দায় স্বীকার করে গ্রেফতারকৃত বিধানের জবানবন্দি
‘স্বর্ণের রিংয়ের জন্য’ শিশু নন্দিনী হত্যা
প্রকাশ : ১৮ জুন ২০২৬, ১৩:১৩
‘স্বর্ণের রিংয়ের জন্য’ শিশু নন্দিনী হত্যা
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

‘মাত্র দেড় আনা ওজনের স্বর্ণের কানের রিংয়ের জন্য নৃশংসভাবে খুন হন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ৭ বছরের শিশু নন্দিনী রায়।’ আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে গ্রেফতারকৃত বিধান চন্দ্র রায় (২২)।


বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আলাউদ্দিনের আদালতে তাকে হাজির করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক এ জবানবন্দি দেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।


এর আগে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে নিজ বাড়ির পাশে ভুট্টাক্ষেত থেকে নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে ওই এলাকার নলিনী কান্তের মেয়ে।


এ মামলায় গ্রেফতারকৃতরা হলেন- ওই গ্রামের রণজিৎ কুমার ও তার ছেলে বিধান চন্দ্র রায়। এ মামলার অপর অভিযুক্ত বিধানের মা মমতা রানী পলাতক রয়েছেন।


পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শিশু নন্দিনী গত সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পরদিন মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশে ভুট্টাক্ষেতে পুঁতে রাখা বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে।
শিশু নন্দিনীর লাশ উদ্ধারের পর ঘাতক বিধানকে নিজ বাড়ি থেকে ও তার বাবাকে পাশের একটি বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। তাদের ছিনিয়ে নিতে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা।


এতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, জেলা পরিষদ প্রশাসক একেএম মমিনুল হক এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমামসহ জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিন ঘণ্টা পর সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে আসামিদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় স্থানীয়দের হামলায় এসপি ও ওসি’সহ ২০ জন আহত হন। বিক্ষুব্ধ জনতা ডিসি ও এসপির গাড়িসহ সরকারি ৭টি গাড়ি ভাঙচুর করে।


এ ঘটনায় মঙ্গলবার ঘটনাস্থলেই আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হককে প্রত্যাহার করা হয়। পরে আদিতমারী থানার ওসি হিসেবে বুধবার সদর থানার ওসি (তদন্ত) নাজমুস সাকিব সজিবকে পদায়ন করা হয়।


এ ঘটনায় নন্দিনীর বাবা নলিনী কান্ত বাদী হয়ে বিধান, তার বাবা রণজিৎ ও মা মমতা রানীকে অভিযুক্ত করে মঙ্গলবার আদিতমারী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় বিধান ও তার বাবাকে গ্রেফতার দেখিয়ে বুধবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। আদালতেও হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে বিধান চন্দ্র রায়।


এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক। তাদের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। অপরদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করেছেন পুলিশ সুপার। এ কমিটিকে ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।


স্থানীয়রা জানায়, বিধান চন্দ্র রায় পেশায় জুয়েলারি শ্রমিক হলেও মাদকাসক্ত ছিল। মাদকের টাকা জোগাতে সে বিভিন্ন সময় চুরি-ছিনতাই করত। ছোট শিশুদের শরীরে অলংকার দেখলেই তার কু-দৃষ্টি পড়ত।


নন্দিনীর মা সাবিত্রী রাণী বলেন, ‘মাত্র দেড় আনার স্বর্ণের জন্য আমার বুকের ধনকে কেড়ে নিয়েছে বিধান। বিধানকে আমার মেয়ে কাকা ডাকত। সে নিজেও প্রথম দিন আমাদের সাথে নন্দিনীকে খুঁজেছিল, কিন্তু বলেনি। আমার বুকের ধন তো আর ফিরে আসবে না। যে আমার বুক খালি করেছে সেই বিধান ও তার বাবা-মায়ের ফাঁসি চাই।’


নন্দিনীর বাবা নলিনী কান্ত বলেন, ‘আমার মেয়েকে কেন হত্যা করলো সেটাই জানি না। কী অপরাধ আমার ছোট মেয়েটার? আমি হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’


লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, গ্রেফতার বিধান চন্দ্র নন্দিনীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। পারিবারিক দ্বন্দ্বের ক্ষোভে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে গ্রেফতার বিধান স্বীকার করেছে। তাই তাকে রিমান্ড চাওয়া হয়নি। আদালতেও সে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। ধর্ষণ করা হয়নি বলে অভিযুক্ত দাবি করলেও আমরা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও তদন্তের পর বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারব। আপাতত বাবা-ছেলেকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রত্যাহারকৃত ওসির স্থলে নতুন কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।


লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ঘটনা তদন্তে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও সরকারি সম্পদ নষ্টের অভিযোগে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে পৃথক দুটি মামলার প্রস্তুতি রয়েছে।


বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com