
বৈষম্য, হয়রানি, চাকরির অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও নারী সাংবাদিকদের পেশায় টিকে থাকতে হচ্ছে। পরিবর্তনশীল গণমাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষতা ও পেশাদারিত্ববাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য অধিকার ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ ও তরুণ সাংবাদিকরা। একই সঙ্গে নারী সাংবাদিকদের সঠিক ও হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি এবং সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের দাবিও উঠেছে।
গতকাল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরানা পল্টনের ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র-বিএনএসকে আয়োজিত ‘গণমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনএসকের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু। তিনি বলেন, অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নারী সাংবাদিকরা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও সমাজের নানা বাধা পেরিয়ে তাদের এগিয়ে যেতে হয়। প্রতিটি বাধা থেকে অভিজ্ঞতা নিতে হবে এবং সেই অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
নাসিমুন আরা হক মিনু আরও বলেন, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঐক্যবদ্ধ থাকলে সব ধরনের সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট নারী অধিকার নেত্রী ও বর্ষীয়ান সাংবাদিক গ্লোরিয়া স্টাইনেমের (৯২) মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাহনাজ সিদ্দীকি সোমার সঞ্চালনায় সভায় বক্তারা সাংবাদিকতায় নারীদের অংশগ্রহণ, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক হয়রানি, চরিত্রহনন, চাকরি ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তারা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, সম-অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
দেশের নারী সাংবাদিকদের সঠিক ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই বলে উল্লেখ করেন উইমেন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ (ডাব্লিউজেএনবি)-এর সমন্বয়কারী এবং ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব)-এর সাবেক সভাপতি আঙ্গুর নাহার মন্টি। তিনি বলেন, নারী সাংবাদিকদের পেশাগত বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে তাদের হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন। এ জন্য বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের উদ্যোগে দেশের নারী সাংবাদিকদের একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার (ডাটাবেজ) তৈরির আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি প্রতিকূলতা বা ঝুঁকিতে পড়া সাংবাদিকদের সহায়তার জন্য তাদের একটি তালিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
পরিবর্তনশীল গণমাধ্যমে টিকে থাকতে নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন আঙ্গুর নাহার মন্টি। তিনি বলেন, প্রতিটি গণমাধ্যমে ওয়েজ বোর্ড নিশ্চিত করা গেলে নারী সাংবাদিকসহ দেশের অধিকাংশ সাংবাদিকের সংকট অনেকটাই কমে আসবে। এ বিষয়ে সাংবাদিক নেতৃত্ব ও সাংবাদিক সমাজের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
বিএনএসকের সহ-সভাপতি মুনিমা সুলতানা পেশাদারিত্ব ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে ধীরে চলতে হবে, তবুও থেমে যাওয়া যাবে না। সাংবাদিকদের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কোনো কাজ নারী সহকর্মীর জন্য ক্ষতিকর বা বিব্রতকর হচ্ছে কি না, তা সব সময় খেয়াল রাখা উচিত।
সাংবাদিকতায় নারী উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে উম্মুল ওয়ারা সুইটি বলেন, নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের দিকে তাকালে সাংবাদিক নারীদের অবস্থান সবার নিচে পাওয়া যাবে।
আইরিন নিয়াজী মান্না নারী সাংবাদিকদের ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন।
দীপ্ত টিভির চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান রুনা আনসারী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে যারা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে পারেন, তাঁদেরই এই পেশায় আসা উচিত।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিনিয়র সাংবাদিক লায়লী ইয়াসমিনবলেন, কুড়িগ্রামে ইট চুরির প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন অনুসন্ধানী কাজে তাঁকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দুর্নীতি ও চুরিবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরিতেও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
ইটিভির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাকেরা আরজু শিমু সাংবাদিকদের আর্থিক অনিরাপত্তার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমরা আজ কর্মস্থল থেকে বিদায় নিলে কাল থেকে আমার চলার মতো কিছুই থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, সরকার বা পরিস্থিতির পরিবর্তন যাই হোক না কেন, সাংবাদিকদের পেশাগত নৈতিকতা, সততা ও দায়িত্বশীলতার জায়গা ঠিক রাখতে হবে। পরিস্থিতি বদলালেও এসব মূল্যবোধ থেকে সরে যাওয়া যাবে না।
বিএনএসকের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহনাজ পারভীন এলিস বলেন, কর্মস্থলে নারী সাংবাদিকদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হয়, যাতে তারা স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
সেবিকা দেবনাথ শত বাধার মধ্যেও পেশা ছাড়বেন না বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, নিউজরুমের চেয়ে মাঠে, অর্থাৎ রিপোর্টিংয়ে কাজ করা নারী সাংবাদিকদের বেশি হয়রানি মোকাবিলা করতে হয়।
অনলাইনে হয়রানির কথা উল্লেখ করে শাহনাজ সিদ্দীকি সোমা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি করা হয়।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক দিলরুবা খান, কার্যনির্বাহী সদস্য অদিতি রহমান এবং সিনিয়র সদস্য রীতা ভৌমিক, বনশ্রী ডলি, ফারজানা অর্না ও রূপম আক্তার।
বিবার্তা/মন্টি/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]