্ষা করার যে মাশুল অতীতে অন্য শাসকরা দিয়েছে, পাকিস্তান কি আজ সেই একই ভাঙন ও পরিণতির মুখে দাঁড়িয়ে? উত্তরটা হয়তো সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে আছে।


লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com